advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বাসায় বসে অফিস করছেন জাহাঙ্গীর

মেয়রের পদ নিয়ে গাজীপুরে আলোচনা

মোহাম্মদ আলম ও আবুল হোসেন
২৫ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২১ ০২:৩৮ এএম
advertisement

নির্বাচিত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমই বহাল থাকবেন নাকি ভারপ্রাপ্তের হাতে যাচ্ছে গাজীপুর সিটি করপোরেশনÑ এটাই এখন মহানগরের আলোচিত বিষয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে মেয়র হওয়া জাহাঙ্গীর বর্তমানে দল থেকেই বহিষ্কৃত। আর নগরভবনেই যাননি তিনি। তার অনুপস্থিতিতে রুটিন ওয়ার্কেও সৃষ্টি হয়েছে স্থবিরতা। তবে ঘনিষ্ঠরা বলছেন, বাসায় বসেই সিটি করপোরেশনের জরুরি দাপ্তরিক কাজ সারছেন মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। এখন সরকার কী সিদ্ধান্ত দেয়, সবার সঙ্গে তিনিও আছেন সেই প্রতীক্ষায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরভবন ও বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে যাচ্ছেন। দেখেশুনে তাতে স্বাক্ষর করছেন। কর্মী-সমর্থকদের মাঝে অবশ্য উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করছে। সেই সঙ্গে তার নিয়োজিত মাস্টাররোলের কর্মচারী ও ট্রাফিক সহকারীরাও রয়েছেন বিপাকে। কোনো কারণে জাহাঙ্গীর আলম মেয়রের পদ হারালে চাকরি খোয়াতে পারেন তারাও।

গাজীপুর নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে গেল ১৯ নভেম্বর বহিষ্কার হন মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। এর পর আর তিনি গণবভনে অফিস করেননি। বিষয়টি নিশ্চিত করে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বিশেষ জরুরি যেমনÑ বেতনভাতাদির নথি মেয়রকে রিকোয়েস্ট করে স্বাক্ষর করানো হচ্ছে। তবে নতুন কোনো কিছু হাতে নেওয়া হচ্ছে না।’

জানা গেছে, মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের তিন বছরে সিটি করপোরেশনে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী মাস্টাররোলে নিয়োগ পান। আর ট্রাফিক সহকারী হিসেবে সড়কে কাজ করেন ৩০০ কর্মী। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, দলীয় পদ হারানোর পাশাপাশি জাহাঙ্গীর মেয়র পদও হারাচ্ছেন। আর এমন খবরে চাকরি পাওয়া এসব ব্যক্তি আছেন বেশ আতঙ্কে। মেয়র পদ হারালে তাদের চাকরির কী হবে, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেনÑ তা নিয়েই তাদের চিন্তা। এ ছাড়া সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে দলীয় কার্যালয় থেকে বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ছবিও নামিয়ে ফেলতে দেখা গেছে গত দুদিন।

জানতে চাওয়া হলে ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আমজাদ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘বর্তমান মেয়রের বিষয়ে সরকার হয়তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের বক্তব্যেও তেমন আভাস পাওয়া গেছে। সে ক্ষেত্রে কাউন্সিলরদের মাঝে কাউকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দেওয়াই ভালো হবে।’ সিটি করপোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. গিয়াস উদ্দিন সরকারের ভাষ্যÑ ‘মেয়র বরাবরই কম অফিস করতেন। বর্তমানে অফিস একদম ঝিমিয়ে পড়েছে। মেয়রের বিষয়ে সরকার যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে বিকল্প ব্যবস্থা সরকারই করবে। সিটি করপোরেশনে এসে মানুষ যেন তার প্রাপ্য সেবা পায়। আমরা যেন মানুষের জন্য কাজ করতে পারি। এখন সিটি করপোরেশনের যেসব উন্নয়নকাজ চলমান, সেগুলো তড়িৎ গতিতে শেষ করা দরকার।’

শিল্পনগরী গাজীপুরের একাধিক কারখানা মালিক জানান, বর্তমানে মেয়র কোনো নথিতেই স্বাক্ষর করছেন না। এতে তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে আছে। তাই সরকারের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। এ বিষয়ে ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. সাদেক আলী বলেন, ‘মেয়র অফিস না করায় সিটির কাজে তো কিছুটা সমস্যা হচ্ছেই। মেয়রের অনীহার কারণে বিধান অনুযায়ী প্যানেল মেয়রও নির্বাচন করা হয়নি। এখন সরকার কী সিদ্ধান্ত দেয় সবাই সেই প্রতীক্ষায় আছেন।’ তিনি মনে করেন, ‘যেহেতু এখনো পাঁচ বছর মেয়াদের প্রায় অর্ধেক সময় রয়েছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচিত মেয়রের কোনো কিছু হলে প্যানেল মেয়র বানিয়ে সেখান থেকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র করাই ভালো হবে।’

গাজীপুর মহানগরে সাধারণ মানুষের মাঝেও এখন ‘মেয়র নাকি ভারপ্রাপ্ত মেয়র’ আলোচনা তুঙ্গে। নগরীর চা দোকান বা কোনো স্থানে কয়েকজন একত্রিত হলেই প্রধান আলোচ্য বিষয় গাজীপুর সিটির মেয়র প্রসঙ্গ। অধিকাংশ মানুষের বদ্ধমূল ধারণাÑ মেয়র পদ থেকে জাহাঙ্গীর আলমের অপসারণ সময়ের ব্যাপার। ভারপ্রাপ্ত মেয়র কে হচ্ছেন তাও আলোচনা হচ্ছে। মেয়রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত দুজন জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মেয়র পদ থেকে জাহাঙ্গীর আলমকে পদত্যাগের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তাদের ভাষ্যÑ যেহেতু আওয়ামী লীগের সাধারণ সদস্য হিসেবেও তিনি নেই। তাই আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত মেয়রকে স্বসম্মানে সরে দাঁড়ানোই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত।

এদিকে প্যানেল মেয়রের দৌড়ে এক নম্বরে আছেন ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আসাদুর রহমান কিরণ। তা ছাড়া ৫২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল আলীম মোল্লা, ৪৬ নম্বর কাউন্সিলর মো. নুরুল ইসলাম নুরু, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মামুন মণ্ডল, ৪১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজিজুর রহমান শিরিষও রয়েছেন প্যানেল মেয়রের দৌড়ে।

২০১৩-১৮ মেয়াদে ২৮ মাস গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আসাদুর রহমান কিরণ। একই সঙ্গে তিনি গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি বলেন, ‘মেয়র হিসেবে নির্বাচিত জাহাঙ্গীর আলমই বহাল থাকবেন নাকি তাকে অব্যাহতি দেওয়া হবেÑ সেটি সারাদেশের আলোচিত ঘটনা। তবে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’ সময়ের প্রয়োজনে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে তাকে দায়িত্ব দিলে সরকারের চলমান উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিরলস কাজ করবেন বলে জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

জাহাঙ্গীরসহ চারজনের বিরুদ্ধে রুল জারি

আদেশ অমান্য করে জমি দখল করায় আওয়ামী লীগ থেকে সদ্য বহিষ্কৃত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। আদালত অবমাননার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে। বাকি যে তিনজন অভিযুক্ত হচ্ছেনÑআলফাজ, হারুনুর রশিদ ও জফলুল হক।

এক আবেদনের শুনানি করে গতকাল বুধবার বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মেয়র জাহাঙ্গীরসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আবেদনকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার আবুল কালাম আজাদ এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, গাজীপুরের সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের একটি জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দখলে থাকা ব্যক্তি আশরাফ উদ্দিন আহমেদ হাইকোর্টে রিট করেন। তখন হাইকোর্ট তার জমিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে এবং তাকে ওই জমিতে অবস্থানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হয়রানি না করার আদেশ দেন। ওই আদেশ অমান্য করে গত ১৯ জুন মেয়র জাহাঙ্গীর ও তার লোকজন ওই জমি নিজের দাবি করে আশরাফকে বাধা দেন। এ কারণে জাহাঙ্গীর আলমসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন আশরাফ উদ্দিন আহমেদ। গতকাল শুনানি নিয়ে রুল দেন।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জেলার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করায় গত ১৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে জাহাঙ্গীর আলমকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। আলোচনা চলছে তাকে মেয়র পদ থেকে অপসারণ করার বিষয়েও।

advertisement
advertisement