advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

এবার মেয়র পদও হারালেন জাহাঙ্গীর

।ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ।সাধারণ সম্পাদক পদে আতাউল্লাহ।পঞ্চগড়ে মামলা।রাজবাড়ীর মামলা তদন্তে পিবিআই

মুহম্মদ আকবর (ঢাকা) মোহাম্মদ আলম (গাজীপুর) ও নজরুল ইসলাম (পঞ্চগড়)
২৬ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২১ ০২:৩৩ এএম
advertisement

আওয়ামী লীগ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার হওয়ার পর এবার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদও হারালেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন অভিযোগে মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে। অভিযোগের তদন্ত যতদিন চলবে, ততদিন তিন সদস্যের প্যানেল মেয়র গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে থাকবে।

গতকাল বিকালে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনও জারি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। একই দিন গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে আতাউল্লাহ মণ্ডলকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয় আওয়ামী লীগ। এদিকে রাজবাড়ীর পর এবার পঞ্চগড়ে মেয়র জাহাঙ্গীরের নামে মামলা হয়েছে।

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার সময় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘তার (জাহাঙ্গীর আলম) বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অনেক অভিযোগ দাখিল হয়েছে। সেগুলো আমলে নেওয়া হয়েছে। আইনের ধারা অনুযায়ী সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।’ জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ পড়েছেÑ এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘জমি দখলের বিষয় আছে, জনস্বার্থ পরিপন্থী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে।’ মন্ত্রী জানান, জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি কয়েক দিন আগেই করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণ হলে তাকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হবে।

গতকালই গাজীপুর সিটি করপোরেশনে তিন সদস্যের প্যানেল মেয়র গঠন করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। মন্ত্রী জানান, প্যানেল মেয়রের জ্যেষ্ঠ সদস্য মেয়রের দায়িত্বে থাকবেন। সে অনুযায়ী গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র হলেন ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আসাদুর রহমান কিরণ। তিনি এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ভারপ্রাপ্ত মেয়র হলেন। এর আগে (২০১৩-১৮ মেয়াদে) তিনি ২৮ মাস ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। কিরণ গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতিও।

ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় কিরণ বলেন, ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। এমন গুরু দায়িত্বে আমাকে মনোনীত করায় শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’ প্যানেলের বাকি দুই সদস্য হলেনÑ ৫২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল আলীম মোল্লা এবং ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট আয়েশা আক্তার।

জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া টেন্ডার, বিভিন্ন পদে অযৌক্তিকভাবে লোকবল নিয়োগ, বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে ভুয়া বিল-ভাউচারে একই কাজ বিভিন্ন প্রকল্পে দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রতিবছর হাটবাজার ইজারার অর্থ যথাযথভাবে নির্ধারিত খাতে জমা না রাখাসহ নানাবিধ অভিযোগ উত্থাপন হয়েছে। ভূমিদখল ও ক্ষতিপূরণ ছাড়া সড়ক প্রশস্তকরণসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের মতামত জানতে চাওয়া হলে অদ্যাবধি কোনো মতামত জানানো হয়নি। এসব অভিযোগ ক্ষমতার অপব্যবহার, বিধিনিষেধ পরিপন্থী কার্যকলাপ, দুর্নীতি ও ইচ্ছাকৃত অপশাসনের শামিল, যা সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী অপসারণযোগ্য অপরাধ। ইতোমধ্যে বর্ণিত অভিযোগসমূহ তদন্ত কার্যক্রম শুরু করার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন আইনের ধারামতে অপসারণের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সেকারণে সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯-এর ধারা ১২(১) অনুযায়ী সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।’

প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়Ñ সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী এই আদেশ প্রাপ্তির ৩ দিনের মধ্যে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া মেয়র ক্রমানুসারে মেয়র প্যানেলের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনে ‘মেয়র ও কাউন্সিলরগণের সাময়িক বরখাস্তকরণ’ অংশে বলা হয়েছেÑ সিটি করপোরেশনের কোনো মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হলে সরকার লিখিত আদেশের মাধ্যমে মেয়র বা কোনো কাউন্সিলরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারবে।

মেয়র এবং কাউন্সিলরদের অপসারণের বিষয়ে আইনের ১৩ (১) ধরায় বলা হয়Ñ মেয়র অথবা কাউন্সিলর পদ থেকে অপসারণযোগ্য হবেন, যদি তিনি (ক) যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া সিটি করপোরেশনের পর পর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকেন; অথবা (খ) নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে আদালতে দণ্ডিত হন; (গ) দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকার করেন অথবা শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন; (ঘ) অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন; (ঙ) নির্বাচনের অযোগ্য ছিলেন মর্মে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তিন মাসের মধ্যে প্রমাণিত হয়; (চ) বার্ষিক ১২টি মাসিক সভার পরিবর্তে ন্যূনতম ৯টি সভা গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া অনুষ্ঠান করতে বা ক্ষেত্রমতো সভায় উপস্থিত থাকতে ব্যর্থ হন। এখানে ‘অসদাচরণ’ বলতে ক্ষমতার অপব্যবহার, এ আইন অনুযায়ী বিধিনিষেধ পরিপন্থী কার্যকলাপ, দুর্নীতি, অসদুপায়ে ব্যক্তিগত সুবিধাগ্রহণ, পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি, ইচ্ছাকৃত অপশাসন, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দাখিল না করা বা অসত্য তথ্য দেওয়াকে বোঝাবে। অপসারণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে বিধি অনুযায়ী তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

এদিকে রাজবাড়ীর পর এবার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে পঞ্চগড় আদালতে মামলা হয়েছে। রাজবাড়ীর মামলাটির দায়িত্বে আছে পিবিআই। বৃহস্পতিবার সকালে পঞ্চগড় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান ও ছাত্রলীগ নেতা আশিকুজ্জামান সৌরভ। মামলাটি আমলে নিয়ে আদালতের বিচারক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হুমায়ুন কবির সরকার সিআইডিকে তদন্ত করে ৫ জানুয়ারির মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার অভিযোগে তিনি বলেন, মেয়র জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগ থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে মেয়র নির্বাচিত হয়েও দল ও দেশের ক্ষতি করে চলেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন।

এদিকে জাহাঙ্গীর আলমের স্থলে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আতাউল্লাহ মণ্ডললকে। গতকাল আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গাজীপুর মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক পদ শূন্য হওয়ায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আতাউল্লাহ মণ্ডলকে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আতাউল্লাহ মণ্ডল আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমাকে এই দায়িত্ব দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগ ও অংগসংগঠনের সব নেতাকর্মীকে সাথে নিয়ে ঐকবদ্ধভাবে কাজ করতে চাই।’

মহানগর আওয়ামী লীগের এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে থাকায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আতাউল্লাহ মণ্ডলকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলো। তিনি দীর্ঘ দিন গাজীপুর সদর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

গত সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীর আলম। তার ওই মন্তব্যের অডিও-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। মেয়রের পাশাপাশি মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে জাহাঙ্গীরকে বহিষ্কারের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে গাজীপুর মহানগরীর কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ করেন নেতাকর্মীরা। এ বিষয়ে গত ৩ অক্টোবর তাকে ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় আওয়ামী লীগ। নির্ধারিত সময়ে জবাব দেন জাহাঙ্গীর। তবে জবাবে সন্তুষ্ট হননি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। অবশেষে ১৯ নভেম্বর দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তে দল থেকে আজীবনের জন্য তাকে বহিষ্কার করা হয়। এবার গেল মেয়র পদও।

advertisement
advertisement