advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement

এলাকার উন্নয়নে জীবন ‘বাজি’ রাখলেন ঋতু

মানিক ঘোষ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
৩০ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০২১ ০২:০৬ এএম
advertisement

দেশের প্রথম হিজড়া হিসেবে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের সাদিয়া আখতার পিংকী। তারই পথ ধরে দেশের প্রথম হিজড়া হিসেবে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করলেন নজরুল ইসলাম ঋতু। পিংকীরই জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ঋতু বিজয়ী হন নৌকার প্রার্থীর চেয়ে দ্বিগুণ ভোট পেয়ে। তার পরিবারের সদস্যরাও অবশ্য আওয়ামী লীগের সমর্থক।

নজরুল ইসলাম ঋতু কালীগঞ্জ উপজেলার দাদপুর গ্রামের আবদুল কাদেরের সন্তান। তার আরও তিন ভাই ও তিন বোন রয়েছে। জন্মের পর হিজড়ার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাওয়ার পর অর্থাৎ পাঁচ বছর বয়সেই তাকে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে যেতে হয়। সামান্য লেখাপড়া করলেও সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতায় প্রাথমিকের গ-ি পেরোনো সম্ভব হয়নি। ছোটবেলা থেকেই ঢাকার ডেমরা এলাকায়

তার দলের গুরুমার কাছে বেড়ে ওঠেন। গুরুমার পরের দায়িত্বটাই তিনি দেখভাল করেন। তবে ঢাকায় থাকলেও পরিবারের টানে প্রায়ই গ্রামের বাড়ি আসতেন। ১৫ বছর ধরে তিনি ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের অসহায় মানুষকে আর্থিক সহযোগিতা করে আসছেন। দুটি মসজিদসহ বিভিন্ন মন্দিরের উন্নয়নেও দান করেছেন তার কষ্টার্জিত অর্থ। এলাকার কেউ অসুস্থ বা কন্যাদায়গ্রস্ত হয়ে তার কাছে গিয়ে কখনো বিমুখ হতে হয়নি। আর এভাবেই এলাকায় তার পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এখন তার বয়স ৪৩ বছর। বাকি সময়টা মানুষের জন্য কাজ করে এলাকাতেই কাটি দিতে চান ঋতু।

বিজয়ের পর গত রবিবার রাতে আমাদের সময়কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে নজরুল ইসলাম ঋতু বলেন, ‘আমি কখনো সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করিনি। তবে আমার পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগ করেন। বাবা মারা যাওয়ার সময় বলেছিলেন- জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের জন্য অনেক কিছু করেছেন। যতদিন বাঁচবেন, তার আদর্শ ধরে রেখেই কাজ করবেন। তবে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেলেও এলাকার মানুষ ভালোবেসে আমাকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছিল। সমাজের একজন অবহেলিত মানুষ হয়েও এলাকার লোকজন আমাকে ভালোবেসেছেন। তাদের ভালোবাসার ভোটেই আজ আমি বিজয়ী হয়েছি। তাদের এই ঋণ আমি কোনো দিন ভুলব না। অবহেলিত এলাকার উন্নয়নে জীবনবাজি রেখে কাজ করব। মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে দেব। এ গ্রামেই আমার জন্ম। এখানে আমার পরিবার বেড়ে উঠেছে। তাদের পাশে থেকে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই।’

ত্রিলোচনপুর ইউপি নির্বাচনের ভোট হয় গত রবিবার। ৯টি ভোটকেন্দ্রে স্বতন্ত্র প্রার্থী নজরুল ইসলাম ঋতু আনারস প্রতীকে ৯ হাজার ৫৫৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ছানা নৌকা প্রতীকে পান ৪ হাজার ৫২৯ ভোট। শুধু তাই নয়, উপজেলার ১১ ইউনিয়নের মধ্যে চেয়ারম্যান পদে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েও রেকর্ড গড়েছেন ঋতু। তবে নির্বাচন করতে গিয়ে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তার সমর্থকদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে বারবার। কিন্তু প্রশাসন কঠোর থাকায় সুষ্ঠু ভোট হয়েছে। এতে তিনি নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞ। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ঋতু বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সম্প্রদায়কে (তৃতীয় লিঙ্গ) ভোটের অধিকার দিয়েছেন। তার অবদানের কথা আমরা কোনো দিনও ভুলব না। আর সে কারণে আজ আমি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পেরেছি।’

ঋতুর আরও তিন ভাই ও তিন বোন রয়েছেন। ভাইয়েরা ঢাকায় থাকেন, আর বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। ভাইবোনদের মতো স্বাভাবিক পুরুষ কিংবা নারী না হলেও জীবন নিয়ে কোনো দুঃখ নেই ঋতুর, ‘আল্লাহ আমাকে সুস্থভাবে পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রেখেছেন এতেই আমি সন্তুষ্ট। তবে সব থেকে বেশি কষ্ট পাই যখন শুনি- আমার এলাকার কেউ অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না, মেয়ে বিয়ে দিতে পারছেন না। এখন বিজয়ী হতে পেরে এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারব- এটিই আমার শান্তি।’