advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বিশ্বাসঘাতকের মুখও আর দশটা মানুষের মতো

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
২৭ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২১ ১০:৩৯ পিএম
advertisement

নির্বাক দর্শন হচ্ছে এমন একটি দর্শন যেখানে একটা প্রাণহীন জড়পদার্থের অন্তর্নিহিত সত্য মানুষের ভেতরে নতুন জীবনবোধের জন্ম দেয়। যেখানে মানুষ জড়ের কাছ থেকে শিখবে, যদিও জড়ের কোনো প্রাণ নেই। কিন্তু প্রাণ না থাকলেও জড়ের অনেক না বলা কথা থাকে। অনেক সময় জড় নিদর্শনও হতে পারে। যার উপস্থিতি অনেক কিছু বোঝাতে চাইলেও বোঝাতে পারে না। তবে সেটা মানুষ তার কল্পনা, চিন্তাশক্তি ও জীবনবোধের ধারণা দ্বারা তাড়িত হয়ে বের করে আনবে ও তার জীবনে সেটির ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটাবে। যেমন কাঠ একটা জড়পদার্থ। কাঠ যখন আগুনে পুড়ে পুড়ে মানুষের খাদ্য তৈরিতে ভূমিকা রাখবে তখন কাঠের ত্যাগের বিষয়টি মানুষ শিখবে ও তার জীবনে সেটির ইতিবাচক প্রয়োগ ঘটাবে। একইভাবে পানির কঠিন, তরল ও বায়বীয় অবস্থা থেকে মানুষ শিক্ষা নেবে যে, পরিস্থিতির পরিবর্তন যে কোনো সময় মানুষের জীবনধারাকে বদলে দিতে পারে। কখনো সেটা ইতিবাচক হতে পারে, কখনো সেটা নেতিবাচক হতে পারে। তবে সেটা নির্ভর করছে মানুষের কর্ম ও চিন্তার প্রকৃতির ওপর।

একটা বই যখন ঘরে পড়ে থাকবে, মানুষকে তখন বুঝতে হবে বইয়ের ভেতরের শৃঙ্খলিত অক্ষরগুলো মানুষকে জ্ঞানী করে গড়ে তুলতে চায়। মানুষ সে বইগুলো পড়ার জন্য আগ্রহী হবে। একইভাবে মানুষকেও অন্যকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার প্রেরণা দ্বারা প্রভাবিত হতে হবে। এমন অসংখ্য উদাহরণ হতে পারে। তবে জড়কে আবর্তিত করে সব মানুষের ভাবনা যে একইরকম হবে তা নয়। ভাবনায় বৈচিত্র্য থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভাবনার বৈচিত্র্য থাকলে সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা থাকে। জড়কে কেন্দ্র করে এটি একটি নতুন দর্শনগত মৌলিক ধারণা হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করছে মানুষের নিজের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির বৈচিত্র্যের ওপর।

একটা কাঠ পেন্সিল নিজেকে ক্ষয় করতে করতে নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত মানুষের জন্য লিখে যায় অথচ স্বার্থপর মানুষ কাঠ পেন্সিলের আত্মত্যাগকে কখনো মূল্যায়ন করে না। কাজ ফুরোলেই স্বার্থপর মানুষ সেটিকে আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে। মানুষের এই স্বার্থপরতা দেখে কাঠ পেন্সিলটা না হাসলেও প্রকৃতি উপহাসের হাসি হাসে। প্রকৃতির কাছে মানুষ তখন জড়পদার্থ হয় আর কাঠ পেন্সিলটা জীবন হয়ে ওঠে। এমন করেই এক একটা জড়পদার্থের ত্যাগের কাছে মানুষ পরাজিত হয়। মুখ থুবড়ে মাটিতে জবুথবু হয়ে নুয়ে পড়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব। এটাও একটা নির্বাক দর্শন। যেটা অনেকটা মূকাভিনয়ের মতো। যেটা সব মানুষ বোঝ না, কেউ কেউ বোঝে।

একটা কাচের আয়না মানুষকে শেখায় মানুষ কতটা অসহায়। মানুষ রঙিন পৃথিবীর অনেক কিছু দেখলেও নিজের মুখটা নিজে কখনো দেখতে পায় না। আয়নার ভেতরে মানুষ নিজের মুখটা দেখতে পায়। আসলেই কি সেটা মানুষের নিজের মুখ। নাকি আয়না মানুষকে যেভাবে দেখায় মানুষ তাকে সেভাবে দেখে। খুব অদ্ভুত একটা মনস্তত্ত্ব। জড়ের কাছে জীবনের আত্মসমর্পণ।

মানুষ হয়তো বলবে ক্যামেরাবন্দি ছবিতে সে তাকে যেমন দেখেছে আয়নার ভেতরেও তাকে তেমন দেখেছে। এটাও একটা নির্বাক দর্শন হতে পরে। থিওরিটিক্যাল একটা যুক্তি হতে পারে। সেটা কতটা সত্য, কতটা মিথ্যা তা আয়না আর ক্যামেরা জানে, মানুষ জানে না।

অথচ এই আয়না আর ক্যামেরা মানুষের মাথা থেকে বের হয়ে চিন্তা হয়েছে। তার পর চিন্তা থেকে গবেষণা হয়ে ক্রমাগত উৎকর্ষের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করতে করতে এক সময় দুটো মহামূল্যবান জড়পদার্থের রূপ নিয়েছে। আর এখন আয়না আর ক্যামেরা মানুষের মুখের জন্ম দিচ্ছে, মানুষ ভাবছে সে জন্ম নেওয়া মুখটা তার। হয়তো বা এই মুখটা সে মানুষের না যে ভাবছে তার মুখ, হয়তো এটা সে মানুষের মুখোশের মুখ।

মানুষ ক্যামেরার সামনে হাসলেও ভেতরে তার কী চলছে কে জানে। মানুষ আয়নার সামনে সুখী হওয়ার অভিনয় করলেও তার ভেতরে কী চলছে কে জানে। হয়তো আয়না আর ক্যামেরা মানুষের ভেতরটা দেখাচ্ছে, যেটা মানুষ দেখতে চায় না বলেই তার মতো করে তাকে আয়নায় দেখছে। কিংবা ছবিতে ক্যামেরাবন্দি করছে।

মানুষ আসলে নিজেকে কখনো দেখতে চায় না সেভাবে যেভাবে মানুষের কুৎসিত চেহারাটা দেখা যায়। মানুষ তাকে দেখতে চায় সেভাবে যেটা তার মধ্যে নেই। যেখানে না পাওয়ার শূন্যতা মানুষকে তিলে তিলে পোড়ায়, ইটের পরে ইটের গাঁথুনি দিয়ে যন্ত্রের মতো মানুষ বানায়। যেখানে জীবনের অস্তিত্বের সন্ধানটা খুঁজে পাওয়া যায় না। যেটা পাওয়া যায় সেটা অনেকটা সাপের ফেলে যাওয়া খোলসের মতো, মানুষের মতো নয়।

সব অদৃশ্য সুতোর মতো, অদৃশ্য মানুষের মতো, যেখানে আয়না আর ক্যামেরা তখনো দৃশ্যমান।

একটা ঘুড়ি। কত রঙের বৈচিত্র্য তার মধ্যে। লাল-নীল-সবুজ-হলুদ, আরও কত কী। ঘুড়িটা আকাশে ওড়ে যেমন আকাশে উড়ে বেড়ায় রংবেরঙের পাখি। দুটোই ওড়ে, পাখির ওড়াটা স্বাধীন হলেও ঘুড়ির ওড়াটা স্বাধীন নয়। সুতোর টান আর নাটাইয়ের নিয়ন্ত্রণ তো মানুষের হাতে। মানুষ যেমনটা চায় ঘুড়িকে তেমনটা করে উড়তে হয়। অথচ অসহায় ঘুড়ির পরাধীনতা থেকে মানুষ কখনো শিক্ষা নেয় না। সেটা নিতে পারে না বলেই মানুষ প্রতিদিন পরাধীন হয়। কখনো লোভের কাছে, কখনো ক্ষমতার কাছে, কখনো চিন্তার দৈন্যতার কাছে, কখনো মাদকের মতো জড়বস্তুর কাছে। আবার কখনো মানুষ মানুষের কাছে পরাধীন হয়। ঘুড়ির বন্দিত্বের সুতোটা দেখা গেলেও মানুষের বন্দিত্বের সুতোটা অনেক সময় দেখা যায় না। সে সুতোটা একটার পর একটা বন্দিত্বের অদৃশ্য সিঁড়ি বানিয়ে বানিয়ে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তার খবর কেউ রাখে না।

শিল্পীর মন খুব বিচিত্র হয়। সবখানেই সে নতুনত্বের সন্ধান করে। এটি করতে গিয়ে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ছবি আঁকার জন্য বেছে নিলেন বাইবেলের ‘দ্য লাস্ট সাপার’ অংশটুকুর একটি বিস্ময়কর মুহূর্ত। আঁকলেন একটা ছবি। এই ছবিটা এখন থেকে প্রায় ৪৫০ বা ৫০০ বছর আগের। তবে ছবি জড়বস্তু হলেও কথা বলে। ছবি কখনো পুরনো হয় না, ছবির কাগজটা হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্ণ হয়ে যায়। যিশুখ্রিস্ট তার বারো জন শিষ্যকে নিয়ে মৃত্যুর আগে যে শেষ নৈশভোজে অংশগ্রহণ করেন তার প্রতিফলন ঘটেছে এ চিত্রকর্মটিতে। এ ভোজে যিশু তার বারো জন শিষ্যকে নিয়ে রুটি ভাগ করে খান আর পান করেন সোমরস। ছবিটিতে মাঝখানে উপবিষ্ট যিশুখ্রিস্টকে ঘিরে শিষ্যদের শেষ নৈশভোজরত অবস্থায় দেখা যায়। এ নৈশভোজের বর্ণনার সুসমাচারের ১৩:২১ ছত্রে বলা হয়েছে, যেখানে যিশু ঘোষণা করেন তার বারো জন শিষ্যের মধ্য থেকে কেউ একজন পরদিনই তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। তাকে ধরিয়ে দেবে। যিশু তার শিষ্যদের সামনে এ কথাটি উচ্চারণের পর তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে কে সেই বিশ্বাসঘাতক। এ অভূতপূর্ব ও অকল্পনীয় ঘোষণার সন্ধিক্ষণে যিশু আর তার সঙ্গীদের মুখ ও মনের অভিব্যক্তির পরিবর্তন জলতুলির রঙকে ছাড়িয়ে যেন বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করেছে। কারও মুখে বিস্ময়, উদ্বেগ, কারও মুখে ভয়, কারও মুখে ছিল বেদনা আর কারও মুখে সন্দেহ। ছবিতে যিশুকে মাঝখানে আলাদাভাবে রেখে যিশুর বারো জন শিষ্যকে তিনজনের এক একটি দলে ভাগ করে দেখানো হয়েছে। প্রথমে ভিঞ্চি যিশুর ১২ শিষ্যের মুখ আঁকলেন। এর পর দীর্ঘ সময় অতিক্রম করলেও আঁকতে পারেননি যিশুর মুখ, কেবল এঁকেছেন যিশুর মুখহীন শরীর। মুখ আর আঁকা হয় না। তিনি দিনের পর দিন রাতের পর রাত ভাবছেন আর ভাবছেন কেমন হতে পারে যিশুর মুখ, কী অভিব্যক্তি তাতে থাকতে পারে? সৃষ্টিশীল মানুষের ভাবনার কোনো শেষ নেই, তার পরও ভাবনাকে কোনো একটা জায়গায় দাঁড় করাতে হয়। এমন একটি জায়গায় এসে শিল্পী আঁকলেন যিশুর পবিত্র ও নিষ্পাপ মুখ। সে মুখে ভয় নেই, ঘৃণা নেই, হিংসা নেই, জিঘাংসা নেই, নেই কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনা। তিনি তো জানেন সব ঈশ্বরের ছক। তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। আবেগ-অনুভূতিহীন, সত্য ও ভালোবাসার আবহে স্বর্গীয় এক মুখের ছবি আঁকলেন ভিঞ্চি। তবে ছবির বিষয়বস্তু থেকে মানুষের শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছুই আছে। শিল্পীর আঁকা জড়তার ভারে ভারাক্রান্ত একটা ছবি মানুষকে যা শেখায় তা অনেক দামি জিনিসও শেখাতে পারে না। ‘দ্য লাস্ট সাপার’ ছবিটি মানুষকে শিখিয়েছে বিশ্বাসঘাতকরা মানুষের কত কাছাকাছি থাকতে পারে, বিশ্বাসঘাতকতা কত ভয়ঙ্কর হতে পারে। বিশ্বাসঘাতকের মুখ আর দশটা মানুষের মুখের মতো হলেও তাদের মানুষ চিনবে তো? কারণ তারা রূপ বদলায়। বারবার বদলায়। তার পর সুযোগ বুঝে ফণা তুলে মানুষকে কখন, কীভাবে ছোবল মারবে সেটা বোঝার শক্তি কি মানুষের মধ্যে তৈরি হয়? মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করলেও ছবির মতো একটা জড়বস্তু কখনো মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না।

সবকিছু জড়ের মতো মনে হলেও এর ভেতরের অন্তর্নিহিত সত্যটা মানুষ কখনো খোঁজে না। কারণ মানুষ ভয় পায় কখন জড়ের ভেতরের সত্যটা বেরিয়ে এসে মানুষের ভেতরের মুখোশটা খুলে বের করে আনবে। দেহের ভেতরের কঙ্কালটা মানুষ কখনো দেখতে চায়না, হয়তো সে কারণে চামড়ার চাদরটা শরীরে পরে থাকে আমৃত্যু।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : শিক্ষাবিদ, কলাম লেখক ও লেখক

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

advertisement
advertisement