advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

আমাদের সম্মিলিত অবহেলা ও করোনা

চিররঞ্জন সরকার
১৪ জানুয়ারি ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২২ ১১:৩২ পিএম
advertisement

যুক্তি ও তর্কের প্রবণতা মানুষের একান্ত। যুক্তি শিক্ষানির্ভর। এই শিক্ষা পরিবেশ বা সমাজ থেকে আহৃত হতে পারে। প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থাও যুক্তি তৈরিতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীর যুক্তি পরীক্ষালব্ধ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে। আইনবিদ আইনের যুক্তি দিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। সমাজতাত্ত্বিকরা সামাজিক সংস্কারের যুক্তি দেন। রাজনীতিকদের যুক্তি সুবিধামতো বদলায়। তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য তর্কেরও শেষ নেই। করোনা মহামারীর গত দুই বছর রাজনীতিকদের বক্তব্য আর সিদ্ধান্ত নাগরিকদের অনেক ক্ষেত্রে হতাশ করেছে।

আমরা জেনে গিয়েছি- করোনা ভাইরাস ক্রমেই রূপ বদলায়, নতুন স্ট্রেনের ভাইরাস জন্ম নেয়। এর সংক্রমণ শক্তি সাংঘাতিক। বিশ্বজুড়ে এ ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যাই এর প্রমাণ। গোড়ায় এই সংক্রমণ থেকে মানুষ নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবে, সেই নিয়ে দ্বিধা ছিল। তা দূর হয়েছে। মাস্ক পরা, পরিচ্ছন্নতা, পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখা- তিন মন্ত্র। বিজ্ঞানীদের এই সাবধান বাণী প্রচারের পরও দেখা গেছে, একটি বিশেষ শ্রেণি নানা অবৈজ্ঞানিক যুক্তিনির্ভর কুসংস্কারকে গুরুত্ব দিয়ে মানুষকে ‘সাহস’ জোগাচ্ছে। সেই ভুল ভেঙেছে মৃত্যুর মিছিলে। চিকিৎসার দুর্বল অবকাঠামো ও অব্যবস্থা প্রকট হয়েছে। লকডাউন, বিধিনিষেধ আরোপ এবং ধীরে ধীরে তা তুলে নিয়ে প্রথম ঢেউ পেরোতে শিথিল হয়েছে বাঁধন। দীর্ঘ ঘরবন্দি জীবন থেকে মুক্তি পেতে উচ্ছৃঙ্খল হয়েছিল মানুষ। এরই মধ্যে এসেছে কোভিডের নতুন স্ট্রেনের দ্বিতীয় ঢেউ। চিকিৎসকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা করেছেন, বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে প্রতিষেধক আবিষ্কারে নিমগ্ন থেকেছেন। প্রতিষেধক এসেছে। তা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করেছে। রাজনীতি ও ধর্ম যাদের ‘পেশা’, বিজ্ঞানীদের স্বীকৃতির অভ্যাস তাদের নেই। তাদের যুক্তি ও তর্ক বাস্তব থেকে অনেক দূরে। ধর্মীয় সংস্কার ও রাজনীতি স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষকে বিপথে চালনা করে, অসহায়তার ফায়দা তোলে।

ইউরোপ-আমেরিকায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বন্ধনমুক্তির আনন্দের সুযোগ এসেছে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক শিথিলতার জন্য। এর মূল্যও চোকাতে হয়েছে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই কেউই খুব একটা দেখান না। বিধি মানানোর ব্যাপারে সরকারেরও তেমন দায় আছে বলে মনে হয় না। এর পেছনেও লাগামহীন রাজনীতি ও ধর্মাচরণ। গত বছর বিভিন্ন জেলা শহরেও সংক্রমণ তরতরিয়ে বেড়েছিল। করোনাবিধি না মেনে মানুষের ফ্রিস্টাইলে চলাফেরায় যা হওয়ার, সেটিই হয়েছে। হাজারো লোক সংক্রমিত হয়েছে, অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যখন করোনা একটু বশ মেনেছে প্রতিষেধকে, তখন এলো অন্য আরেক রূপ- ওমিক্রন। ডেল্টার সঙ্গেই সহাবস্থানে সে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্বময়। বিজ্ঞানীরা ফের উচ্চারণ করলেন সাবধান বাণী। ইতোমধ্যে এলো শীত, ক্রিসমাস, বর্ষবরণ। সুযুক্তিবাদীরা শঙ্কিত হলেন, কুযুক্তিবাদীর দল দিল বরাভয়। বিজ্ঞানীরা বললেন, নতুন স্ট্রেনের জন্য প্রতিষেধক যথেষ্ট নয়। আর স্বশিক্ষিতের বক্তব্য- হাঁপিয়ে উঠেছে প্রাণ, চলো ময়দান।

বাংলাদেশে সংক্রমণ যখন যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে, একে একে অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজা খুলে গেছে, বাস-ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক, অসংগঠিত শ্রমিকদের রোজগার শুরু হয়েছে, সপ্তাহে একদিন হলেও স্কুলে যেতে শুরু করেছে শিক্ষার্থীরা- তখনই ওমিক্রনের হুমকি শোনা গেল বিদেশে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করলেন, আবার সে এসেছে অন্যরূপে। অনেক দেশ আগেভাগেই সতর্ক হলো। জমায়েত নিয়ন্ত্রণ করল। কিন্তু আমরা শীতকালীন মোজমাস্তিতে মেতে উঠলাম। বিনোদনকেন্দ্রগুলো উপচে পড়ছে মানুষে। পুনর্মিলনী, সমাবেশ, পিকনিক ইত্যাদির নামে মানুষের ঢল নেমে এসেছে রাস্তায়। ক্ষণিকের আনন্দ আশঙ্কার মেঘ বাড়িয়ে দিল। একটু একটু করে বাড়তে শুরু করে দিল সংক্রমণের রেখাচিত্র। দিন যতই যতই যাচ্ছে, লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। সরকার মাঝে মধ্যে সতর্কবাণী শোনাচ্ছে। কিন্তু কেউ তা মানছেন না। মানানোর গরজও সরকারের মধ্যে তেমন দেখা যাচ্ছে না।

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতি ও উদ্যোগ বিষয়ে প্রশ্ন তুললেই একটি প্রতিপ্রশ্ন উঠছে- দায় কি কেবল সরকারের, নাগরিকের কোনো দায়িত্ব নেই? স্বাস্থ্যমন্ত্রীও নাগরিকদের ‘নিজেদের স্বার্থেই’ করোনাবিধি মানতে বলেছেন। সামাজিক মঙ্গলবিধানে অবশ্যই প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব আছে এবং বহু নাগরিক সেই দায়িত্ব পালনে কেবল ব্যর্থ নন, উদাসীন। তারা যেভাবে মহামারীকালে বিনা কারণে সব নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জনপরিসরে ঘুরে বেড়ান এবং সেই বিষয়ে প্রশ্ন তুললে নানাভাবে বলে দেন যে, তারা জেনে-শুনেই শৃঙ্খলা ভাঙছেন। তা কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এই প্রবণতা আমাদের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কেই গভীর দুশ্চিন্তার কারণ। কিন্তু এতে সরকার তথা ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের দায় কমে না, বরং বাড়ে। সামাজিক আচরণে বিশৃঙ্খলা নিবারণের প্রাথমিক কর্তব্য পালনে শাসকরা ব্যর্থ হলে নাগরিকদের একটি বড় অংশ বিচারবুদ্ধি শিকেয় তুলে বেপরোয়া আচরণ করবেন, তা অস্বাভাবিক নয়। বিশৃঙ্খলা স্বভাবত নিম্নগামী।

সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল প্রশাসনের শর্ত পূরণে বর্তমান শাসকদের ঘাটতি বিরাট। হয়তো এর পেছনে তাদের তথাকথিত ‘জনবাদী’ রাজনীতির প্রভাব আছে। সেই রাজনীতির ভিত্তিতে কোনো সুচিন্তিত মতাদর্শ বা সুপরিকল্পিত কর্মসূচি কোনোদিনই ছিল না, আজও নেই। এ অপরিকল্পনার কল্যাণেই তারা প্রতিমুহূর্তে নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে পারেন। তা ক্ষমতায় টিকে থাকতে সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু এই তাৎক্ষণিকতা প্রশাসনের প্রকৃষ্ট শাসনের প্রতিকূল। প্রশাসন দাবি করে সুচিন্তিত নীতি ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগের ভিত্তিতে শাসন প্রক্রিয়ার সুস্থির পরিচালনা। আমাদের শাসন প্রক্রিয়ায় এই সুস্থিরতার অভাব প্রকট। মহামারীরকালে অস্থিরতার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সরকারি নীতির তাড়নায় বহু নাগরিক নিরুপায় হয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি নিচ্ছেন। যারা স্বভাবত বেপরোয়া, তাদের স্বভাবে বাড়তি ইন্ধন দিচ্ছে সরকারি আচরণের অস্থিরতা। একেকদিন ধমক দিয়ে, হঠাৎ পুলিশিব্যবস্থা গ্রহণ করে এই পরিস্থিতির সুরাহা সম্ভব নয়। সরকারকে নাগরিকের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে। এ জন্য প্রকৃষ্ট শাসনের নিত্যকর্ম পদ্ধতিতে ফিরতে হবে। তাই সবার আগে দরকার সস্তা জনপ্রিয়তার ঊর্ধ্বে ওঠার ইচ্ছা ও সাহস।

জনপ্রিয়তা মূল্যবান। কিন্তু সর্ববিষয়ে জনপ্রিয় থাকার আকাক্সক্ষায় বেসামাল হলে নেতৃত্ব কথাটিই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তখন নেতা বা নেত্রী জনতার পিছু দৌড়াতে থাকেন এবং সংক্রমণের নতুন পর্ব আসন্ন জেনেও পিকনিক, বিয়ে, বর্ষশেষ, বর্ষবরণ, পুনর্মিলনী, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, নির্বাচিত চেয়ারম্যান-মেম্বারবরণ ইত্যাদি জনউৎসব বন্ধ না করে তাতে প্রশ্রয় দেন। তারা আর কবে বুঝবেন যে, সমাজের কল্যাণে অনেক সময়েই বহুজনের অপ্রিয় কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাতে হাততালি মেলে না। কিন্তু যথার্থ নেতৃত্বের প্রমাণ মেলে। তার পরিবর্তে সরকার এখনো, একদিকে জনতাকে বাধা গতে বিধি মেনে চলতে এবং পরিস্থিতির অবনতি হলে লকডাউনের হুমকির মধ্যে নিজেদের কর্তব্য সীমাবদ্ধ রেখেছে।

করোনা টিকার ক্ষেত্রেও তেমন সুখবর নেই। টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি করোনার গণটিকাদান শুরু করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, এ পর্যন্ত দেশের ৪৪ শতাংশ মানুষ এক ডোজ এবং ৩১ শতাংশ মানুষ পূর্ণ দুই ডোজ করোনার টিকা পেয়েছেন। অথচ মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ মানুষকে সরকার টিকা দিতে চায় বলে বারবার প্রচার করা হচ্ছে।

গত তিন মাসে টিকাদানের হার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দৈনিক টিকাদানের পরিমাণ কিছুটা বাড়তির দিকে। কিন্তু দ্রুত সব মানুষকে টিকার আওতায় আনার জন্য তা যথেষ্ট নয়। টিকা নিবন্ধনও কম হতে দেখা যাচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষের নিবন্ধন হওয়া দরকার। এ পর্যন্ত জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধন সনদের মাধ্যমে নিবন্ধন করেছেন ৭ কোটি ৮৯ লাখ ৬৬ হাজার ৪৮৯ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ এখনো টিকার জন্য নিবন্ধনই করেনি। অন্যদিকে নিবন্ধন করা প্রায় ১৬ লাখ মানুষ টিকার প্রথম ডোজের অপেক্ষায় আছেন। আর দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় আছেন ২ কোটি ২৮ লাখের বেশি মানুষ।

টিকাগ্রহণে মানুষের আগ্রহেও দিন দিন যেন ভাটা পড়ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হলে জাতীয়ভাবে, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার দরকার। দরকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের টিকা কর্মসূচিতে যুক্ত করা। কিন্তু তা করার গরজ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

টিকাদানের সাফল্যের বিষয়টি যতটা প্রচার করা হচ্ছে, বাস্তবে তা হচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় টিকাকরণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব, প্রচারের বিষয়বস্তু নয়। টিকাকরণ সুষ্ঠুভাবে সময়মতো সম্পন্ন হবেÑ এটাই সরকারের লক্ষ্যমাত্রা হওয়া উচিত। এটা অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয়ও নয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের বৈশিষ্ট্যই হলো, সামান্য কৃতিত্বকেও মহাআড়ম্বরে প্রচার করা- যাতে না পারার ব্যর্থতাটি চাপা পড়ে যায়। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজনথ প্রশ্ন যেখানে নাগরিকের জীবন-মৃত্যুর, সেখানে মিথ্যা সাফল্য প্রচার বা প্রতিশ্রুতির কোনো স্থান নেই। দেশে যেন আবার হাসপাতালে আসন না পেয়ে পথেঘাটে মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

advertisement
advertisement