advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

শিক্ষার্থীদের পাশে সরকারেরই দাঁড়ানো উচিত

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
২৬ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২১ ১১:১৮ পিএম
advertisement

স্কুল থেকে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনমুখর হতে দেখেছি। শিক্ষার্থীদের দাবি কখনো যৌক্তিক আবার কম যৌক্তিক হয়ে থাকে। মানতে হবে সার্বিক বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের অভিভাবক সরকার। দুর্ভাগ্য হচ্ছে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, এ ধারার আন্দোলনের মুখে সরকার সাধারণত পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকে। রাজনীতির মার্কামারা না হলে এ দেশের রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সাধারণত তেমন কেয়ার করে না। অঙ্কুরে সমাধান করার সুযোগ থাকলেও প্রথমদিকে দর্শকের ভূমিকাই পালন করে। তার পর এক সময় আন্দোলন থামাতে সরকারি দলের ছাত্রদের ব্যবহার করে। তারা চড়াও হয় সতীর্থ ছাত্রবন্ধুদের ওপর। এভাবে সংকটকে ঘোলাটে করা হয়। এর পর নয়ছয়ের মধ্য দিয়ে আন্দোলন প্রশমিত করা হয়। ২০১৮ সালে বাসচাপায় ছাত্রী হত্যার পর এ পদ্ধতিতেই শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের নিষ্পত্তি ঘটানো হয়েছিল।

এখন রাজধানীতে চলছে হাফ বাসভাড়ার দাবিতে স্কুল-কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রী আন্দোলন। বিভিন্ন এলাকায় গাড়ি চলাচল বন্ধ করে সড়কে অবরোধ তৈরি করা হচ্ছে। যে কেউ এই আন্দোলনে যৌক্তিকতা খুঁজে পাবেন। তাই আমরা মনে করি শুরুতেই সরকার সমাধানের পথে হাঁটতে পারত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার আপন ফর্মুলাতেই এগোচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে ইতোমধ্যে ছাত্রলীগের ছেলেদের মাঠে নামানো হয়ে গেছে। ছাত্রদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে তাদের যখন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা তখন তারাই লাঠিসোটা নিয়ে চড়াও হচ্ছে সতীর্থ বন্ধুদের ওপর। ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে, এর আগে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে সড়ক অবরোধের সময়ও ছাত্রলীগের লাঠিয়ালদের নামানো হয়েছিল। পরে সমাধানের জন্য নড়েচড়ে উঠেছিল প্রশাসন। একই ফর্মুলা কার্যকর থাকলে এই লেখা প্রকাশের আগেই হয়তো সরকারি বক্তব্য আমরা শুনতে পারব।

বাসে ছাত্রদের হাফ ভাড়া পাওয়ার অধিকার কি নতুন কিছু? পাকিস্তান আমল থেকেই যানবাহনগুলোতে ছাত্রদের জন্য হাফ ভাড়া কার্যকর ছিল। বাংলাদেশ আমলেও হাফ ভাড়া অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল। যখন পর্যন্ত বাসের চালক-হেলপাররা বাস মালিকের বেতনভুক কর্মচারী ছিল তখন পর্যন্তু বাস শ্রমিকদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তেমন বচসা হতো না। দ্বন্দ্বটি বড় হয় মালিকরা বাসগুলোকে চালকদের কাছে ইজারা দেওয়ার পর থেকে। নানা ইস্যুতে সরকারের কাছ থেকে মালিক পক্ষ বাড়তি ভাড়ার দাবি আদায় করে নিলেও তারা লাভের অঙ্ক থেকে একচুলও ছাড় দিতে রাজি থাকেন না। দ্বন্দ্বের জায়গাটি তৈরি হয় এখান থেকে।

এই যে ছাত্ররা হাফ ভাড়ার দাবিতে পথ অবরোধ করল, তা নিষ্পত্তি করার জন্য কি সরকার পক্ষ শুরুতেই মধ্যস্থতা করতে পারত না? কিন্তু বরাবরের মতো সে পথে হাঁটেননি বিধায়করা। জলঘোলা হওয়ার পরই সরকার পক্ষ পর্দার সামনে এসে থাকে। অন্যদিকে তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধির মালিক পক্ষের দাবি রাত না পোহাতেই কার্যকর হয়ে যায়। আমাদের মনে হয় এ ধারার সাধারণ ছাত্রদের অসন্তোষ বাহ্যিক কোনো ইস্যু থেকে হলেও অন্তর্নিহিত নানা অস্থিরতা ও অসন্তোষও এর পেছনে সক্রিয় থাকে।

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেখে আমরা আনন্দিত। প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিকতা ও দেশপ্রেমের কারণেই যে এই এগিয়ে চলা সম্ভব হচ্ছে তা একমাত্র নিন্দুক রাজনীতিক ছাড়া সবাই মানবেন। এগিয়ে চলার এই দুর্বার গতিতে সারাবিশ্বের মতো আমাদেরও হোঁচট খেতে হলো। এগিয়ে চলার পথগুলোতে কাঁটা বিছিয়ে দিল মহামারী। তবু আমরা নিশ্চয়ই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ব না। নতুন উদ্যম নিয়ে এগিয়ে যাব। বিশ্বসভ্যতা-বিরুদ্ধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই হাজার বছর ধরে এগিয়ে চলছে। কিন্তু সরকারি নীতিনির্ধারণের একটি সংকট বরাবরই আমাদের চেতনায় আঘাত করে। মনে হচ্ছে সরকার পরিচালকরা যেন দেশ উন্নয়নের সঙ্গে নিজেদের দলীয় রাজনৈতিক লাভালাভের ব্যাপারটাও যুক্ত করেছেন। তাই দূরদৃষ্টি যেন অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হচ্ছে না। দায়িত্বশীল মানুষ নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেন, সেই উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন যা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভালাভের সাইনবোর্ড হবে নাÑ পাবে স্থায়ী ভিত্তি। চটজলদি রাজনৈতিক লাভালাভের হিসাব না করলে এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে পারলে স্থায়ী রাজনৈতিক লাভও যে হবে এ সত্যটি আমরা অনেক সময় মানতে চাই না।

কোভিড অন্যান্য ক্ষেত্রের স্থবিরতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মানসিক সংকট কম তৈরি করেনি। এই বিষয়গুলো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে খুব যে সহানুভূতির সঙ্গে দেখা হয়েছে তেমন প্রমাণ আমরা পাই না। একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর নির্মিত ইমারত দীর্ঘ স্থায়ী হয়। কিন্তু ওপরের চাকচিক্য দেখে কি এই ভাবনা সামনে আসে যে, সব কিছুর চালিকাশক্তি মাটির নিচের অদেখা ভিত্তি। ভিত্তি দুর্বল রেখে কতদিন টিকিয়ে রাখা যাবে ইমারত? আমাদের ক্ষমতাবান সরকার পরিচালকদের কারণে সেই স্বর্ণশিল্পীর কদর নেই যে নিখাদ স্বর্ণের গায়ে অনুপম শৈল্পিক নকশা ফুটিয়ে তুলবেন। যা যুগ যুগ ধরে অবিকৃত থাকবে। কিন্তু ক্ষমতাবানরা খুঁজে নেন সেসব স্বর্ণকারকে যারা ইমিটেশনের ওপর সোনার প্রলেপে চকচক করে দিতে পারেন। প্রাথমিক লাভ হয় তাতে। কিন্তু এক সময় প্রলেপ উঠে ইমিটেশনের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। এ কারণে উন্নয়নকে স্থায়ী করতে হলে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো প্রয়োজন। প্রকৃত শিক্ষা উন্নয়ন ছাড়া এই ভিত্তি নির্মাণ করা অসম্ভব। আর যারা এই চিরসত্য কথাটি জেনেও আমলে আনি না এবার করোনা মহামারী অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখিয়েছে শিক্ষাহীনতা কতটা চেতনাহীন করে দিতে পারে!

সার্টিফিকেটধারী অমানুষ দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি শিক্ষিতের কথা এখানে বলা হচ্ছে না। আমরা সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলতে চাইছি যার কারিকুলামের মধ্যে থাকবে চেতনা ও মনুষ্যত্ব তৈরির পথনির্দেশনা। আমাদের শিক্ষানীতি ভালো ফলাফলের ছকে ফেলে ভালো মানুষ তৈরির পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।

করোনার কারণে অনেক পরিবারের আয় কমে গেছে। সন্তানদের শিক্ষা খরচ চালানোর মতো সামর্থ্যও অনেকের কমে গেছে। যে অভিভাবকের সন্তানকে প্রতিদিন বাসে চড়ে স্কুল-কলেজে আসতে হয় তারা জানেন এই বাড়তি ভাড়ার চাপ তাদের জন্য কতটা পীড়াদায়ক। এই বিষয়গুলো সরকার পক্ষের বিবেচনায় থাকা উচিত ছিল। ভাড়া বাড়ানোর জন্য মালিক পক্ষের সঙ্গে দরকষাকষি নয়, দাবি মানার বৈঠকে যখন সরকার পক্ষ বসেছিল তখন আপন বিবেচনায়ই শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার চিরকালীন অধিকারটি নিশ্চিত করা উচিত ছিল। কিন্তু শক্তিহীন ছাত্র-অভিভাবকদের স্বার্থ নিয়ে ভাববে কে! শিক্ষার্থী ও আমাদের শিক্ষার মান গোল্লায় যাচ্ছে না এগিয়ে চলছে এসব নিয়েও তো বিধায়কদের তেমন ভাবনা-চিন্তা দেখছি না।

স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার মানের ভীষণ স্খলন ঘটেছে। দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার আলোকেই বলছি। এ নিয়ে লম্বা বক্তৃতা করা যাবে। এই কলামের সীমাবদ্ধতায় তা সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার দিকে তাকিয়ে থাকে সারা পৃথিবী। নানা সংকটে-সম্ভাবনায় এই গবেষণালব্ধ জ্ঞান, নতুন উদ্ভাবন দেশকে এগিয়ে নেয়। এজন্য গবেষণার পথ তৈরি করতে বিশেষ মনোযোগ থাকে সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। এ ক্ষেত্রে তো আমরা তিমিরেই আছি। গবেষণা করতে হলে গবেষক সৃষ্টি করতে হয়। উন্নত এবং সাংস্কৃতিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ গবেষকদের জন্য সব রকম সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেয়। আর সামান্য সহযোগিতার অভাবে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ মেধাবী শিক্ষক গবেষকদের প্রশিক্ষণ-পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়া জরুরি সেখানে ক্ষমতার জোরে উচ্চশিক্ষার বাজেটের বড় অংশ নিয়ে আমলারাই বিদেশে চলে যান। এসব ডিগ্রি নিয়ে তারা কোন গবেষণায় নিজেদের নিযুক্ত করবেন তা একমাত্র ঈশ্বরই বলতে পারবেন। অথচ যাদের প্রশিক্ষিত হওয়ার কথা ছিল তারা বদ্ধ জলাশয়ে হাবুডুবু খেতে থাকে। এসব নানা বাস্তবতার কারণেই এশিয়ার র‌্যাঙ্কিংয়েও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয়।

আমাদের দেশের সরকারগুলো অহর্নিশি ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চায় বলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদেরই পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। ফলে সংকটে বোঝা যায় কতটা অন্তঃসারশূন্য করে রাখা হয়েছে প্রতিটি সেক্টরকে। যখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্বৃত্ত রাজনীতিকরণ সম্পন্ন করা হয়েছে তখন থেকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় তার ঔজ্জ্বল্য হারাতে থাকে।

আজকের আলোচনায় এ কথাগুলো কারও কারও কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও আমরা একে বিচ্ছিন্ন চিন্তা বলব না। কারণ শিক্ষার্থীর যখন পারিবারিক আর্থিক সংকট নিয়ে ভাবতে হয়। ভবিষ্যতে শিক্ষাজীবনকে এগিয়ে নিয়ে চলার জন্য কুসুমাস্তীর্ণ পথের দিশা না পায় তখন হতাশা ধীরে ধীরে গ্রাস করে। নানা উপলক্ষেই এ থেকে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এ কারণে সুস্থ অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে এই মুহূর্তের সংকট অর্থাৎ কালক্ষেপণ না করে ছাত্রদের হাফ ভাড়ার দাবির সুষ্ঠু সমাধান যেমন প্রয়োজন, তেমনিভাবে শিক্ষাঙ্গনের নানা নৈরাজ্য কমিয়ে ফেলে শিক্ষার্থীদের মনে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন তৈরি করে দেওয়া জরুরি। এভাবে সব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পাশে সরকারেরই দাঁড়ানো উচিত।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়

advertisement
advertisement