advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ সংকট ও সম্ভাবনা

মাহফুজুর রহমান
৩ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২ ডিসেম্বর ২০২১ ১০:১২ পিএম
advertisement

বাংলাদেশ বিনিয়োগের অমিত সম্ভাবনার দেশ- এ কথা যেমন ঠিক, আবার এ দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বাধাও অনেক, এ কথাও ঠিক। তবে সুখের কথা হলো, বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বানের ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা দৃশ্যমান আছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে হয়ে গেল একটি বিনিয়োগ সম্মেলন। শ্রমিকের নিম্ন মজুরি হার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এ দেশে বিনিয়োগের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমরা যদি পেছনের দিকে তাকাই তা হলে লক্ষ করব যে, ২০০৬ সাল থেকে ২০২০ সময়কালে দেশে মোট ২ হাজার ৫৫০ কোটি ৮৫ লাখ ডলার ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা এফডিআই এসেছে। এর মধ্যে মূল পুঁজি এসেছে ৯১২ কোটি ১০ লাখ ডলার- যা মোট বিনিয়োগের ৩৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। বাকি ৬৪ দশমিক ২৪ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে মুনাফা ও ঋণ থেকে। মানে মূল বিনিয়োগ ছিল এক-তৃতীয়াংশ।

আন্তর্জাতিক নীতি অনুসারে বিদেশি কোনো কোম্পানি তিনভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারে বা পুঁজি খাটাতে পারে। এগুলো হচ্ছে- ১. মূলধন হিসেবে নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশে প্রেরণ বা শিল্পের যন্ত্রপাতি সরবরাহের মাধ্যমে পুঁজি বিনিয়োগ, ২. বাংলাদেশে ইতোমধ্যে পরিচালিত কোনো ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত প্রত্যাবাসনযোগ্য মুনাফা বিদেশে না নিয়ে বাংলাদেশে পুনরায় বিনিয়োগ এবং ৩. একটি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে ব্যবসারত অন্য একটি বিদেশি কোম্পানি থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা।

আমরা যদি সাম্প্রতিককালের বিনিয়োগের দিকে তাকাই তা হলে দেখতে পাব, ২০১৭ সালে এ দেশে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ২১৫ কোটি ১৬ লাখ ডলার। ২০১৮ সালে তা বেড়ে ৩৬১ কোটি ৩৩ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। কিন্তু ২০১৯ সালে আবার বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ কমে আসে। এ বছর বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এই নিম্নমুখী গতি ২০২০ সালেও অব্যাহত থাকে এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ নেমে আসে ২৫৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলারে। শেষোক্ত দুবছর বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণ অতি সুস্পষ্ট। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলেই দেশে-বিদেশে বিনিয়োগকারীরা অতি সাবধানে এগোতে চাচ্ছেন। করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতির গতি কীরূপ হয়, কোন খাতে বা কোন দেশে বিনিয়োগ অধিকতর লাভজনক দাঁড়ায় এসব বিষয়ে অনেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এই অনিশ্চিত ও ঝুঁকিবহুল ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে অতি সাবধানী হয়ে উঠেছেন বিনিয়োগকারীরা, যা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আজকাল বিশ্বব্যাপী আলোচনা হয়। দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাওয়ার রহস্য উন্মোচনে অনেকেই তৎপর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকায়ও বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মজুরির স্বল্পতা, কর্মক্ষম যুবশক্তির সহজলভ্যতা এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় হারের কারণেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হচ্ছেন। বলা যেতে পারে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশই বিনিয়োগের প্রধান আকর্ষণ বলে অনেকেই ভাবছেন।

রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অদক্ষতা, সম্পদের অপব্যবহারের প্রবণতা এবং পরিবর্তনশীল বাজার ও ভোক্তা চাহিদা নির্ধারণে অক্ষমতা সরকারকে উদ্বুদ্ধ করেছে ব্যাপকভাবে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল হতে। আর সেজন্যই সরকার বাজার অর্থনীতি প্রবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন করে চলেছে। এর ফলে একটি সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সরকার বাজার অর্থনীতির ওপর আস্থা ও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং ধাপে ধাপে শিল্প ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে নিজের সম্পৃক্ততা থেকে সরে আসছে।

সরকার নানা সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এবং সবার জন্য উন্মুক্ত বিনিয়োগ নীতি প্রণয়ন করেছে। এখানেও সরকার নিয়ন্ত্রণের বদলে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। একই সঙ্গে টেক্সটাইল, চামড়াজাত সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য, রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যাল, কৃষিভিত্তিক শিল্প, কাঁচাপাট, কাগজ, রেশমশিল্প, হিমায়িত খাদ্য (প্রধানত চিংড়ি), পর্যটন, কৃষি, ক্ষুদ্রশিল্প, সফটওয়্যার ও ডাটা প্রসেসিং জাতীয় রপ্তানিমুখী শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ছাড়া ভারী ও তথ্য-প্রযুক্তির শিল্প প্রতিষ্ঠায়ও বিদেশি বিনিয়োগকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা যেসব সুবিধা পেয়ে থাকেন সেগুলো হলো- শতভাগ সরাসরি বিনিয়োগ করার সুযোগ। অর্থাৎ একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী ইচ্ছে করলে বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে সঙ্গে না রেখেও এককভাবে সরাসরি বিনিয়োগ করতে পারেন। বিদেশিরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকাতে বা এর বাইরে বিনিয়োগ করতে পারেন। তাদের বিনিয়োগ বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জে বিভিন্ন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমেও করা যায়। অবকাঠামোগত খাত, যেমন বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধান, টেলিযোগাযোগ, বন্দর, সড়ক ও জনপথ নির্মাণেও বিনিয়োগ করতে পারেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। বেসরকারিকরণে প্রক্রিয়াধীন কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারও বিদেশিরা কিনতে পারেন। তা ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেসরকারি ইপিজেডে বিনিয়োগ করতে পারেন।

বেসরকারি উদ্যোগে রপ্তানিমুখী ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সেবা ও সহযোগিতা করার জন্য দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাতে। এই প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগের লক্ষ্যে নানা ধরনের কাজ সম্পাদন করে। তারা বিভিন্ন সময়ে সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে।

সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় দুই দিনের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, ভারত, সৌদি আরব, তুরস্ক, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের ১৫টি দেশের প্রতিনিধিরা যোগদান করেন। অবকাঠামো, পুঁজিবাজার ও আর্থিক সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন, চামড়া, স্বয়ংক্রিয় ও হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ, পাটবস্ত্র এবং সমুদ্র অর্থনীতি- এই ১১টি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হয়েছে। বাছাইকৃত খাতগুলো বৃহদাকৃতির এবং বিপুল সম্ভাবনাময়। এগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা তুলনামূলকভাবে সহজ। তা ছাড়া এসব খাতে বাংলাদেশে বিপুল সম্ভাবনার কথা কে না জানে! আগত বা ভার্চুয়ালি যোগদান করা অতিথিদের অনেকেই বাংলাদেশে অর্থ বিনিয়োগের জন্য উৎসাহ দেখিয়েছেন। আমাদের জন্য এটা নিঃসন্দেহে আশার।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবসা শুরু করার জটিলতা বাস্তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। পর্যায়ক্রমে সংস্কার উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করার পদ্ধতিটি সহজতর করা প্রয়োজন। দেশে দুর্নীতি অনেক ক্ষেত্রেই মজ্জাগত দোষে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো সরকারি অফিসে দুর্নীতির শেকড় এতটাই গভীরে চলে গেছে যে, ঘুষ ছাড়া এসব অফিসে কেউ কাজ করাতে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারে না। দেশে দুর্নীতির এই বিষধর ফণাটি একেবারে নির্মূল করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজনে দুদককে আরও শক্তিশালী করতে হবে, দুদকের কর্মকর্তাদের দেশে-বিদেশে কার্যকর প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে অধিকতর দক্ষতর করে তুলতে হবে। সর্বোপরি দেশি উদ্যোক্তাদের অনুকূলেও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। দেশের ভেতরে যদি ব্যবসায়িক চঞ্চলতা দেখা যায় তা হলে এখানে ব্যবসায়ের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হবে। সে ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অধিকতর আকৃষ্ট হবেন এবং তাদের বিনিয়োগ বা আগমন অর্থবহ হবে। বাংলাদেশ আগামী ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের সিঁড়ি টপকে উন্নয়নশীল দেশের ঠিকানায় পৌঁছে যাবে। তখন বাংলাদেশকে আরও অনেক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে হবে। তাই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বানসহ অন্য সব দিকেই আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। বাংলাদেশ হবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বর্গরাজ্য এবং তাদের এক নম্বর ঠিকানা- এমন কথাই বলছেন অনেকে। আমরা উন্মুখ হয়ে সেদিনের প্রত্যাশায় রইলাম।

মাহফুজুর রহমান : ভাইস চেয়ারম্যান, এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement
advertisement