advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

২৬/১১ : বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতে জঙ্গি হামলার দিন

ড. অরুণ কুমার গোস্বামী
২৬ নভেম্বর ২০২১ ১২:৪০ এএম | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২১ ১২:৪১ এএম
advertisement

বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী এবং বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতে এখন থেকে ১৩ বছর আগে ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর পাকিস্তান থেকে আসা লস্কর-ই-তৈয়বার জঙ্গিরা হামলা করেছিল। ভারতের মতো বাংলাদেশও অনেকবার জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। জঙ্গি হামলার ব্যাপারে সতর্ক থাকা তথা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে প্রসঙ্গক্রমে ২৬/১১ মুম্বাই হামলা সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের ১০ জঙ্গি সমুদ্র পথে এসে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত মুম্বাই নগরীতে হামলা চালিয়েছিল।

এই হামলায় জাঙ্গিরা ১৮ জন নিরাপত্তারক্ষীসহ কমপক্ষে ১৬৬ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। জঙ্গিদের হামলায় প্রায় ৩০০ জন মানুষ আহত হয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনী ৯ জন জঙ্গিকে সংহার এবং আজমল আমির কাসাব নামে পাকিস্তানের একজন জঙ্গিকে আহত অবস্থায় জীবন্ত ধরতে সক্ষম হয়েছিল। চার বছর পর ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর আদালতের রায় অনুসারে জঙ্গি কাসবের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। যদিও বলা হচ্ছে, ১০ জন জঙ্গি সেসময় মুম্বাই নগরীতে প্রবেশের পর ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।

কিন্তু জিনিউজ ব্যুরো কর্তৃক পরিবেশিত সংবাদ অনুযায়ী, জীবিত অবস্থায় ধৃত ও পরবর্তীতে ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে মৃত আজমল আমির কাসাব মৃত্যুর আগে এক চমকপ্রদ বিস্ময়কর তথ্য প্রকাশ করে। সে জানায়, ২৬/১১ আক্রমণের জন্য মুম্বাইয়ে ১৫ জন জঙ্গি প্রবেশ করেছিল। আজমল আমির কাসাবের দেওয়া এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা বাহিনী অবশিষ্ট ৫ জঙ্গিকে খুঁজছে। যেসব নিরাপত্তারক্ষী এই জঙ্গি হামলায় প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন মুম্বাইয়ের সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াডের (অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াড/এটিএস) প্রধান হেমন্ত কারকারে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন মেজর সন্দ্বীপ উন্নিকৃষ্ণন, মুম্বাই পুলিশের এডিশনাল কমিশনার অশোক কামতে এবং সিনিয়র পুলিশ ইন্সপেক্টর বিজয় সালসাকার প্রমুখ।

২৬/১১ মুম্বাইয়ে জঙ্গি হামলার ঘটনা তদন্তের জন্য ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর মহারাষ্ট্র সরকার সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিব রাম প্রধান এবং সাবেক আইপিএস অফিসার ভাপ্পালা বালাচন্দ্রনের সমন্বয়ে দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে যা প্রধান তদন্ত কমিশন নামেও পরিচিত । তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে অন্যান্য অনেক কিছুর পাশাপাশি মুম্বাই নগরীতে সন্ত্রাসী আক্রমণের সংক্ষিপ্ত পটভূমি তুলে ধরা হয়েছে। এখানে ১২টি সাংঘাতিক বোমা আক্রমণের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৯৩ সালের মার্চ এবং ২০০৬ সালের জুলাই-এর মধ্যে সংঘটিত এইসব হামলা হয়েছিল ইমপ্রোভাইজড এপ্লোসিভ ডিভাইসের সাহায্যে। আর এতে ৫১৬ জনের প্রাণহানি এবং ১৯৫২ জন আহত হয়েছিল।

১৯৯৩ সালের মার্চ মাসের সিরিয়াল বোমার আক্রমণই ছিল এইসব আক্রমণের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ধরনের। আর এতে (১৯৯৩ সালের মার্চের আক্রমণে) ২৫৭ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০০৩ সালের আগস্টে সংঘটিত গেটওয়ে এবং জাভেরি বাজার আক্রমণে ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আর ২০০৬ সালের জুলাইয়ে ট্রেন বিস্ফোরণে ১৮১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী আক্রমণ যা সমগ্র বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সেটি হয়েছিল ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর। ‘ফিদায়েন আক্রমণ” ধরনের এই আক্রমণ অন্যান্য সব আক্রমণ থেকে আলাদা এবং টাইমার ডিভাইসের মাধ্যমে বোমা আক্রমণের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। আর এই আক্রমণের তদন্তের জন্যই প্রধান তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিল।

২০০৬ সালে ট্রেনে সিরিয়াল বোমা আক্রমণের প্রেক্ষিতে মহারাষ্ট্র সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তর ২০০৬ সালের ৩১ অক্টোবর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র পুলিশ ও মিলিটারি অফিসারদের সমন্বয়ে একটি “স্টাডি গ্রুপ” গঠন করেছিল। এই স্টাডি গ্রুপ গঠনের উদ্দেশ্য ছিল মুম্বাই এবং প্রদেশের অন্যান্য বড় শহরগুলো নিরাপত্তা জোরদার করার সুপারিশমালা প্রণয়ন করা। এই স্টাডি গ্রুপকে তিন মাসের মধ্যে তাদের সুপারিশমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এই স্টাডি গ্রুপের আহ্বায়ক তৎকালীন পুলিশ কমিশনার প্রথম বৈঠক আহ্বান করেছিলেন ২০০৭ সালের ২৭ জানুয়ারি মাসে। তবে ২০০৮ সালে গঠিত দুই সদস্য বিশিষ্ট প্রধান তদন্ত কমিশনকে জানানো হয়েছে যে ২০০৬ সালে গঠিত স্টাডি গ্রুপ তখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন দাখিল করেনি।

২০০৮ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান থেকে আগত সন্ত্রাসীরা মুম্বাইয়ের বড় বড় স্থাপনা যেমন ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস রেলওয়ে স্টেশন, তাজমহল প্যালেস হোটেল, কাফে লিওপল্ড, কামা হসপিটাল, আলবেস হসপিটাল, নরিমান হাউস, এবং ওবেরয়-ট্রাইডেন্ট হোটেল। পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে লস্কর-ই-তৈয়বা জঙ্গিরা হাইজ্যাক করা একটি মাছ ধরার ট্রলারে করে মুম্বাই পৌঁছায়। মুম্বাই পৌঁছানোর পর জঙ্গিরা পুলিশ ভ্যানসহ কয়েকটি গাড়ি হাইজ্যাক করে এবং ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়। তাদের আক্রমণের প্রথম লক্ষ্যস্থান ছিল মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস রেলওয়ে স্টেশন। ভারতীয় সময় রাত ৯.২০ টায় অর্থাৎ বাংলাদেশি সময় রাত ৯.৫০ টায় কাসাব এবং অন্য একজন পাকিস্তানি জঙ্গি স্টেশনে ভিড়ের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে শুরু করে। রেলওয়ে স্টেশনের এই হামলা ৯০ মিনিট যাবৎ চলেছিল। জঙ্গিরা এখানে ৫৮ জন মানুষকে হত্যা করে এবং শতাধিক লোক আহত হয়। হামলায় অংশগ্রহণকারী জঙ্গি কাসাব এবং আর একজন জঙ্গি ইসমাইল কামা হসপিটালে হামলা চালিয়েছিল।

রেলস্টেশনে হামলার পর কাসাব এবং তার সাথে থাকা সন্ত্রাসী ইসমাইল খান কামা হাসপাতাল আক্রমণ করে। তারা পেছনের দরজা দিয়ে কামা হাসপাতালে প্রবেশ করেছিল। তবে হাসপাতালের স্টাফরা সতর্ক ছিল এবং তারা সব দরজা তালা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল। আক্রমণকারী দুই সন্ত্রাসী তখন হাসপাতালের বাইরে অবস্থানরত একটি পুলিশ টিমকে এমবুশ করে, মুম্বাই এটিএস প্রধান হেমন্ত কারকারেসহ ছয়জনকে হত্যা করে এবং পুলিশের জিপ হাইজ্যাক করে। কাসাব এবং তার সাথে থাকা সন্ত্রাসী ইসমাইল খান গিরগাঁও চৌপট্টির কাছে বাধাপ্রাপ্ত হয়। এখানে পুলিশ কনস্ট্যাবল তুকরাম ওম্বলে সন্ত্রাসীদের রাইফেলের ব্যারেল ধরে ফেলে। এ কারণে পুলিশের পক্ষে কাসাবকে ধরা সহজ হয়। অন্য সন্ত্রাসীরা নিহত হয়।

এরপর সন্ত্রাসীরা দ্বিতীয় হামলা করে নরিমান হাউজ বাণিজ্য ও আবাসিক কমপ্লেক্সে। নরিমান হাউজের হামলা ৮ থেকে ১০ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল। এখানে হামলার আগে জঙ্গিরা একটি গ্যাস স্টেশন উড়িয়ে দিয়েছিল। তারা এখানে এক রাব্বি-কে হত্যা করে এবং তিন দিনব্যাপী চলমান আক্রমণে পাঁচজন ইসরায়েলি নাগরিককে পণবন্দি করে রাখে। তবে রাব্বির দুই বছর বয়সী শিশু সন্তান বেঁচে গিয়েছিল কারণ তার ভারতীয় পালিকা সান্ড্রা স্যামুয়েলস শিশুটিকে নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। রাত ৯.৪০ টায় অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় রাত ১০.১০ টায় চার জঙ্গি জনপ্রিয় লিওপল্ড কাফে আক্রমণ করে। সেখানে রাতের খাবার গ্রহণরত মানুষদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে।

এতে ঘটনাস্থলেই ১০ জন মৃত্যুবরণ করে। এখানের আক্রমণটি ১০ থেকে ১৫ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল। সন্ত্রাসীরা এখানে দুটি ট্যাক্সিতে বোমা পেতে রাখে। ফলে বিস্ফোরণে ৫ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়। এরপর তারা তাজমহল হোটেল এবং টাওয়ার হোটেলের দিকে এগোতে থাকে। সন্ত্রাসীরা পাশের একটি দরজা ভেঙ্গে হোটেলে প্রবেশ করে। তারা এখানে প্রথমে সুইমিং পুলে যে অতিথিরা সাঁতার কাটছিল, তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। এরপর বার ও রেস্তোরার দিকে এগিয়ে যায়। দুইজন সন্ত্রাসী সামনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে এবং গুলিবর্ষণ ও গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে থাকে। চারদিনের হামলায় তারা কমপক্ষে ৩১ জনকে এখানে হত্যা করে।

সন্ত্রাসীরা তাজমহল হোটেলের কেন্দ্রীয় ডোমে বোমা পেতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে দেয়। যা পরে তাজ হোটেলের ওপর তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে কমান্ডো সেনারা ঝটিকা বেগে হোটেলে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন কক্ষে অবস্থানরত লোকজনদের উদ্ধার করে। ওবেরয়-ট্রাইডেন্ট হোটেলে দুইজন সন্ত্রাসী হামলা চালায়। তারা রেস্তোরার ভেতর দিয়ে হোটেলে প্রবেশ করে এবং জনতার ওপর আক্রমণ করে। ২৬/১১ মুম্বাই আক্রমণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার পর ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাই জঙ্গি হামলার প্রধান অভিযুক্তদের সম্পর্কে কিছু তথ্য নিচে দেওয়া হলো।

হাফিজ সাঈদ

মুম্বাই হামলার মাস্টারমাইন্ড এবং জামাত-উদ-দাওয়ার প্রধান হাফিজ সাঈদ জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত একজন দাগী সন্ত্রাসী। এটি ধারণা করা হয় যে, হাফিজ সাঈদের জামাত-উদ-দাওয়ার একটি ফ্রন্ট লস্কর-ই-তৈয়বা হচ্ছে ২৬/১১ এ মুম্বাই জঙ্গি হামলার জন্য দায়ী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাফিজ সাঈদের নামে ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। সাঈদ ২০১৯ সালের জুলাই মাসের ১৭ তারিখ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থ যোগান দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সন্ত্রাসী কাজে অর্থ যোগান দেওয়ার দুটি অভিযোগে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী আদালত তাকে ১১ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল। সংবাদমাধ্যম কর্তৃক পরিবেশিত সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ৭০ বছর বয়স্ক জামাত-উদ-দাওয়া প্রধান লাহোরের উচ্চ নিরাপত্তার কারাগার কোট লাখপত জেলে বন্দি জীবনযাপন করছে।

জাকিউর রেহমান লাকিভ

লস্কর-ই-তৈয়বার অপারেশন কমান্ডার জাকিউর রেহমান লাকিভ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সির (এনআইএ) মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাভুক্তদের একজন। ২৬ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে মুম্বাই হামলার সন্দেহভাজন যে সাত জঙ্গিকে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার করেছে লাক্ভি তাদের মধ্যে একজন। এরা ২৬/১১ মুম্বাই হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত ছিল। ২০১৫ সালের এপ্রিলে রাওয়ালপিন্ডির অদিয়ালা কারাগার থেকে লাক্ভি জামিন লাভ করেছিল।

আজমল আমির কাসাব

আজমল আমির কাসাব একমাত্র জঙ্গি, যাকে জীবিত ধরা সম্ভব হয়েছে। ক্যামেরায় গৃহীত ছবিতে তাকে ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস রেলওয়ে স্টেশনে হাতে একটি একে-৪৭ রাইফেল নিয়ে ঘোরাফেরা করার সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে তার দোষ স্বীকার করেছে, যেখানে তার কৃত অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। মহারাষ্ট্রের পুনের ইয়েরাওয়াদা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর একটি টপ-সিক্রেট অপারেশনে কাসাবকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং কারাগার প্রাঙ্গনের ভেতরে কবরস্থ করা হয়।

আবু জুনদাল

১০ পাকিস্তানি বন্দুকধারী জঙ্গির অভিযুক্ত হ্যান্ডলার জাবিউদ্দিন আনসারী এলিয়াস আবু জুনদালকে ২০১২ সালেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মহারাষ্ট্রের বীড থেকে আগত জুনদাল, পাকিস্তানি লস্কর স্কোয়াডকে হিন্দি ভাষা ব্যবহারবিধির মৌলিক বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছিল। হামলার দিনে লস্কর-এর কন্ট্রোল রুমে থেকে সে সন্ত্রাসীদের নির্দেশনা দিচ্ছিল। সে এমন আশ্চর্যজনক দাবিও করেছে যে লস্কর-ই-তৈয়বা প্রধান হাফিজ সাঈদ স্বয়ং ২৬/১১ মুম্বাই জঙ্গি হামলা চলাকালীন কন্ট্রোল রুমে উপস্থিত ছিলেন, যখন মাস্টারমাইন্ডরা মুম্বাই হামলার কোরিওগ্রাফ করছিল। ২০১৬ সালের ২ আগস্ট আবু জুনদালকে অস্ত্র রাখার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ডেভিড কোলম্যান হেডিল

পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ডেভিড কোলম্যান হেডিল ২৬/১১ জঙ্গি হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারীদের একজন। দোষ স্বীকার করার কারণে হেড্লি আমেরিকার শিকাগোর মেট্রোপলিটা কারেকশনাল সেন্টারে ৩৫ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছে।

যে নৌযানে করে সন্ত্রাসীরা মুম্বাই নগরীতে প্রবেশ করেছিল সেই ট্রলারটির নাম হচ্ছে কুবের। পরিত্যক্ত ট্রলার কুবের থেকে নিরাপত্তা বাহিনী একটি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করেছিল। এই স্যাটেলাইট ফোন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য। এই স্যাটেলাইট ফোন থেকে লস্কর-ই-তৈয়বা প্রধান ইয়াহিয়া এবং জাকি উর-রেহমানের সাথে আলাপ করার চিহ্ন পাওয়া গেছে। এই সাথে পাকিস্তানের জালালাবাদ ও মুজাফফরাবাদসহ বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার সাথে কথোপকথনের রেকর্ড পাওয়া গেছে। এটি বিশ্বাস করা হয় যে মৌরিতাস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে ইয়াহিয়া মুম্বাই অপারেশনের জন্য সন্ত্রাসীদের ভারতীয় ভুয়া পরিচয়পত্র ও সিমকার্ডের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক সন্ত্রাসী কাসাব জিজ্ঞাসাবাদে বলেছিল মুম্বাই আক্রমণে যেসব হত্যা ও ধ্বংস হয়েছে তার জন্য সে অনুতপ্ত নয়।

মুম্বাই পুলিশের কাছে সন্ত্রাসী কাসাব বলেছিল, করাচি থেকে সমুদ্র পথে মুম্বাই নগরীতে আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল প্যালেস্টাইনিদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া। আর সে কারণেই তাদের আক্রমণের প্রধান একটি লক্ষ্যস্থান ছিল নরিমান হাউজ, যেখানে সিনেগগ অবস্থিত। পাকিস্তানের ফরিদকোটের বাসিন্দা আজমল আমির কাসাব বলেছিল যে সন্ত্রাসীরা তাজ হোটেলের একটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছিল তাদের অস্ত্রশস্ত্র রাখার জন্য। মৌরিতাসের ভুয়া পরিচয় কার্ড দিয়ে তারা তাজ হোটেলের ৬৩০ নম্বর কক্ষটি বুক করেছিল। তারা মালয়েশিয়ার ছাত্র পরিচয় দিয়েছিল এবং তাদের বহু ভিজিটর আসত।

২৬/১১ মুম্বাই জঙ্গি হামলার রায়ে মুম্বাই হাই কোর্ট আজমল আমির কাসাবের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেছিল সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ছিল কাসাব ও তার সহযোগীদের দ্বারা ভারত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। এর দ্বারা ভারতের স্থিতিশীলতা সাংঘাতিকভাবে বিঘ্নিত হতো। মুম্বাই হাইকোর্ট বলেছে, ‘স্থিতিশীলতা গণতান্ত্রিক ভারতের অস্তিত্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ’। ভারতের মতো বাংলাদেশও সন্ত্রাসী আক্রমণের টার্গেট হয়েছে অনেকবার। তবে ভারতে সন্ত্রাসী আক্রমণ ও বাংলাদেশে সন্ত্রাসী আক্রমণের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো, ভারতের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর কোনটিই গোপনে অথবা প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের সমর্থন করে না।

অপরদিকে বাংলাদেশের জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হামলা যেমন রমনা বটমূলে ১লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে হামলা, যশোরে উদীচির অনুষ্ঠানে হামলা, কমিউনিস্ট পার্টির সভায় হামলা, ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় হামলা, ১৭ আগস্ট সারা দেশের ৫০০ স্থানে একযোগে বোমা হামলা, ২০১৪ সালে সারা বাংলাদেশে পেট্রল বোমা হামলা, গুলশানে হলি অর্টিজেন হামলা প্রভৃতি স্বাধীনতা বিরোধী ও অগণতান্ত্রিক অপশক্তির সমর্থন পেয়ে থাকে। জঙ্গি হামলা প্রতিরোধের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত দেশপ্রেমিক প্রতিটি বাংলাদেশের মানুষকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে কাজ করা আবশ্যক।

 

লেখক : “ইনস্টিটিউশনালাইজেশন অব ডেমোক্রাসি ইন বাংলাদেশ” গ্রন্থের লেখক; অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং পরিচালক. সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

advertisement
advertisement