advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement

পর্যটনে সম্ভাবনার হাতছানি
গুচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে পাল্টে যাবে কুয়াকাটার চিত্র

মুজাহিদ প্রিন্স,পটুয়াখালী
৪ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৪ ডিসেম্বর ২০২১ ০৮:৫২ এএম
করোনাপরবর্তী পর্যটকদের পদচারণায় মুখর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। ছবি : আমাদের সময়
advertisement

করোনা মহামারীর ধকল কেটে কুয়াকাটা পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি। ইতিমধ্যে ছুটির দিনগুলোয় পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। তবে করেনাকালীন দীর্ঘ লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হোটেল মোটেল ও রেস্তোরাঁর মালিকসহ বিশাল একটির অংশ বর্তমানে মূলধন সংকটে রয়েছেন। সরকারি উদ্যোগে স্বল্পসুদে জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা প্রদান করা হলে পর্যটন শিল্পনির্ভর ব্যবসায়ীরা আবারও পূর্ণ উদ্যোমে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন বলে অভিমত তাদের। পূর্ণতা ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস এর স্বত্বাধিকারী নিনা আফরিন জানান, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই টিকে আছে পটুয়াখালীর পর্যটন কেন্দ্রগুলো।

তবে প্রচারের অভাবে বেশির ভাগ পর্যটন স্পটগুলোই সাধারণ মানুষের নজরে আসে না। তারপরও পটুয়াখালী জেলায় সমুদ্র সৈকতকেন্দ্রিক একাধিক পর্যটন স্পট রয়েছে। এছাড়া ঐতিহাসিক বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে পটুয়াখালীতে। যেগুলো সংস্কার করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। পটুয়াখালীর উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্রগুলো হলো-

মজিদবাড়িয়া শাহী মসজিদ

পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার মজিদবাড়িয়া গ্রামে পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত মসজিদটি সুলতানি আমলের স্থাপত্যকীর্তি নিয়ে আজও বিদ্যমান। স্থানীয়ভাবে এটি মসজিদ-ই-মজিদবাড়িয়া শাহী মসজিদ নামেও পরিচিত। মির্জাগঞ্জ উপজেলা সদরের ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে মসজিদটি অবস্থিত। স্বাধীন বাংলার ইলিয়াস শাহী শাসনামলের শেষ দিকে নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের ছেলে রুকন উদ্দিন বারবক শাহের (১৪৫৯-১৪৭৬ খ্রি.) শাসন আমলে খান-ই মোয়াজ্জম উজিয়াল খান ১৪৬৫ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটির প্রধান কামরা বর্গাকার এবং প্রতিটি বাহু সাড়ে ২১ ফুট লম্বা। মসজিদের দেয়ালগুলি প্রায় সাড়ে ৬ ফুট চওড়া। মসজিদের পূর্ব দিকে ৩টি এবং উত্তর দিকে ও দক্ষিণ দিকে ৪টি করে দরজা আছে। পশ্চিম দিকের দেয়ালে আছে ৩টি মেহরাব। ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে সুন্দরবন এলাকার জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় এই মসজিদটির সন্ধান পাওয়া যায়। মসজিদটি দেখার জন্য প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন। এছাড়া প্রতি বছর ওয়াজ মাহফিলে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান শরিক হন।

ডাকাতিয়া কালীবাড়ি

সেন্টার পাড়ার এই কালী বাড়ি ৫ শত বছরের পুরনো বলে অনেকে দাবি করেন। একদল কাপালিক ছাড়া অন্য কোন জনমানবের পদচারণা ছিল না এই ভূখ-ে। গভীর অরণ্যে ঘেরা সুন্দরবনাঞ্চলের মাঝে উঁচু মাটির টিলার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এই মন্দির (বর্তমান সেন্টারপাড়া কালী মন্দির)। ওই মন্দিরে চৈত্র আমাবশ্যায় কালীপূজায় দেবীর নামে উৎসর্গ করে দেওয়া হতো নরবলি। পাশের নদী দিয়ে যাতায়াতকারী লোকজন ঢাক-বাদ্যের শব্দ শুনে শিউরে উঠে বলত ঐখানে ডাকাতিয়া কালীবাড়ি। ভয়ে সেখানে যেতো না কেউ। লুণ্ঠনই ছিল তাদের পেশা।

কুয়াকাটা-সুন্দরবন-সোনারচর

পটুয়াখালী জেলার পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে দেশি-বিদেশি পর্যটক প্রতিনিয়ত ভিড় করেন কুয়াকাটায়। পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ এখানকার আদিবাসী রাখাইনদের স্থাপত্য শিল্প। এসব স্থাপত্য নিদর্শন পর্যটকদের হৃদয় কেড়ে নেয়। সৈকতের কোল ঘেঁষেই উপজাতি রাখাইন সম্প্রদায়ের কেরানিপাড়া। এখানে আছে শত বছরের পুরনো সীমা বৌদ্ধ মন্দির। মন্দিরের একটু পাশেই রয়েছে কুয়াকাটার সেই ঐতিহ্যবাহী কুয়া বা ইন্দিরা। এ কুয়া থেকেই আজকের কুয়াকাটার পরিচিতি। কুয়াকাটার পাশে রয়েছে বাড়তি পাওনা হিসেবে সুন্দরবনের পূর্বাঞ্চল। ফাতরার বনাঞ্চল, সোনাকাটা, ট্যাংরাগিড়ির বনাঞ্চল, ওয়াচ টাওয়ার এখন আকর্ষণীয় স্থান পর্যটকদের কাছে।

সোনারচরে সোনা নেই ঠিকই কিন্তু আছে সোনার মতো বালি। সূর্যের প্রখর রোদ যখন বালির ওপর পড়ে দূর থেকে তা দেখতে সোনার মতোই। তাই নাম সোনারচর। প্রায় ১০ হাজার একরের বিশাল বনভূমি। পটুয়াখালী বন বিভাগের তথ্য মতে, সুন্দরবনের পরেই আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল। শুধু সোনারচর নয়, পার্শ্ববর্তী রুপারচর, মৌডুবি, চরতুফানিয়া, চরকবির, চরফরিদ, শিপের চরসহ আরও কয়েকটি দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো। পটুয়াখালীতে আরও কিছু দর্শনীয় স্থান হলো- কলাপাড়ার পাখিমারা এলাকায় পানি জাদুঘর, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শ্রীরামপুর জমিদার বাড়ি, কলাপাড়ায় অবস্থিত রাডার স্টেশন ও আবহাওয়া অফিস, পায়রা সমুদ্র বন্দর এলাকা, দশমিনার বীজ বর্ধন খামার, পায়রা কুঞ্জ, লেবুখালী কৃষি উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ইত্যাদি।

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ : কুয়াকাটায় ইতিমধ্যে নির্মিত হয়েছে তিন তারকা মানের হোটেল মোটেলসহ প্রায় দুই শতাধিক আধুনিক হোটেল মোটেল ও রেস্ট হাউস। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ফাতরার বনাঞ্চলে ঘোরার ট্যুরিস্ট বোর্ড সার্ভিস। রয়েছে ওয়াটার স্কুটার, স্পিডবোট সুবিধা। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের গভীরে চর বিজয়ে দিনভর ঘুরে বেড়ানোর সুবিধা রয়েছে এখানে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কুয়াকাটায় স্থাপন করা হয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশের একটি ইউনিট। কুয়াকাটা ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার জানান, কুয়াকাটাকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসা করোনা অতিমারীর আগে যে অবস্থায় ছিল দেড় বছরের লকডাউনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। বর্তমানে মূলধন সংকেটর কারণে অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে গেছে।

কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ঔনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোতালেব শরীফ জানান, হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা অনুদান চায় না। পর্যটননির্ভর ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের ঋণ সহায়তার কোনো বিকল্প নেই বলে দাবি করেন তিনি।

পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, পটুয়াখালীর পর্যটন ব্যবসা থেকে কী পরিমাণ রাজস্ব আয় হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান জেলার কোনো দপ্তরের কাছে নেই। তবে সরকার পর্যটনশিল্প বিকাশে সমন্বিত একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উপকূলীয় এলাকাকে ঘিরে সরকারের একটি গুচ্ছ পর্যটন শিল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সম্ভাবনা হাতছানি রয়েছে। আগামী কয়েক বছরে এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের চেহারা পাল্টে যাবে।