advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

কবিতার রূপ কবিতার অরূপ

সরকার আবদুল মান্নান
২৬ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২১ ১১:১৮ পিএম
advertisement

কবিতার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। বাংলা ভাষায় এগারো বা বারো শতক থেকে কবিতার সন্ধান পাওয়া গেছে। অনেক ভাষায় কবিতার আরও প্রাচীন ইতিহাস আছে। ফলে অনিবার্যভাবেই কবিতা কী, কবিতা দেখতে কেমন এবং কবিতার বোধের জগৎটাই বা কেমন, এসব নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় প্রচুর মতামত ব্যক্ত হয়েছে। আমার মনে হয়, কবিতা দেখতে কবিতার মতো। কবিতার চরণগুলো, পঙ্ক্তিগুলো, স্তবকগুলো পৃষ্ঠার যে কোনো জায়গায় সন্নিবেশিত করা যায়, ইচ্ছেমতো সাজানো যায়, ভাঙা যায়, গড়া যায়, ছোট করা যায়, বড় করা যায়, বাঁকা করা যায়, সোজা করা যায়। এক বা একাধিক পৃষ্ঠায় দৃশ্যগ্রাহ্য শব্দের এই সন্নিবেশকে কবিতা বলে। তার মানে, একটি বিড়াল যেমন বিড়ালের মতো এবং একটি সিংহ যেমন সিংহের মতো, তেমনি একটি কবিতা কবিতার মতো। খুব শৈশব থেকে কবিতার এই বিশেষ গড়ন আমাদের চেতন-অবচেতনে স্থায়ী হয়ে আছে। আমরা বুঝতে পারি, কবিতা গল্পের মতো নয়, উপন্যাসের মতো নয়, প্রবন্ধের মতো নয়, নাটকের মতো নয়। কবিতা কবিতার মতো।

কবিতার এই গড়নের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পঙ্ক্তির পরে এক দাঁড়ি ও দুই দাঁড়ি দেওয়ার যুগ শেষ হয়েছে অনেক আগে। তার পর পৃষ্ঠার ওপরে পঙ্ক্তি সাজানোর কত যে গড়ন তৈরি হয়েছে, তার কোনো সেট নির্ধারণ করা যাবে না। বলা যাবে না যে, কাগজের ওপর এসব রীতিতে কবিতার গড়ন নির্ধারিত। তবে কবিতার প্রাচীনতম ইতিহাস থেকে শুরু করে আজ অবধি যেসব রীতির আবির্ভাব হয়েছে, তার কিছু গড়নের সঙ্গে, আকার-আকৃতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। জাপানি হাইকো (Haiku), ব্রিটিশ লিমেরিক (Limerick), ইতালিয়ান সনেট (Sonnet), ভারতীয় নানই (Naani), নয় লাইনের কবিতার প্রথম লাইনে নয় অক্ষর থেকে শুরু করে ক্রমে একটি একটি করে অক্ষরসংখ্যা কমতে কমতে এক অক্ষরের ননেট (Nonet) কবিতা, শোকগাথা (Elegy), চরণ কবিতা (Ballads), এপিটাপ লিরিক (Epitaph), রুবাই, গজল, চিনকুয়াইন (Cinquain), রেসপেট্টো (Rispetto), এ্যাক্রোসটিক (Acrostic), টানকা (Tanka), হুরাটিয়ান ওড (Horatian Ode), ওট্টাভা রিমা (Ottava Rima), প্যানটাম (Pantoum), স্প্যানসিরিয়ান (Spenserian), ট্রিওলেট (Triolet) ইত্যাকার যেসব গড়ননির্দিষ্ট কবিতা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচলিত আছে, তার সঙ্গে কিছুটা পরিচয় আমাদের আছে। কিন্তু এর বাইরে কবিতা বা গদ্যকবিতার যে গড়ন তৈরি করেন কবি, তার কোনো নাম নেই এবং বিবরণেরও অবকাশ নেই। এই গড়ন কবির ভাবনারই একটি দৃশ্যগ্রাহ্য রূপ। কাব্যভাষার ভেতর দিয়ে, গদ্যের মতো পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা লেখার প্রচলনও দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু ওই যে পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা, তারও স্কেলেটন কবিতার প্রথাগত গড়নকে খোলনলচে পাল্টিয়ে একদম আলাদা হয়ে যেতে পারেনি। মনে হয়, একটা কিছু পরিবর্তন আছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনসহ কবিতাই।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়, সন্তুষ্ট নন কবি কিংবা পাঠক কিংবা মুদ্রক। সুতরাং পৃষ্ঠার ওপরে আসে রঙের আলপনা। আসে বিচিত্র মোটিফ। পাখি, পাখির পালক, বৃক্ষ, ফুল, লতা-পাতা এবং কবিতার আপাত ভাবনার ওপর নির্ভর করে বা না করে কত বিচিত্র মোটিফ যে মুদ্রিতব্য কবিতার গায়ের নিচে আঁকা হয়, তার কোনো পরিচয় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কাব্যলক্ষ্মীকে ধারণ করার এই আয়োজন চলছে এখন সর্বত্র। চিত্রশিল্পী, আঁকিয়ে, পটুয়া কবিতার শয্যায় যে শিল্পকর্মের আয়োজন করেন তার কি কোনো মূল্য আছে, তাৎপর্য আছে? নাকি এ শুধুই চোখের আরাম? কবিতার বিষয়বৈভব, তার অর্থময়তা, রহস্যময়তা, দ্ব্যর্থবোধকতা এর সঙ্গে এই আয়োজনের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ ওই একই কবিতা যখন অন্য কোনো কাগজে বের হবে, তখন আগের আয়োজন আর নাও থাকতে পারে এবং এমনকি সাদা কাগজেও মুদ্রিত হতে পারে। সুতরাং কবিতার জন্য যে আলপনা ও চিত্রকর্মের আয়োজন করা হয়, তা উপস্থাপনের অনন্যতা ছাড়া আর কিছু নয়।

গল্প-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধের মতো কবিতাও লেখা হয় শব্দ দিয়ে। তা হলে কেন কবিতার অনুভবের জগৎ আলাদা? কেন একটি কবিতা আমাদের মধ্যে অন্যরকম বোধের উদ্বোধন ঘটায়? ছোট একটি কবিতা কীভাবে আমাদের মধ্যে একটি মহাকাব্যিক ভাবনার জন্ম দেয়? এই প্রশ্নের নানারকম ব্যাখ্যা আছে। আমার কাছে মনে হয়, বিষয়টি খুব জটিল করে ভাববার দরকার নেই। আমরা জানি, শব্দ সয়ম্ভূ কোনো বিষয় নয়। শব্দ বস্তুর প্রতীক, বিষয়ের প্রতীক, ভাবনার প্রতীক। কোনো একটি শব্দ দিয়ে কী বোঝানো হচ্ছে, তার বিবরণ আছে ওই ভাষার অভিধানে। অর্থাৎ প্রতিটি শব্দের আভিধানিক অর্থ আছে। গল্প-উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধে সাধারণত শব্দ ব্যবহৃত হয় তার ওই আভিধানিক অর্থে। ‘হাজার’ একটি গণনাবাচক শব্দ। পৃথিবীর যে কোনো ভাষায় হাজার শব্দটির নাম যাই হোক না কেন, তার পরিমাণ একই। কিন্তু কবিতায় এই শব্দটি গণনা বাচকতার ওই অর্থে ব্যবহৃত নাও হতে পারে। অভিধানের প্রথাগত ও সুনির্দিষ্ট অর্থকে অতিক্রম করে অন্য কোনো অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হতে পারে। শব্দের এই নতুন অর্থবাচকতাকে বলে ডিকশন। জীবনানন্দ দাশের একটি বিখ্যাত কবিতা ‘বনলতা সেন’। এই কবিতার প্রথম চরণ, ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে।’ পঙ্ক্তিটির মধ্যে ‘হাজার’ শব্দটি আছে। গণনাবাচক অর্থময়তা দিয়ে এই ‘হাজার’ শব্দটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এই হাজার মানে হতে পারে অনন্তকাল কিংবা অন্য কোনো অর্থ। অনুরূপ শব্দ ‘আমি’। এর আভিধানিক অর্থ উত্তমপুরুষের সর্বনাম। কিন্তু কবিতার মধ্যে ‘আমি’-এর অর্থ উত্তমপুরুষ, মধ্যমপুরুষ ও নাম পুরুষ- সবই হতে পারে। এমনকি সমষ্টিগত বিশেষ্যও হতে পারে। অন্য একটি শব্দ ‘পথ’। অভিধানে এর অর্থ লেখা আছে রাস্তা, সড়ক, সরণি। অর্থাৎ যার দ্বারা গমনাগমন করা যায়। কিন্তু কবিতায় শব্দটি এই অর্থ বহন করে না। এই শব্দের অর্থ হতে পারে মানবসভ্যতার বিবর্তন কিংবা অন্যকিছু। সুতরাং কবিতা শব্দের শিল্প হলেও সেই শব্দ আভিধানিক বা লেক্সিকাল নয় এবং কবিতায় কোনো শব্দই অভিসম্বন্ধিক ফর্মে (referential form) ব্যবহৃত হয় না। কারণ কোন শব্দ কি অর্থ ধারণ (refer) করে, কবিতার উদ্দিষ্ট তা বোঝানো নয়- এই দায় জ্ঞানার্জনে ও গবেষণায়। নৃত্য ও গানের মতো, চিত্রশিল্প ও স্থাপত্যের মতো কবিতা শব্দের মাধ্যমে বোধের প্রতীকগুলোকে পরিবেশন করে। সুতরাং এর ভাষাকে বলা যায় 'performative' বা '`ritualistic' ভাষা। অভিসম্বন্ধিক ভাষা কোনোভাবেই আবোধগম্য এবং গ্রহণ কিংবা প্রত্যাখ্যানযোগ্য হতে পারে না। কেননা এই ভাষা যে অর্থ ধারণ করে তা যৌক্তিক ও পরীক্ষিত সত্য। এর অর্থময়তায় কোনো দ্ব্যর্থকতা কিংবা অর্থ বা অভিপ্রায়ের অস্পষ্টতা বা অনিশ্চয়তা (ambiguity) থাকে না। কিন্তু পারফরমেটিভ ভাষার চরিত্র আলাদা। অনিশ্চয়তাই এর নিয়তি। ‘কী ঘেটেছে তার বর্ণনার ভেতর দিয়ে, কী ঘটেনি কিংবা কী ঘটতে পারত কিংবা আদৌ কিছু ঘটেছে কিনা কিংবা আদৌ কিছু ঘটতে পারত কিনা- এই পুরো অভিব্যক্তিটি একমাত্র পারফরমেটিভ ভাষার মাধ্যমে উপস্থাপন সম্ভব।’ (সরকার আবদুল মান্নান, কবিতার রূপকল্প ও আত্মার অনুষঙ্গ ২০১১, পৃ. ১৭)

সময়ের পটভূমিতে শব্দ বদলায়, শব্দের অর্থ বদলায়, রূপ বদলায়। আবার বহুদিন ব্যবহারের ফলে শব্দ অচল মুদ্রার মতো ব্যবহার-অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বড়ু চণ্ডীদাসের কবিতায় আছে মোর, হআঁ, বিদার। বিদ্যাপতি ব্যবহার করেছেন আজু, হম, গমাওল, মানল, মলয় ইত্যাদি কাব্যভাষা। এ ছাড়া হরষিত, হেন, হৈয়, আমা, সেবিনু, উচল, পড়িনু, করেন্ত, কহেন ইত্যাকার শব্দ এক সময় কবিতায় বহুল প্রচলিত ছিল। কিন্তু এখন এসব শব্দ অচল। জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই এখন আর এই শব্দ ব্যবহৃত হয় না, কবিতায় তো নয়ই। এই বোধ কবির মধ্যে তৈরি করে সময়। তা হলে কবিতার জন্য ‘সময়’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। সুতরাং কবিতায় সময়ের সার্বভৌম সংহতির চিত্র উল্লেখ করা দরকার।

কবিতা নিজেই একটি সংগঠন। এই সংগঠনের মধ্যে ‘সময়’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ (phenomenon)। মানুষ বসবাস করে সময় এবং সময়হীনতার মধ্যে। সে সময়ের প্রতিভূ, উত্তরসাধক এবং সময়হীনতার এক চিরকালীন সত্তা। কবিতার মধ্যে এই দুই সময়ের বিন্যাস নির্ধারণ করে কবির সময়ের কালপর্ব।

প্রাচীন বা মধ্যযুগে এই সময় ছিল একরৈখিক। কারণ ব্যক্তি যদি শুধু ধর্ম ও প্রথাগত জীবনাখ্যানের অনুগত হয় তা হলে সময় তার আপন স্বভাবে প্রতীয়মান হয়। সময়ের কোনো তল থাকে না, পরত থাকে না, মাত্রা ও মাত্রান্তর থাকে না। ফলে প্রাচীন ও মধ্যযুগের কবিরা দশক পেরিয়ে তো বটেই, শতাব্দী পর্যন্ত ভিন্ন কোনো কণ্ঠ বা কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পারেননি। ফ্রেমে বন্দি সময়ের মধ্যে তারা অভিন্ন কিছু বোধ লালন করে গেছেন নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে।

কিন্তু উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকেই দ্রুততার সঙ্গে পাল্টাতে থাকে সময়। ব্যক্তিমানুষ নিজেকে খুঁজতে থাকে সর্বত্র। নিজেকে দেখতে চায় নিজের চোখে। ধর্ম নয়, প্রথা নয়, সমাজ-সভ্যতা নয়Ñ একমাত্র ‘আমি’। অর্থ-ঐশ^র্যে ‘আমি’, বিজ্ঞানে ‘আমি’, দর্শনে ‘আমি’, সমাজ-সংস্কৃতিতে ‘আমি’। ব্যক্তির এই উত্থানের ভেতর দিয়ে রচিত হয় সময়ের ভিন্ন এক গড়ন। ক্রমে সেই গড়ন জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। এবং কবিতা এই বিপর্যস্ত ও শৃঙ্খলমুক্ত সময়কে সবচেয়ে ভালোভাবে ধারণ করার প্রত্যয় নিয়ে এগোতে থাকে সময় পরম্পরায়। কবিতার ভেতরগত কাঠামো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে অন্য এক রূপ পরিগ্রহ করে। কাগজের ওপর দৃশ্যগ্রাহ্য অবয়বের নানা ধরন রচনা করে কবির মধ্যে সেই রূপকে ধারণ করা চেষ্টা লক্ষ করা যায়। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে কবিতার ভেতরগত গড়নে কী পরিবর্তন আসে? কল্পনাপ্রতিভার যে অন্বয়ের ভেতর দিয়ে কবিতা রচিত হয় তার স্বরূপে কী ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়? সময়ের বৈকল্য ভাবনায় যে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করে তার ক্ষরণ কী ধরনের উল্লম্ফনের ভেতর দিয়ে অবয়ব লাভ করে? বিচিত্র ও বৈপরীত্যের অন্বয়-দূরান্বয় কোন কৌশলে সাধিত হয় এবং বোদ্ধতা ও দুর্বোদ্ধতার পাঠ কীভাবে রচিত হয়? এসব জিজ্ঞাসার মধ্যে আধুনিক কবিতার ভেতরগত কাঠামো এবং পাঠ ও পাঠান্তর নির্ভর করে। এবং এই ভেতরগত কাঠামোর মধ্যেই ধরা পড়েন কবি, ধরা পড়ে তার স্বাতন্ত্র্যের জগৎ। কিন্তু ভেতরের ওই কাঠামো তো অদৃশ্য কোনো ভাব বা বস্তুনিচয় নয়। তারও রূপ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ওই কাব্যভাষার মধ্যেই। তার মানে কাব্যভাষার আয়নায় কবিকে দেখা যায় কিনা, তার বোধের অনন্য জগৎ আপন স্বভাবে প্রতীয়মান হয়ে ওঠে কিনা, বোদ্ধতার মধ্যে, দুর্বোদ্ধতার মধ্যে, স্পষ্টতার মধ্যে, অস্পষ্টতার মধ্যে কবিকে পাওয়া যায় কিনা তার মধ্যেই নিহিত থাকে কবিতার ভেতরগত গড়ন। কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা যাদের আছে এবং যারা কবিতা নিয়ে ভাবেন তারা যদি কবিতার মধ্যে কবির অবয়ব চিনতে পারেন তা হলে বুঝতে হবে কবতাটি মোক্ষ লাভ করেছে। মূলত এ হচ্ছে নিজেকে দেখার আয়না তৈরি করা। কিন্তু সব কবি শব্দের ভেতর দিয়ে, ছন্দ ও ছন্দহীনতার ভেতর দিয়ে, চিত্রকল্প-রূপকল্প-দৃশ্যকল্প ও প্রতীকের ভেতর দিয়ে, আলো-আঁধার ও রঙের ব্যবহারের ভেতর দিয়ে নিজস্ব যে রীতির অভ্যুদয় ঘটান সেটাই হলো তাকে দেখার আয়না। ওই আয়নায় শুধু যে কবিকে দেখা যায় তাই নয়, পাঠক নিজের মুখও দেখতে পান বিচিত্র কোণ থেকে; আলোয়, রেখায় ও রঙে, রূপে ও রসে নিজেও অভিষিক্ত হন কবিতায়। শক্তিমান কবির এই হলো কৃতী।

কিন্তু ব্যক্তি কবির গড়নের স্থিরতা তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এই গড়ন শৈলী নয়, রীতি নয়। সুতরাং অভিন্নতা অপস্রিয়মাণতার নামান্তর। শক্তিমান কবিও কখনো কখনো এই গড়নে বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়েন। যেন ওই বৃত্তের বাইরে আর কোনো পরিধি নেই। বোধের বৃত্তে, চেতনার বৃত্তে, কাব্যভাষার বৃত্তে, অলঙ্কারের বৃত্তে এবং রূপক ও প্রতীকের বৃত্তে এমনভাবে ঘুরতে থাকেন যেন ফুরিয়ে গেছেন, যেন কল্পনা প্রতিভার শক্তি বৃত্তের টান উপেক্ষা করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। সুতরাং শক্তির বলয়ও সার্থকতার পরিমাপক। মনে হয়, সব শিল্পের ক্ষেত্রেই কাউকে কাউকে এই নিয়তি বরণ করতে হয়। কিন্তু কবিতা যেহেতু সব শিল্পের শিল্প সেহেতু কবিতার রূপ ও অরূপের সংঘাত এখানেই ধরা দেয় মর্মান্তিকভাবে। কবির জন্ম-মৃত্যুও রচিত হয় এই সংঘাতের পটভূমিতে।

advertisement
advertisement