advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

নারীর ক্ষমতায়ন প্রতীকী নয় দরকার প্রকৃত

গওহার নঈম ওয়ারা
১৪ জানুয়ারি ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২২ ১১:৩২ পিএম
advertisement

এবার মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষাগুলোর ফলে দেখা যাচ্ছে ছাত্রীরা ছাত্রদের থেকে ভালো করেছেন। পাসের হার এবং জিপিএ-৫ এর ক্ষেত্রে ছাত্রীরা এগিয়ে আছেন। ছাত্রীদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ লাখ ৩৫ হাজার ৭৮ জন। ছাত্রদের মধ্যে জিপিএ-৫ ৭৯ হাজার ৭৬২ জন। শতকরায় হিসাব করলে মোট অংশগ্রহণকারী ছাত্রীদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯.৪৩ শতাংশ। আর মোট অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬.৯৮ শতাংশ। মোট পাসের হারেও ছাত্রীরা এগিয়ে, তাদের পাসের হার ৯৪.৫০ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রদের পাসের হার ৯২.৬৯ শতাংশ।

এমনটি সব সময় ঘটে। শিক্ষার তথ্য-উপাত্ত নিয়ে চর্চা করে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী (২০১৮ সালে প্রকাশিত) প্রাথমিক স্তরে মেয়েরা একটু এগিয়ে থাকলেও মাধ্যমিক স্তরে মেয়েরা বেশ এগিয়ে যায়। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে মেয়েদের পেছানো শুরু হয়, তবে সংখ্যার ক্ষেত্রে তখনো ছেলেমেয়ে প্রায় সমান। তবে ধপাধপ পড়ে যায় উচ্চশিক্ষা আর পেশাগত শিক্ষার স্তরে। নারীদের এগিয়ে যাওয়া বন্ধ হতে থাকে এখান থেকে। ব্যানবেইসের সর্বশেষ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী মাত্র এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি। চিকিৎসা ও আইনসহ পেশাগত শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের হার একটু বেশি হলেও আহামরি কিছু নয়।

উচ্চ মাধ্যমিক স্তর থেকে নারীদের হারিয়ে যাওয়ার কারণ নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। নিরাপত্তা, খরচ, চাকরির অভাব, বেতন বৈষম্য, গর্ভধারণ, সন্তান লালন-পালন নারীবান্ধব কর্ম পরিবেশের অভাব ইত্যাদি নানা কারণ সেসব গবেষণায় পাওয়া যাবে, পাওয়া যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক ২০১৯ সালে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল নারী-পুরুষ বৈষম্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার নিচ থেকে তৃতীয়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় নারী বৈষম্যের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর এসেছিল ৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা খুবই নিচের দিকে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একই স্কোরে থেমে ছিল (৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ) তার মানে অবস্থার উন্নতি হয়নি।

সেই সময় বিবিসি বাংলা বিভাগ বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘যেহেতু আমরা মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্র। এবং সমাজব্যবস্থা এক সময় পুরুষশাসিত ছিল। সেখানে স্বাভাবিকভাবে নারীদের পশ্চাৎপদ করে রেখে দেওয়া হয়েছিল আমাদের সামাজিক অবস্থানের কারণে।’

ধর্মের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এর একটা নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও আমাদের মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব ধর্মের পরিবারই পুরুষের অন্যায্য শাসনের চর্চা আছে। আমাদের আর্য হওয়ার চেষ্টার সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কিত। ভারতবর্ষ দখলে নেওয়ার পর অনার্য পুরুষদের কচুকাটা করে কব্জায় আনা নারীদের আর্যরা কখনো বিশ্বাস করতে চায়নি। তৎকালীন পণ্ডিতরা সায় দিয়েছেন বলেছেন, আত্মবুদ্ধি শুভকারী/গুরুবুদ্ধি বিশেষত/ পরবুদ্ধি বিনাশায়/স্ত্রীবুদ্ধি : প্রলয়ঙ্করী।

আত্মবুদ্ধি শুভকারী নিজের বুদ্ধিতে ফতুর হওয়া পরামর্শ দিতে পণ্ডিতরা দুবার ভাবেননি। তবে আটকে গেলে আবার তাদের (পণ্ডিতদের) সঙ্গে কনসাল্ট করার দরজাটা খোলা রাখতে বলেছেনÑ ‘উপদেশ দিয়েছেন গুরুবুদ্ধি বিশেষত’ লাটাই হাতে রাখার এই কৌশল আদিকাল থেকেই বুদ্ধিমানের হাতবন্দি। নিজের বুদ্ধিতে চলা ভালো বলে পরামর্শ দিয়ে আবার ঝামেলায় পড়লে শুধু তার কাছেই ফেরত আসতে বলেছেন গুরু। কারণ তারা মনে করেন পরবুদ্ধিতে বিনাশ হয়; তাদের লেখা শাস্ত্রের ভাষায় ‘পরবুদ্ধি বিনাশায়’। পণ্ডিত বা গুরুজনরা পর নন। তারা পর হলে কনসালট্যান্সি ব্যবসা কীভাবে চলবে? কিন্তু শ্লোক গুচ্ছের শেষে এসে পণ্ডিতরা বিশাল কেলেঙ্কারি করেছেন; হঠাৎ করে স্ত্রীদের কথার দাম না দিতে পরামর্শ দিয়েছেনÑ বলেছেন তাদের কথা শুনেছ তো কেয়ামত এসে হাজির হবে : ‘স্ত্রীবুদ্ধি : প্রলয়ঙ্করী। প্রলয় মহাপ্রলয়ের সংকেত দিয়েছেন পণ্ডিতরা। অনেকটা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকারী মহাবিপদ সংকেত বারোর মতো। তবে এখানে এটা একটা সূক্ষ্ম কারচুপি আছে স্ত্রী বলতে বউ বোঝায়; সমগ্র নারীজাতিকে তা নির্দেশ করে কি?

পুরাকালে যখন সংস্কৃত শ্লোকের ফতোয়ায় সমাজ রাষ্ট্র চলত তখন কি স্ত্রী বলতে সব নারীকুলকে বোঝাতো? এখন তো স্ত্রী বলতে কেবল বউকেই বোঝায়। ঘর কা মুরগি ডাল বরাবর সেই বিবেচনায় কি তাকে বুদ্ধি পরামর্শেও বাইরে রাখার এই বিধান?

আরেকটা কারণও থাকতে পারে, আর্যদের স্ত্রীদের মধ্যে সেকালে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে আসা নারীরাই ছিলেন প্রধান। বিজিতদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে লুটপাট করে আনা সামগ্রীর একটা অংশ ছিল নারী। যাদের পরে স্ত্রী অথবা যৌনদাসিতে পরিণত করা হতো। পদানত দাস-দাসীদের বুদ্ধি বা পরামর্শ নেওয়ার বিধান শ্লোক পণ্ডিতরা কীভাবে দেবেন?

এটা শুধু আশরাফ আতরাফের বিষয় নয়, বরং নিরাপত্তারও একটা বিষয় জড়িত এর সঙ্গে। ঘরবাড়ি, খামার জ্বালিয়ে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে যে নারীকে নিয়ে এসে স্ত্রী বানানো হয়েছে সে তো ভুল বুদ্ধি দিতেই পারে, নাশকতার পথ বেছেই নিতে পারে। প্রতিশোধ নিতে কে না চায়? কাজেই দশ-বারো স্তরের নিরাপত্তা চাদরে সমাজকে ঢেকে রাখতে হলে কোনোরকম ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। তাই স্ত্রীদের মাফ করা হলো। তাদের পরামর্শ দেওয়ার ভারী কাজ থেকে ভারমুক্ত করলেন পণ্ডিতরা। সেই চর্চা এখনো বহাল নেতৃস্থানীয় কাজে ব্যবস্থাপনায় নারীর অংশগ্রহণ নেইÑ কোনো স্তরেই নেই!!!!!!!

আত্মবুদ্ধি শুভকারী / গুরুবুদ্ধি বিশেষত / পরবুদ্ধি বিনাশায় /স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী॥

যুদ্ধের নামে প্রধানত লুটপাট করতে এসে থেকে যাওয়া আর্য দস্যুদের জৈবিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে কথিত শ্লোক পণ্ডিতরা তাদের কনসালট্যান্সি ব্যবসা চালু রাখার জন্য বাস্তব বুদ্ধি প্রয়োগ করেছেন। রিয়ালিস্টিক হয়েছেন, দাঙ্গাবাজরা গায়ে-গতরে, অস্ত্রশস্ত্রে ভয়ানক হতে পারে কিন্তু নতুন দেশ, নতুন আবহাওয়ায় তাদের বুদ্ধি পরামর্শ দরকার, টিকে থাকতে হলে চলন-বলনের হালহকিকতের তত্ত্ব-তালাশ দরকার, কলমের আর কালামের খোঁজখবর রাখতে হয়; তাই পণ্ডিতরা বিধান দিলেন :

শ্রদ্ধধান শুভং বিদ্যাম/আদদী প্রাবরাদপি / অত্মাদপি পরংধর্মং / স্ত্রীরত্ন দুষ্কুলাদপি

যাদের জবরদস্তিতে হারাল, গায়ের জোরে যাদের সবকিছু কেড়ে নিলে সেই হেরে যাওয়া ‘নিকৃষ্ট’দের কাছ থেকে শুভবিদ্যা গ্রহণ করা জায়েজ, আতরাফ জাতির কাছ থেকে তুমি আশরাফ হয়েও ধর্ম শিক্ষা নিতে পারো। আর ছোটবংশ থেকে স্ত্রীরত্ন গ্রহণ বা ভোগে কোনো অধর্ম হয় না। ধর্ম সেটা সহ্য করবে। একেই বলে টিকে থাকার বাস্তব বুদ্ধি। রাজা কী চান তা আঁচ অনুমান করতে পারাটাই তো পাণ্ডিত্য। সেকালের পণ্ডিতদের কেদারায় এখন একালের বুদ্ধিজীবীরা, টিকে থাকার আর টিকিয়ে রাখার প্রচুর বাস্তব বুদ্ধির কলকে হাতে দিব্যি ঘুরে বেড়ান। এসব দোষের কিছু নয়, পূর্বপুরুষের ধারাবাহিকতা। ধারাবাহিকতা রক্ষা না করলে চলে কি?

তাই রাজার ছেলে রাজা হন। বংশের বাইরে গদিতে বসতে পারে না কোনো পীর। যদি না সে নিজে পীর হয় আর আলাদা মুরিদ বাহিনী তৈরি করে।

কথা হচ্ছিল কার পরামর্শ নেওয়া হালাল আর কারটা হারামÑ ঘরের মানুষ বিভীষণ হতে পারে কাজেই তাকে বাদে সব পণ্ডিতের মতামত নেওয়া যাবে। তবে এটা ঠিক নিজের মগজ মেধা আর বিবেক না থাকলে অন্যের পরামর্শে বেশিদূর এগানো যায় না। গাছে চড়িয়ে পরামর্শদাতা যে কোনো সময় মইটা সরিয়ে নিতেই পারেন। তাতে আম-ছালা এবং বৃক্ষ সবই হারাতে হতে পারে। হারাচ্ছিও সর্বদা। আমাদের অর্জনের চেয়ে হারানোর খবর বেশি বেশি আসছে। চাবি আমার বালিশের নিচে কিন্তু গুদাম ফাঁকা। চোর দিব্যি হাওয়ায় লুকিয়ে যাচ্ছে, লালনের হাওয়ার মাঝে ফাঁদ পেতেও তাকে ধরা যাচ্ছে না। কনসালট্যান্টের নামে পোষ্য (দুগ্ধপোষ্য) পড়বেন না। পণ্ডিতদের পরামর্শ ক্রমেই কুপরামর্শ হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। যেখানে গোপনে এর পা টিপেটিপে এগোতে হবে সেখানে এগোচ্ছে ঘোষণা দিয়ে। হৈ !! হৈ !! রৈ !! রৈ!! ব্যাপারের মতো। যাত্রা-সার্কাসের ঘোষণাকে সেসব ঘোষণা হার মানাচ্ছে। আর যেখানে আমাদের সব কিছু ফকফকা করে ঘোষণা দিয়ে কাজ করার কথা সেখানে করছি চুপিচুপি কেউ যেন না জানে; কিন্তু মানুষ টের পেয়ে যাচ্ছেÑ মালুম হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। তবে আশার কথা মালুম হলেও কেউ হালুম করছে না।

নানা বাধা পেরিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত এগিয়ে আসা মেয়েদের জন্য সরকারের নানা পরিকল্পনা আর প্রতিশ্রুতি আছে। কিন্তু নারী বুদ্ধি যে প্রলয়ঙ্করী নয়, নারী যে দুষ্কলাদপি নয়, সেই চিন্তার ভেদ ভাঙবে কে কীভাবে?

তা ছাড়া প্রতিশ্রুতি আর পরিবেশ তৈরির জন্য আমাদের কিছু নিয়ত থাকতে হবে। মেয়েদের ¯ু‹ল থেকে ঝরে পড়া কমানোর জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। করোনাকালে অনেক মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়েছে, মা হয়েছেন অনেকে, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তারা যেন কলেজ বা উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রে যেতে পারে সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। শিক্ষার খরচ বহনে অক্ষমদের সহায়তা করা। সেই সঙ্গে কারিগরি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় মেয়েদের আরও উৎসাহিত করতে হবে। তা হলে মেয়েকে নিয়ে বাবা-মায়েরাও বিয়ের বাইরে অন্য স্বপ্ন দেখতে পারবে।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে হয়তো প্রশাসন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে নারীদের নিয়োগ আরও বাড়ানো হবে। তবে মনে রাখতে হবে পদায়ন মানেই ক্ষমতায়ন নয়। দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রতীকী ক্ষমতায়নের চেয়ে প্রকৃত ক্ষমতায়ন দরকার।

পরিবারে ও সমাজে সমঅধিকার আর মর্যাদা নিশ্চিত না হলে নারীকে অবহেলা, অবিশ্বাস আর দাবিয়ে রাখার আর্য কৌশলে ভাটি পড়বে না, প্রতি সহিংসতা ঠেকানোও কঠিনতর হবে। নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া বলেছেন, ‘পুরুষদের স্বার্থ ও আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে, তাহাদের জীবনের লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহা।’ কিন্তু সমাজ তা মানতে নারাজ। সমাজ চায় নারী সব সময়ই আশ্রিত থাকবে পুরুষের কাছে একটি উপভোগ্য বস্তু হিসেবে।

পুরুষরা নিজে থেকে অনার্য না হলে তাকে অনার্য বানাতে হবে।

গওহার নঈম ওয়ারা : লেখক ও গবেষক

advertisement
advertisement