advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধ

ড. অরূপরতন চৌধুরী
৩ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২ ডিসেম্বর ২০২১ ১০:১২ পিএম
advertisement

জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় হুমকি ‘তামাক’। সস্তা মূল্য, সহজলভ্যতা, তামাক কোম্পানির প্রলুব্ধকরণ কার্যক্রম ও নানা কারণে দেশের জনগণের মধ্যে তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের বিদ্যমান হার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সন্তোষজনক নয়। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭-এর তথ্য অনুসারে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে ৩৫.৩ শতাংশ (৩ কোটি ৭৮ লাখ) তামাকজাত দ্রব্য সেবন করে। টোব্যাকো অ্যাটলাস ২০১৮-এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে তামাকজনিত রোগে (ক্যানসার, হৃদরোগ, স্টোক, ফুসফুসের রোগ ইত্যাদি) আক্রান্ত হয়ে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। তা দেশে মোট মৃত্যুর ১৩.৬ শতাংশ। সড়ক দুর্ঘটনা, মহামারী বা যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির চেয়ে তামাকজনিত কারণে কয়েকগুণ বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। এসব তামাক জাতীয় ক্ষতিকর পণ্য সেবনের কারণে অনেক অসংক্রামক রোগের বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। দরিদ্র জনগণ তামাকজাত পণ্যের ভোক্তাদের একটি বিরাট অংশ। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই তামাক সেবনকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ-শোক দিন দিন বেড়েই চলেছে। এসব রোগের চিকিৎসায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়। এর প্রায় পুরোটাই ব্যয় করতে হয় আক্রান্ত ব্যক্তিকে। তাই দরিদ্রতা, অপুষ্টিতে ভুক্তভোগী মানুষের সংখ্যাও কমছে না সহসাই। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও অন্যান্য সংস্থা পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে তামাকের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। ওই বছরে তা ছিল জিডিপির ১.৪ শতাংশ!

দেশে অন্যতম বড় সামাজিক সমস্যা ‘মাদকাসক্তি’। এর মূল অনুঘটক ‘তামাক’। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের ৯৫ শতাংশই ধূমপায়ী অর্থাৎ ধূমপান দিয়েই তারা নেশার জগতে পা বাড়ায়। তামাকের ক্ষয়ক্ষতি থেকে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সুরক্ষাকে প্রধান্য দিয়ে বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত প্রসংশনীয়। তামাক নিয়ন্ত্রণে সামাজিক আন্দোলনটি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে। বিগত দিনে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, বিধিমালা প্রণয়ন, জনগণের মধ্যে তামাকবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং বর্তমানেও চলমান রয়েছে। এখন দীর্ঘমেয়াদে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে। ২০১৬ সালে ‘সাউথ এশিয়ান স্পিকার সামিট’-এ বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ দেখতে চান মর্মে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাই সময়ের প্রয়োজনে এখন আরও পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ থেকে সরকারের শেয়ার প্রত্যাহার।

বহুজাতিক তামাক কোম্পানি বিএটিতে সরকার ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। জনস্বাস্থ্য, পরিবেশবিধ্বংসী পণ্যের ব্যবসায় সরকারের অংশীদারিত্বের বিষয়টিকে অনেকেই সরকারের দ্বৈতনীতি হিসেবে দেখছেন। কারণ তামাক নিয়ন্ত্রণে প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশ সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক তামাক নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এফসিটিসিতে স্বাক্ষরের পর তামাক নিয়ন্ত্রণে আমাদের সাফল্যের ঝুঁড়িতে বেশকিছু অর্জন রয়েছে। বর্তমান সরকারপ্রধান তামাক নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত ইতিবাচক। এমতাবস্থায় তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার ও নিরুৎসাহিত, ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবসা থেকে লভ্যাংশ গ্রহণ সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টাকে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনগণ। কেননা তামাক নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অজানা কারণে বিলম্বিত হচ্ছে। এর দরুন সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং এ নীতিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নেও যথেষ্ট ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুসারে ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নে একটি ‘রোডম্যাপ’ প্রণয়নের কাজ ৩ বছরের অধিক ধরে চলমান রয়েছে। জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনটিসিপি) প্রণয়নের বিষয়টিও আলোচনায় আছে অনেক দিন ধরে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন আরও নীতি যেমন- তামাক চাষনীতি, এফসিটিসি আর্টিকেল ৫.৩ বাস্তবায়নে ‘গাইডলাইন’ প্রণয়নের কাজ চলমান বলে জানা গেছে। কিন্তু এ নীতিগুলো কবে নাগাদ চূড়ান্ত হবে, তা নিয়ে সন্দিহান দেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের কর্মীরা। কেননা বিএটিবিতে সামান্য শেয়ার থাকায় সরকারের উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তাকে বিএটির পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব করতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই তারা জনস্বার্থের পাশাপাশি তামাক কোম্পানির স্বার্থ সিদ্ধির বিষয়টি খুব ভালোভাবে দেখবেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তামাক কোম্পানির লাভের পাল্লাটাই ভারী হয়ে থাকে। তামাক কোম্পানিতে শেয়ার ও সরকারি কর্মকর্তার প্রতিনিধিত্ব থাকার ফলে-

১.আইন/নীতিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় তামাক কোম্পানি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে থাকে। ফলে আইন/নীতি দুর্বল হয়ে থাকে এবং এসব নীতি প্রণয়ন ও চূড়ান্তকরণ প্রত্রিয়া বিলম্বিত হয়ে থাকে। ২। আন্তর্জাতিক তামাক নিয়ন্ত্রণ চুক্তির (এফসিটিসি) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে এবং এর প্রতিপালনে বাধা সৃষ্টি করে। ৩। জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আইন/নীতিতে জনগণের স্বার্থ সংকুচিত এবং এর প্রয়োগ দুর্বলতর হয়। ৪। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিভ্রান্তকর তথ্য প্রদানের মাধ্যমে তামাক কোম্পানিগুলো নিজ স্বার্থ হাসিল করে। ৫। ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘনে উৎসাহী হয়। ৬। সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক কর্মসূচির আড়ালে তামাক কোম্পানিগুলো তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করে। ৭। জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, তামাক নিয়ন্ত্রণ কমসূচি ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল হয়ে পড়ে।

৮। জনগণের মধ্যে একটি সন্দেহ তৈরি হয়। তা লক্ষ্য সামনে নিতে বাধা সৃষ্টি করে ইত্যাদি।

তামাক কোম্পানিতে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব থাকার নেতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হয়েছে গত বছরে। করোনাকালে যখন উৎপাদনমুখী সেক্টরগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ এবং কঠোর লকডাউনের সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বিপণন বন্ধ থাকলেও তামাক পণ্য উৎপাদন, বিপণন, এমনকি আইন লঙ্ঘন করে তামাক পণ্যের বিজ্ঞাপন, প্রচারনা বন্ধ ছিল না! কারণ শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ অনুমোদন নিয়ে তারা এ কাজ চালিয়ে গেছেন। অবশ্য এখানে আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তা হলো অতিপুরনো আইন ‘এসেনসিয়াল কমিউডিটি অ্যাক্ট ১৯৫৬’-তে তামাক এখনো ‘জরুরি পণ্য’ হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তা বাতিল করা বর্তমানে অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।

শিশু-কিশোর ও তরুণদের ধূমপানে আসক্ত করতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন (বিশেষ করে তামাক পণ্যের কৌশলী বিজ্ঞাপন, প্রচারণা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতামূূলক কাজ) তামাক কোম্পানির ব্যবসা প্রসারের প্রধান হাতিয়ার। আইনের কার্যকর প্রয়োগের অভাব ও তামাক কোম্পানিতে সরকারি শেয়ার বিদ্যমান থাকায় তা অনেকাংশে ঠেকানো যাচ্ছে না। তবে সরকারপ্রধান ও প্রশাসন যথেষ্ট আন্তরিক। এ ক্ষেত্রে জেলা-উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটিগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

সরকার একদিকে তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করছে আবার অন্যদিকে এসব পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহিত করছে। এটিও এক ধরনের দ্বৈতনীতি। সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রপতির শিল্প উন্নয়ন পুরস্কার’ প্রদানের ক্ষেত্রে তামাক কোম্পানিকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও এ বছর আবারও তামাক কোম্পানিকেই পুরস্কৃত করা হয়েছে! এ ক্ষেত্রেও তামাক কোম্পানির প্রভাব সুস্পষ্ট।

‘স্থানীয় সরকার বিভাগের তামাক নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা’ বর্তমানে তামাক নিয়ন্ত্রণ কমিউনিটিতে বেশ আলোচিত। বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্য বিক্রি ও বিপণন নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। তাই যেখানে-সেখানে এই পণ্যগুলো পাওয়া যায়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে ২০১৮ সালে প্রণীত এ নীতিতে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রিতে ‘লাইসেন্সিং’ ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং স্কুল-কলেজের আশপাশে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধের বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ নীতিটি প্রয়োগেও বাধা সৃষ্টি করছে তামাক কোম্পানিগুলো।

বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি অধিকতর শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে সংশোধনের কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জের অর্থে ‘জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি’ প্রণয়নের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। এই কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে পারলে তামাক নিয়ন্ত্রণে ভালো ফল বয়ে আনতে পারে। তবে তামাক কোম্পানি যাতে এখানে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, এদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যেহেতু এফসিটিসিটি এ ক্ষেত্রে সহায়ক, সেহেতু এফসিটিসির আর্টিকেল ৫.৩ অনুসারে একটি ‘গাইডলাইন’ প্রণয়ন করাও জরুরি হয়ে পড়েছে এবং এটি সময়ের দাবি।

সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার ও তাদের পরিচালনা পর্ষদে সরকারি প্রতিনিধিত্ব তামাক নিয়ন্ত্রণে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তাই জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় এবং নৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করার স্বার্থেই সরকারকে এ অবস্থান থেকে সরে আসা উচিত। শেয়ার যেহেতু ৩০ থেকে ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে, সেহেতু সামান্য এ শেয়ার তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারপ্রধানের ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ জন্য অতিদ্রুত বিএটি থেকে সরকারের বাকি শেয়ার প্রত্যাহার করা উচিত। এতে বিশ^দরবারে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। প্রধানমন্ত্রী তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবেন।

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী : মুক্তিযোদ্ধা ও শব্দসৈনিক (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র) এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)

advertisement
advertisement