advertisement
advertisement

সব খবর

advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

নটর ডেম ছাত্রের প্রাণ কাড়ল নগর সংস্থার গাড়ি

ষ ছয় দফা দাবিতে সড়ক আটকে সহপাঠীদের বিক্ষোভ ষ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২১ ০২:৩৮ এএম
advertisement

রাজধানীর নীলক্ষেতের বই মার্কেটে চাকরির সামান্য টাকায় কোনো রকমে সংসার চলছিল শাহ আলম দেওয়ানের। অর্থকষ্টে থাকলেও দুই সন্তান শাহরিয়ার ও নাঈম হাসানের লেখাপড়ায় বিন্দুমাত্র আঁচ লাগতে দেননি তিনি। এ বাবার স্বপ্ন এক নিমিষেই কেড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) এক ময়লার গাড়ি। প্রিয় নাঈমের প্রাণ কেড়েছে বর্জ্য পরিবহনের যানটি।

গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর গুলিস্তান গোলচত্বরে ওই গাড়ির ধাক্কায় সড়কেই ঝরে যায় টগবগে তরুণ নাঈম হাসানের প্রাণ। ১৭ বছরের মেধাবী ওই শিক্ষার্থী নটর ডেম কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের মানবিক শাখার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পুলিশ ঘাতক গাড়িটি জব্দ করেছে; আটক করেছে চালক মো. রাসেলকে (২৭)।

এদিকে নটর ডেম কলেজের ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল দুপুর থেকে ছয় দফা দাবি নিয়ে কয়েক ঘণ্টা রাজধানীর বেশ কিছু সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ জানিয়েছেন নিহতের সহপাঠীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া ডিএসসিসির প্রধান কার্যালয় নগরভবন ঘেরাও করেও বিক্ষোভ করেছেন তারা। কয়েক ঘণ্টা পর নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষের আশ্বাসের ভিত্তিতে ৬ দফা দাবি জানিয়ে অবরোধ তুলে নিয়ে রাস্তা ছেড়ে দেয় বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থী নাঈমের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর সিতওয়াত নাঈমকে প্রধান করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করছে ডিএসসিসি। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑ ডিএসসিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিছুর রহমান।

ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের জানান, ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ ও দায়ীদের বিষয়ে সবিস্তারে উল্লেখ করে প্রতিবেদন দাখিল এবং ভবিষতে যেন এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে।

নিহত নাঈম হাসানের বাবা মো. শাহ আলম দেওয়ান জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার পূর্ব কাজিরখিল দেওয়ানবাড়ীতে। স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস আর দুই ছেলেকে নিয়ে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর ঝাউলাহাটি চৌরাস্তা এলাকায় নিজ বাড়িতে থাকেন। তার বড় ছেলে শাহরিয়ার বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র। বুধবার সকাল ৭টার দিকে ইউনিফর্ম পরে কলেজের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে যান নটর ডেম কলেজের ছাত্র নাঈম। দুপুর ১২টার দিকে বাসায় ফেরার কথা থাকলেও এর আগেই নাঈমের ফোন থেকে পুলিশ কল দিয়ে শাহ আলমকে জানায়, তার ছেলের অবস্থা গুরুতর। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে এসে ছেলের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাঈমের বাবা।

নাঈমকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যান কবি নজরুল কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র আমিনুল ইসলাম ফাহিম। তিনি জানান, গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনের রাস্তা হেঁটে পার হচ্ছিলেন নাঈম। এ সময় গুলিস্তান জিরো পয়েন্টগামী ডিএসসিসির ময়লা পরিবহনের একটি বেপরোয়া গতির গাড়ি হল মার্কেট মোড় ঘুরতেই নাঈমকে প্রথম ধাক্কা দিয়ে পরে চাপা দেয়। এতে গুরুতর আহত হয় নাঈম। দুর্ঘটনার পর কেউ তাকে ধরছিল না। সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল। পরে পথচারীদের সহায়তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নাঈমকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে চিকিৎসকরা ওই শিক্ষার্থীকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে মরদেহ ঢামেক মর্গে পাঠায় পুলিশ। নিহতের ব্যাগে থাকা জাতীয় জন্ম নিবন্ধন সনদ থেকে তার নাম জানতে পারেন ফাহিমরা।

শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের মৃত্যুর ঘটনায় বুধবার বিকাল ৩টা থেকে মতিঝিল ও গুলিস্তান সড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড। অনেকের বুকে পিঠে লেখা ছিল ‘আমি বাঁচতে চাই’। শিক্ষার্থীরা ‘নাঈম হত্যার বিচার চাই’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আমার ভাই কবরেÑ তুই কেন বাইরে’সহ বিভিন্ন সেøাগান দিতে থাকেন। এ সময় পল্টন, বায়তুল মোকাররম, মতিঝিল, গুলিস্তান এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে ৬ দফা দাবি জানিয়ে তারা অবরোধ তুলে নেন। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো সব প্রাণীর প্রাণ নিশ্চিত করা, ট্রাফিক আইন জোরালো করা, সড়ক আইন মানতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে, গুলিস্তান মোড়ে ফুটওভার ব্রিজ করতে হবে, নাঈমকে চাপা দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার ও পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, ব্যস্ততম মোড়েও ট্রাফিক ব্যবস্থা আরও পর্যাপ্ত করতে হবে। গতকাল দুপুরে কয়েকশ বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী নগরভবনেও প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু প্রধান ফটক বন্ধ থাকায় ভবনের সামনেই সেøাগান দেয় তারা। সিটি করপোরেশনের কারও সঙ্গে কথা বলতে না পেরে কিছুক্ষণ পর দুর্ঘটনাস্থলে চলে আসে নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী বলেন, ডিএসসিসির মেয়র আমাদের ফাদারকে (নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ) ফোন করেছেন। মেয়র বলেছেন ওই চালকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তার আশ্বাসে আমরা আজকের মতো আন্দোলন শেষ করেছি। যদি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় এবং অধ্যক্ষ অনুমতি দেন, তবে বৃহস্পতিবার আমরা আবার সড়কে অবস্থান নেব।’

পল্টন মডেল থানার ওসি মো. সালাউদ্দিন মিয়া জানান, দুর্ঘটনার পর পরই ময়লার গাড়ি জব্দসহ চালককে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।

advertisement
advertisement