advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

দলিত সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে

সৈয়দ ফারুক হোসেন

২৫ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম
আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২১ ১১:২১ পিএম
advertisement

বহুল জনতা ও জাতি-গোষ্ঠীর দেশ বাংলাদেশ। আমাদের দেশে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক, প্রথাগত, গোষ্ঠীগত, ভাষাগত, জাতিগত, জন্মগত বিভিন্ন জাতের মানুষ বাস করে। নানা কারণে সমাজের মানুষ বৈষম্যের শিকার। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-মূর্খ, অগ্রসর-অনগ্রসর, ধর্ম-গোত্র, রাজনৈতিক ধারা-মতবাদসহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমরা দেখছি বৈষম্যের বিচিত্র রূপ। বৈষম্যের বিরোধ শুধু মানুষের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নয়, বৈষম্য মানবীয় আত্মার এক প্রকার পরাজয়। সমাজের সক্ষম মানুষ কর্তৃক অসহায় সব মানুষ প্রতিনিয়ত পরাজিত হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় দীর্ঘকাল থেকে অবহেলিত ও অনগ্রসর।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, এতে রাষ্ট্রকে কেবল ধর্মনিরপেক্ষ হলেই চলবে না- এটিকে যুগপৎ জাতিনিরপেক্ষ, ভাষানিরপেক্ষ, লিঙ্গনিরপেক্ষ ও যৌনতানিরপেক্ষ হতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার সংবিধানে এই সত্য মেনে নেবে যে- বাংলাদেশ একটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ এবং এর মধ্য দিয়ে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের পরিচয়, অধিকার, সংস্কৃতিকে সংবিধানে স্থান দেবে। আর এভাবেই কেবল রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে সবার- ছোট-বড়, গরিব-ফকির ও নিঃস্বের। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদি থেকে যেমন তারা পিছিয়ে আছেনÑ তেমনি পিছিয়ে আছেন মৌলিক মানবাধিকার থেকেও। সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ, ভূমির অধিকারপ্রাপ্তি ও রাষ্ট্রীয় সেবাগুলো থেকেও তারা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। এমনকি এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তাদের অত্যন্ত অমর্যাদাকর আচরণের মুখোমুখি করা হয়। এই যে বঞ্চনা, পিছিয়ে রাখার মনোবৃত্তি- তা জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রগতির গতিধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

দলিত সম্প্রদায় জন্ম ও পেশাগত কারণে বৈষম্য এবং বঞ্চনার শিকার। এসব মানুষ আন্তর্জাতিক পরিসরে, বিশেষ করে পণ্ডিতদের কাছে ‘দলিত’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশে দুই ধরনের দলিত জনগোষ্ঠী রয়েছে- বাঙালি দলিত ও অবাঙালি দলিত। বাংলাদেশে বসবাসরত দলিতদের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় এক কোটি। বাঙালি দলিত বলতে সমাজে যারা অস্পৃশ্য, তাদের বোঝায়। চর্মকার, মালাকার, কামার, কুমার, জেলে, পাটনি, কায়পুত্র, কৈবর্ত, কলু, কোল, কাহার, ক্ষৌরকার, নিকারি, পাত্র, বাউলিয়া, ভগবানিয়া, মানতা, মালো, মৌয়াল, মাহাতো, রজদাস, রাজবংশী, রানা কর্মকার, রায়, শব্দকর, শবর, সন্ন্যাসী, কর্তাভজা, হাজরা প্রভৃতি সম্প্রদায় সমাজে অস্পৃশ্যতার শিকার। এসব সম্প্রদায় আবার বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত। অবাঙালি দলিতরা হলো ব্রিটিশ শাসনামলের মাঝামাঝি বিভিন্ন সময়ে পূর্ববঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকর্মী, চা বাগানের শ্রমিক, জঙ্গল কাটা, পয়ঃনিষ্কাশন প্রভৃতি কাজের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার, উড়িষ্যা, কুচবিহার, রাচি, মাদ্রাজ এবং আসাম থেকে হিন্দি, উড়িষ্যা, দেশওয়ালি ও তেলেগু ভাষাভাষী মানুষের পূর্বপুরুষরা। অভাবী এসব অভিবাসী দেশের সর্বত্র পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও সিলেটে চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ভূমিহীন ও নিজস্ব বসতভিটাহীন এসব সম্প্রদায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় সরকার কর্তৃক প্রদত্ত জমি, রেলস্টেশনসহ সরকারি খাসজমিতে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হেলা, মুচি, ডোম, বাল্মিকী, রবিদাস, ডোমার, ডালু, মালা, মাদিগা, চাকালি, সাচ্চারি, কাপুলু, নায়েক, নুনিয়া, পরাধন, পাহান, বাউরি, বিন, বোনাজ, বাঁশফোর, ভূঁইয়া, ভূমিজ, লালবেগী জনগোষ্ঠী। এসব জনগোষ্ঠী তেলেগু, ভোজপুরি, জোবালপুরি, হিন্দি, সাচ্চারি ও দেশওয়ালি ভাষায় কথা বলে। এসব সম্প্রদায়ই মূলত অবাঙালি দলিত শ্রেণি। দেশের দলিত এসব সম্প্রদায় চরমভাবে অবহেলিত। তারা নিজ পেশার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সমাজের সেবা করছেন। তারা আমাদের সেবাশ্রমিক। করোনাকালে এসব সম্প্রদায়ের মানুষ সম্পূর্ণ কর্মহীন ছিল। করোনা দুর্যোগে তারা করুণ জীবনযাপন করেছেন। তারা বেশিরভাগই ভূমিহীন, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ। এসব প্রান্তিক মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করে।

বিভিন্ন মানদণ্ডে মানুষের ‘দলিতকতা’ বিবেচনা করা যায়। আর্থসামাজিক বিবেচনায় ‘দলিতকতা’ হচ্ছে মানুষের চরম নিম্নাবস্থা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকে তাদের কোনো অর্জন ধরা হয় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি পান, পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা, সঞ্চয়, মাথাপিছু আয়সহ প্রভৃতি সূচকে তাদের অবস্থা শোচনীয়। অবস্থাগত কারণে সমাজ তাদের প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা প্রদর্শন করছে। এই দলিতকতার মাঝে যাদের অবস্থান, তারাই ‘দলিত’ মানুষ। বাংলাদেশে এই বিরাট দলিতসংখ্যক নাগরিক অনেক রকম ন্যায্য সুযোগের অভাবে আর দশজনের থেকে পিছিয়ে রয়েছেন। আমরা যখন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এবং কাউকে পিছিয়ে রেখে নয়- এমন উন্নয়নের কথা বলছি, তখন এসব মানুষের কথা বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে। সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে তাদের অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মানতে হবে। সংবিধানের আলোকে দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দলিত ও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সমতলের আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর পরও তারা মূলধারার জনগোষ্ঠী উন্নয়নের স্রোতধারায় একীভূত হতে পারেননি। কিন্তু আমাদের প্রতীতি, সংবিধানের মূল সুরকে ধারণ করে দলিত ও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি।

উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারীতে দেশের সাধারণ মানুষের টিকে থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বের দাবিদার। করোনাকালীন লকডাউনে দেশের বিরূপ চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশের মানুষ কর্মহীন হয়েছে, চাকরিচ্যুত হয়েছে, বেতন বন্ধ হয়েছে, শহর ছেড়েছে, ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হয়েছে, প্রান্তিক কৃষক খামারি নিঃস্ব হয়েছে ইত্যাদি। করোনাকালে তাদের দুর্দশার কথা হয়তো আমাদের অনেকেরই অজানা রয়েছে। অনেক প্রতিবন্ধী ও অসহায় ব্যক্তি হয়তো সহায়তা পাননি। অনাহারে বা অর্ধাহারে চলছে তাদের জীবন। তারা এখন কর্মহীন। সংজ্ঞাহীন তারা। ব্যক্তিক উন্নয়ন নয় এবং সমৃদ্ধিও নয়। শুধু খেয়ে বেঁচে থাকাই তাদের জীবনের একমাত্র ব্রত। আর্থসামাজিক সব বিবেচনায় তারা দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। এই অবহেলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বাজেটে ধারাবাহিকভাবে পৃথক ও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন এবং দরিদ্র হিসেবে বাজেটে এই জনগোষ্ঠীর দাবি সর্বাগ্রে বিবেচনার দাবিদার। বিশেষত আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে দলিতদের তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন। বিগত অর্থবছরগুলোয় বাজেট প্রণয়নকালে দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণের নিয়মতান্ত্রিক দাবির বিপরীতে সরকারের তরফ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে দলিত, হরিজন, বেদে ও হিজড়া সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরেও ৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছিল। এ ছাড়া দলিত জনগোষ্ঠীর আবাসনব্যবস্থার উন্নয়নেও ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত চার অর্থবছরে প্রায় ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল। ফলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন শহরাঞ্চলের দলিত জনগোষ্ঠীর আবাসনের জন্য ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। দলিতদের একটি অংশ নগরাঞ্চলের পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োজিত। নগরাঞ্চলের দলিত জনগোষ্ঠীর বসবাস মূলত কলোনিভিত্তিক। তা মূলত পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও রেলওয়ের জমিতে। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কলোনিগুলোয় যে কক্ষ বরাদ্দ, তার আকার অনেক ছোট। তবে আশার কথা হলো, দলিতদের আবাসন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে যাদের সিটি করপোরেশন বা পৌরসভায় চাকরি আছে, তাদের দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক শহরাঞ্চলের দলিত বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অনেক দলিতপল্লী বা কলোনিতে এখনো বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা মানসম্মত নয়। এসবের উন্নয়নের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকা আবশ্যক। কেবল একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমেই এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব। দলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা দিতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা, দলিত জনগোষ্ঠীর পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকিকে বিশেষ বিবেচনায় এনে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার সব উপকরণ চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের জন্য বাজেট বরাদ্দ করা এবং শহরাঞ্চলে বিভিন্ন দলিত ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য আবাসন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দলিতদের দাবি শহরাঞ্চলের দলিতদের জন্য আবাসন বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে চাকরিতে নিয়োজিত থাকা বা না থাকার বিষয়টি বিবেচনায় না এনে সবার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা। কারণ দলিতদের সবার চাকরির নিশ্চয়তা নেই এবং অস্পৃশ্যতার কারণে কলোনির বাইরে তাদের বাড়ি ভাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া দলিতদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পেশাগত কারণে একসঙ্গে থাকা বাঞ্চনীয়। আমরা আশা করি, দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির কোটাসহ চাকরির কোটা রাখা, আবাসনব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি রেশনিং, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সংকট নিরসনে বিশেষ ব্যবস্থা এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখা হোক। এর মধ্য দিয়ে এই দরিদ্র দলিত মানুষের অগ্রগতি সাধিত হবে।

সৈয়দ ফারুক হোসেন : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement
advertisement