advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

পাহাড়ে উন্নয়নের সুবাতাস

খায়রুল আলম
৪ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৩ ডিসেম্বর ২০২১ ১১:১২ পিএম
advertisement

পাহাড়ের শান্তিচুক্তি দুই যুগ ২ ডিসেম্বর পদার্পণ করেছে। দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি-পাহাড়িদের সঙ্গে বাঙালি ও সরকারি বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২৪ বছর আগে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়। চুক্তির পর আশা করা হয়েছিল, এটি কার্যকর হলে পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইবে, গতি আসবে অর্থনীতিতে। গত ২৪ বছরে এ আশা অনেকটাই পূরণ হয়েছে। বদলে গেছে স্থানীয়দের জীবনযাপন ব্যবস্থা। সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পাল্টে দিয়েছে ওই এলাকায় বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার।

চুক্তির আগে পর্যটকরা পার্বত্য জেলায় যেতে ভয় পেতেন। শান্তিচুক্তির পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় এখন পর্যটকরা নির্দ্বিধায় পাহাড়ে বেড়াতে আসছেন। আগে অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে তেমন একটা গতি না থাকলেও এখন সে গতি কয়েকগুণ বেড়েছে। এর আগে দুই দশক স্বাভাবিক জীবনযাত্রার চাকা বন্ধ ছিল। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় পার্বত্য এলাকা তার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পায়; সমসাময়িক কালে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সফল রাজনৈতিক পরিসমাপ্তি আমাদের দেশের জন্য এক বিরল অর্জন হিসেবে গণ্য হয়। এ কারণে শেখ হাসিনার ইউনেস্কো পুরস্কারপ্রাপ্তি ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অনন্য অবদানের স্বীকৃতি।

পার্বত্য এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এ ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে অস্ত্র সমর্পণের মাধ্যমে চুক্তির স্বাক্ষর হয়, যা পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বা শান্তিচুক্তি নামে পরিচিতি পায়।  সরকারের দাবি চুক্তির বেশিরভাগ ধারা বাস্তবায়ন হয়েছে। আর অবাস্তবায়িত ধারাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হবে এবং এর জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ দরকার। অন্যদিকে শান্তিচুক্তির পর দুই যুগে  বেশ কিছু বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হয়েছে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজ। যোগাযোগ খাতে হয়েছে উন্নতি। বাঘাইছড়ির সাজেকে পর্যটকদের জন্য নির্মিত হয়েছে টু স্টার মানের হোটেল ও থ্রি স্টার মানের পর্যটন কমপ্লেক্স। আগে কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরতে না পারলেও এখন জেলেরা ইচ্ছেমতো মাছ শিকার করতে পারেন। শান্তিচুক্তির পর কাপ্তাই হ্রদে মাছ শিকার কয়েকগুণ বেড়েছে। অর্থনীতিতে কাপ্তাই হ্রদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চুক্তির আগে সরকার এই হ্রদ থেকে ১ কোটি টাকাও রাজস্ব পেত না।

এখন প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করছে সরকার। রাঙামাটির কয়েক হাজার পরিবার এখন কাপ্তাই হ্রদের ওপর নির্ভরশীল। পাহাড়ে জুম ফসল উৎপাদন বেড়েছে। জুমের ফসল আগে বাজারে নিয়ে যেতে বিভিন্ন বিড়ম্বনার শিকার হলেও বর্তমানে তা অনেকটা লাঘব হয়েছে। আগে জুমের ফসল বেশিরভাগই পথে নষ্ট হয়ে যেত, বর্তমানে পথে তল্লাশি তেমন একটা না থাকায় জুমের ফসল বাজারে অনায়াসে বিক্রি করতে পারছেন পাহাড়ি চাষিরা। চুক্তির পর যে খাতটি সবচেয়ে বেশি উন্নতি লাভ করেছে তা হচ্ছে কাঠ ব্যবসা।

চুক্তির পর এ অঞ্চলে কাঠ ব্যবসা কয়েকগুণ বেড়েছে। পাহাড়ের ভেতর আগে গাছের বাগান না কিনলেও এখন ব্যবসায়ীরা বাগান কিনছেন। এতে বাগানিরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। শিক্ষা, যোগাযোগ ও নিরাপত্তাসহ প্রতিটি বিষয়ে উন্নতি হওয়ায় রাঙামাটিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জেলায় সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের উন্নয়নে নতুন ১০টি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দহীনভাবে সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্তির জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেই সঙ্গে চলমান ১৯টি প্রকল্পেও চাওয়া হয়েছে বরাদ্দ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি পাহাড়ি জনগণের বিশেষ অবস্থান ও মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছে। এই শান্তিচুক্তির আওতায় তিন পার্বত্য জেলার স্থানীয় সরকার পরিষদ সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদের গঠন কাঠামো হলো : চেয়ারম্যান ১, সদস্য (আদিবাসী) পুরুষ ১২, সদস্য (আদিবাসী) মহিলা ২, সদস্য (অ-আদিবাসী) পুরুষ ৬, সদস্য (অ-আদিবাসী) মহিলা ১। চুক্তিতে একজন উপজাতিকে প্রধান করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক কার্যক্রম দেখাশোনার জন্য একটি উপজাতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের কথা বলা হয়েছে। উপজাতিদের ভূমি মালিকানা অধিকার নির্ধারিত হলে তাদের ভূমি ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ উদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভূমির ওপর মালিকানা নির্ধারণের জন্য ভূমি জরিপব্যবস্থা পরিচালিত হবে।

আজ উপজাতীয় জনগণের প্রতিটি ঘরে শিক্ষিত তরুণ যুবক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের আশা-আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণে সর্বদা সচেষ্ট। পার্বত্য অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের কোনো অগণতান্ত্রিক ও জনবিরোধী উদ্যোগ নেই। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগ পেয়েছেন। ভূমি কমিশন গঠন ও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিল ২০১০’ জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের অখ-তা রক্ষার জন্য উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ধারণা সবাই মেনে নিয়েছে। আমরা মনে করি, শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার প্রচেষ্টাকে সহায়তা ও সমর্থন করা সেখানকার উন্নয়নের জন্য জরুরি।

চলমান বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকা- সফলভাবে পরিচালনার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত থেকে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অপরিহার্যতা লক্ষ করা যায়। তবে শান্তিচুক্তিতে বর্ণিত সব নাগরিকের অধিকার সমুন্নত রাখার প্রত্যয় বাস্তবায়নে পাহাড়ি-বাঙালির যৌথ প্রচেষ্টা দরকার।

খায়রুল আলম : যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)

advertisement
advertisement