advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement

বড়দের স্বার্থের বলি কোমলমতি শিশুরা

১০ মাসে ৫০৯ খুন

সাজ্জাদ মাহমুদ খান
২৭ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২১ ০৮:১৬ এএম
প্রতীকী ছবি
advertisement

শিশুদের সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা মা-বাবা। এর পর তাদের আশ্রয় কাছের স্বজন। পৃথিবীর সব শিশুই নিষ্পাপ, কোমল। ফুলের মতো। কারও সঙ্গে তাদের কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু বড়দের ব্যক্তিস্বার্থ ও খামখেয়ালির কারণেই নিষ্পাপ শিশুকে জীবন দিতে হচ্ছে প্রায়ই। বড়দের লোভ-দ্বন্দ্বের কাছে হেরে যায় কোমলমতি শিশুর স্বস্তির পৃথিবী। অপরাধ আড়াল করতে কখনো মা কিংবা বাবাও হয়ে উঠছে খুনি।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদক, নৈতিক অবক্ষয়, পরকীয়া, সাইবার দুনিয়ার প্রতি নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তি ও পারিবারিক বিশৃঙ্খল জীবনে শিশুরা বেশি ক্ষতির শিকার। সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা পরিবারে শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলছে। কোনো শিশু জীবন হঠাৎ বিপন্ন হলে তার ভাইবোনসহ কাছের শিশুদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। শিশুদের নিয়ে কাজ করা একাধিক বেসরকারি সংগঠন বলছে, শিশুদের ওপর নৃশংসতার তথ্য সংগ্রহ এবং তা প্রতিরোধ নিয়ে গবেষণা অর্থাভাবে ঠিকমতো হচ্ছে না। শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম। প্রায় এক যুগ ধরে সংগঠনটি শিশুদের ওপর নৃশসংতার তথ্য ও ডাটা সংগ্রহ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটিতে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, গত বছরের মাঝামাঝি থেকে তাদের প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিপথে চলে যাওয়া শিশুদের মা-বাবাকে সমাজ ভালোভাবে নেয় না। বৈবাহিক জীবনের বাইরে ভিন্ন নারী-পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে সমাজে তা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এমন বাস্তবতায় অনেকেই নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। যার প্রভাব পড়ে শিশুসন্তানদের ওপর। আবার অন্যদের ফাঁসাতে মা-বাবার সন্তানকে খুন করার ঘটনাও ঘটছে দেশে।

সম্প্রতি পাঁচ বছরের ছোট্ট ফাহিমা আক্তারকে ছুরিকাঘাতে খুন করে গ্রেপ্তার হন বাবা আমির হোসেন। অন্য নারীর সঙ্গে বাবার গোপনীয়তা দেখে ফেলায় শিশুটিকে খুন করতে জন্মদাতার হাত কাঁপেনি। পল্টনে সানি খুনের ঘটনায় একই দিন গ্রেপ্তার হন নিহতের খালু চান মিয়া। শুধু ফাহিমা আর সানি নয়, গত ১০ মাসে বড়দের হাতে দেশে খুন হয়েছে ৫০৯ শিশু।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নিম্নআয় ও শিক্ষার আলো পৌঁছেনি এমন মানুষের মধ্যে শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বেশি। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটলে মনমানসিকতারও পরিবর্তন ঘটবে। তখন পারিবারিক স্বস্তি আসবে আর লোভেও বলি হবে না শিশুরা।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান আমাদের সময়কে বলেন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলছে। নৈতিকতার জায়গাও দুর্বল হয়েছে। পরিবারের একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্বের বন্ধন দুর্বল হচ্ছে। ফলে মা-বাবার হাতে সন্তান খুনের মতো ঘটনা বাড়ছে। তিনি বলেন, শিশুদের সুরক্ষায় যে আইন আছে, তার প্রয়োগও কম।

অবস্থা থেকে পরিত্রাণের ব্যাপারে তিনি বলেন, সর্বক্ষেত্রে সততার চর্চা বাড়াতে হবে। মাদকসহ সব অপরাধের ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে ধর্মের ভালো দিকগুলো চর্চার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ৫০৯টি শিশুকে খুন করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২০৫টি। ১৪৫ শিশুকে বাসা থেকে ফুসলিয়ে নিয়ে ও অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে ১২৭ শিশুকে। খুন হওয়া শিশুদের মধ্যে ১১৫ জনের বয়স ৬ বছরের নিচে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মুনতাসীর মারুফ বলেন, নৈতিকতার অভাব ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে আপনজনদের হাতে শিশুদের খুনের মতো নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটছে। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনও আগের মতো নেই। মাদক ও বিয়েবহির্ভূত নানা রকম সম্পর্কে জড়িয়ে মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। এ জন্য যেমন দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দরকার সেই সঙ্গে শাস্তির প্রচারও দরকার। আমরা অপরাধের প্রচার বেশি দেখি, শাস্তির প্রচারও করা হতো তা হলে মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করত। এ ধরনের ঘটনার কারণ ও উত্তরণের জন্য গবেষণাও দরকার।

মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক, পারিবারিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে শিশুর প্রতি নৃশংসতার মাত্রা বাড়ছে। শিশুদের প্রতি প্রতিহিংসার জন্য আকাশ সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার অনেকাংশে দায়ী।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, লোভ-লালসা, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, অনৈতিক সম্পর্কসহ নানা কারণে শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে ব্যাপক সামাজিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে, যেটি আসলে নেই। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা দরকার। মা-বাবার হাতে শিশু হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তিনি বলেন, সমাজ ও পরিবারের মধ্যে স্বার্থপরতা বাড়ছে। অনৈতিক ও আপত্তিকর কর্মকাণ্ডে মানুষ জড়িয়ে পড়ছে। এসবের কারণে পরিবারে শিশুরা অনিরাপদ হয়ে পড়ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, অপরাধীরা সব সময় দুর্বলকে টার্গেট করে। শিশুরা দুর্বল হওয়ায় লোভ ও স্বার্থের জন্য তাদের হত্যা করা হয়। আগে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ ও প্রতিশোধ নিতে শিশুদের খুন করা হতো। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ছিল। এটি ঘটত বেশিরভাগ পরিচিতজন ও স্বজনদের দ্বারা। কয়েক বছর ধরে পারিবারিক কলহের জেরে স্বামী-স্ত্রী হাতে সন্তানদের খুনের ঘটনা বাড়ছে। পারিবারিক অস্থিরতা ও অসততার কারণে শিশু খুনের ঘটনা বাড়ছে। তবে এসব ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্তও করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার হচ্ছে অপরাধীরা।

মাদকাসক্ত মা-বাবার কাছে সন্তানরা ঝুঁকিতে থাকে। সম্প্রতি আইস-ইয়াবাসহ স্নায়ু উত্তেজক মাদবসেবীদের হাতে শিশু খুনের ঘটনা বেড়েছে। নেশার কারণে তাদের সন্তানদের প্রতি মায়া ও হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। ফলে মাদক কেনার টাকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্বজন ও স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত সন্তান হত্যার মতো নৃশংসতায় গিয়ে ঠেকে। গত ৪ জানুয়ারি রাজশাহীর পুঠিয়ায় নেশার টাকা না পেয়ে স্ত্রী পলি খাতুন ও পাঁচ মাসের কন্যা ফারিহাকে বালিশ চাপা দিয়ে খুন করেন ফিরোজ মন্ডল। গত ১১ নভেম্বর গোপালগঞ্জের মকসুদপুরে স্ত্রীর কাছে নেশার টাকা চেয়ে না পেয়ে তিন মাস বয়সী সন্তান হোসেন শেখকে খুন করেন তার বাবা আলম শেখ। স্ত্রীকে ‘শিক্ষা দেওয়া’র জন্য আরও দুই সন্তানকে বিষ পান করালেও তারা বেঁচে যায়।

গত ৩০ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে পরকীয়ায় বাধা দেওয়ায় মাইশা আক্তার নামে এক মাদ্রাসাছাত্রীকে খুন করার অভিযোগ উঠেছে তার মা স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে। ৩ জুন ঠাকুরগাঁও সদরে পরকীয়ার জেরে শিশুপুত্রকে খুন করেন তার মা জান্নাতা। একই কারণে রাজধানীতে ৩০ আগস্ট স্ত্রী ও শিশুপুকে খুন করেন আবদুল ওয়াহিদ। ১ জুলাই স্বামীর হাতে খুন হন বরগুনার সুমাইয়া ও তার মেয়ে সামিরা আক্তার জুঁই।

২৫ এপ্রিল মাদারীপুরের কালকিনিতে শিশুসন্তানকে গলা কেটে হত্যা করে এক ব্যক্তি। কুষ্টিয়ায় এক ব্যক্তি খুন করে স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে।

অন্যকে ফাঁসাতে শিশু খুন : বাগেরহাটের শরণখোলায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ৪ এপ্রিল ভাইকে ফাঁসাতে চার মাস বয়সী শিশুকন্যাকে পুকুরে ফেলে হত্যা করে বাবা মজিদ মোল্যা। ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শিশুসন্তান তুহিনের গলা, দুই কান ও যৌনাক্ত কেটে হত্যা করে তার বাবা ও চাচারা। মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ পর্যায়ে।

জাতীয় মসজিদের বায়তুল মোকারমের পেশ ইমাম মুফতি মিজানুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, সমাজে ইসলামের সঠিক শিক্ষা ও চর্চার অভাব রয়েছে। সন্তানের প্রতি মা-বাবার দায়িত্ব কিংবা মা-বাবার প্রতি সন্তানের যে দায়িত্ব ইসলাম দিয়েছে সেটি অধিকাংশ মানুষ জানে না, যারা জানেন তাদের অনেকেই মানেন না। ইসলামের সঠিক চর্চা থাকলে সন্তান হত্যা তো দূরে থাকুক কারও কোনো ক্ষতি করার সাহস কারও মনে আসত না। কারণ আল্লাহর কাছে একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, আমাদের সমাজ ও পরিবার শিশুবান্ধব নয়। স্বজনদের হাতে শিশু নির্যাতন এ দেশে খুবই স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। হত্যার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় শিশু হত্যা দিন দিন বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সামাজিক সংগঠনকে দায়িত্ব নিয়ে শিশুদের জন্য স্বস্তি সঙ্গে বাসযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।