advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

হাসপাতালের প্রস্তুতি নিয়ে সংশয়

রাশেদ রাব্বি
১৫ জানুয়ারি ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২২ ০৩:২০ এএম
advertisement

দেশে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি দৃশ্যমান। প্রতিদিনই বাড়ছে সংক্রমণ ও আক্রান্তের হার। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সংক্রমণের হার দুই শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছে। আক্রান্তের পাশাপাশি বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে স্বল্পসময়ে হাসপাতালের কোভিড শয্যার সংকট সৃষ্টি হবে। এমনকি কোভিডের প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের মতো একটি খালি শয্যার খোঁজে রোগীদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেরি হলে সংক্রমণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়তে পারে- এমন মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।

সারাদেশে ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা গেছে, করোনা সংক্রমণ ও আক্রান্তের হার বাড়লেও এখনো প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। কোথাও শয্যা প্রস্তুত নয়, কোথাওবা নেই প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস। অনেক স্থানেই অক্সিজেন কনসানট্রেটর, হাইফ্লো নোজেল ক্যানুলা নষ্ট হয়ে পড়ে

আছে। আবার কোথাও কোথাও রয়েছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্সের স্বল্পতা। সব মিলিয়ে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি করোনা মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

দেশের ঊধ্বমুখী করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। গত বৃহস্পতিবার (১৩ জানুয়ারি) থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়া কথা। তবে নির্দেশনা থাকলেও রাজধানীসহ দেশের সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে হাট-বাজার থেকে হোটেল-রেস্তোরাঁ, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবহনে কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ বলছে, প্রচার কম হওয়ায় অনেকেই সরকারের নতুন বিধিনিষেধ সম্পর্কে অবগত নন।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক আমাদের সময়কে বলেন, হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি আগের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থায় আছে। কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম অক্সিজেন প্ল্যান্ট, অক্সিজেন জেনারেটর, অক্সিজেন কনসানট্রেটর সংযুক্ত করা হয়েছে। ডাক্তার-নার্সদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমার সঙ্গে সারাদেশে চিকিৎসা কর্মকর্তাদের কথা হয়েছে, তারাও প্রস্তুত আছেন। নতুন ঢেউ মোকাবিলায় তাদের আত্মবিশ্বাস রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় ২০ থেকে ২২ হাজার শয্যা আছে। কিন্তু রোগী যদি ৪০ হাজার বা তার বেশি হয় তা হলে হাসপাতালে জায়গা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে দেশবাসীর সচেতনতা বাড়াতে হবে।

প্রস্তুতি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম আমাদের সময়কে বলেন, করোনার শুরুতে আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। তবে এখন সেই অবস্থা নেই। হাসপাতালগুলো প্রস্তুত আছে। ৪০টি হাসপাতালে অক্সিজেন জেনারেটর বসানোর কাজ চলছে। দেশের সব জেলা হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন স্থাপনও শেষের দিকে। দেশে গত ২৮ ডিসেম্ব^র করোনা প্রতিরোধে বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু হয়েছে। বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী এবং করোনা ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় সম্মুখসারির ব্যক্তিরা বুস্টার ডোজ পাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, সেখানে করোনায় সংক্রমণ প্রতিদিন দ্বিগুণ হারে শনাক্ত হচ্ছে। এতে বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকরাও সংক্রমিত হচ্ছেন। চিকিৎসকদের একটি অংশ মনে করছেন, ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়ায় শনাক্ত বাড়ছে। পরিস্থিতি এখনই ভয়াবহ আকার নিলে রোগী সামলাতে প্রস্তুত নয় কোনো হাসপাতাল। কারণ চিকিৎসক-কর্মকর্তারা বিভিন্ন হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ও হাইফ্লো নোজেল ক্যানুলার পরিসংখ্যান নিয়েই বসে আছেন।

গত বছরের মে মাসের শেষদিকে করোনার প্রকোপ কমতে থাকলে বেশিরভাগ হাসপাতালেই করোনা রোগীদের জন্য বরাদ্দ শয্যার সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীর জন্য সাধারণ শয্যা রয়েছে ১ হাজার ৬০০টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৯৫০টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৬৫০টি। চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা আছে ২৬টিতে। সরকারি ৪৭টিসহ হাইফ্লো নোজেল ক্যানুলা আছে ১৭১টি।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, অনেক অক্সিজেন লাইন ও হাইফ্লো নোজেল ক্যানুলা নষ্ট হয়ে আছে। সেগুলোকে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব আইসিইউ শয্যা নষ্ট ছিল সেগুলোও ঠিক করতে সরকারের কাছে অর্থ সহায়তা চেয়েছি।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের কোভিড-১৯ ওয়ার্ডের সাধারণ শয্যায় গতকাল রোগী ছিলেন ৬২ জন আর আইসিইউতে ৩ জন। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৩০ জন। তার মধ্যে বিদেশগামী রোগী ২৫ জন। আইসিইউতে রোগী ছিলেন ৫ জন।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ফোকাল পারসন ও সহকারী পরিচালক (অর্থ ও ভান্ডার) ডা. মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, ওমিক্রন মোকাবিলায় বড় কোনো পরিকল্পনা আমাদের এখনো শুরু হয়নি। তবে করোনা ইউনিটের যেসব যন্ত্রপাতি অচল পড়ে ছিল, সেগুলো মেরামত করে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। করোনা রোগী বাড়ার সঙ্গে শয্যাও বাড়ানোর সুযোগ আমাদের আছে।

রাজশাহী ব্যুরো জানিয়েছে, ‘ওমিক্রন সুনামি’ মোকাবিলায় যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি রাজশাহীতেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওমিক্রন মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কমে যাওয়ায় হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যাও একেবারেই কমে গিয়েছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন থেকে রামেক হাসপাতালে আক্রান্ত কিংবা সাসপেক্টেড রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটকে ওমিক্রন মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে ২৬ রোগী ভর্তি রয়েছে। হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে প্রায় ৭শ সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন রয়েছে। হাইফ্লো নোজাল ক্যানুলা রয়েছে, অক্সিজেন কনসান্ট্রেটর রয়েছে ৩শটি। ১ হাজার ৪শটি অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং ২৪টি বাইপ্যাপ রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ১ হাজার লিটারের একটি ভিআই ট্যাংক। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ভিআই ট্যাংকটি ৩ হাজার লিটারে উন্নীত করা হবে। তিনি বলেন, ওমিক্রনের সংক্রমণ বেড়ে গেলে সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী ডাক্তার-নার্স সংযোজন করা হবে।’

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটসহ জেলায় ওমিক্রন মোকাবিলায় নানা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ৪০২ বেড এবং জেলার ১১টি উপজেলার প্রত্যেকটি হাসপাতালে ১০টি করে মোট ১১০টি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. ওয়াইজ উদ্দিন ফরাজী জানান, ওমিক্রন মোকাবিলায় ইতোমধ্যেই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ২২টি শয্যাসহ করোনা ইউনিটে মোট ৪০২টি শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বর্তমানে ১০০ বেড চালু রয়েছে। রোগী বৃদ্ধি পেলে পর্যায়ক্রমে শয্যা আরও বাড়ানো হবে। রোগী বাড়লে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক সরবরাহ দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্টটির স্থলে ২০ হাজার লিটার সম্পন্ন ট্যাংক বসানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পত্র দেওয়া হয়েছে।

মমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. মহিউদ্দিন খান মুন জানান, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে করোনাকালে রোগীদের চাহিদার তুলনায় অক্সিজেন সংকট দেখা দিয়েছিল। এবারও সেই বিষয়টিকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এবার যেন কোনো সংকট না হয় সে জন্য ওপর মহলে যোগাযোগ রাখছেন। এ ছাড়া একটি অক্সিজেন জেনারেটর বসানোর কাজ চলমান রয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, জেলার ১১টি উপজেলার প্রত্যেকটি হাসপাতালে ১০টি করে মোট ১১০টি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রোগী বৃদ্ধি পেলে উপজেলা হাসপাতালগুলোয় আরও ১০টি করে শয্যা বৃদ্ধি করা হবে। তা ছাড়া উদ্বোধনের অপেক্ষায় ৫০ শয্যাবিশিষ্ট তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০০ শয্যা বৃদ্ধি করার একটি পরিকল্পনাও রয়েছে।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজের (খুমেক) উপাধ্যক্ষ ডা. মেহেদী নেওয়াজ বলেন, খুলনায় ৩টি সরকারি ও ৩টি বেসরকারি হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা চালু রয়েছে। তবে ?ওমিক্রন শনাক্তের ব্যবস্থা নেই। এটি জানতে সন্দেহজনক ব্যক্তির নমুনা ঢাকায় আইইডিসিআরে পাঠানো হচ্ছে। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের উপপরিচালক ডা. মঞ্জুরুল মুরশিদ জানান, এখনো ওমিক্রনের ঢেউ না এলেও ঝুঁকি এড়াতে স্থলবন্দরগুলোয় সতর্কতা জারি রয়েছে। সন্দেহ হলে সেখানেই করোনার পরীক্ষা হচ্ছে। আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে রংপুরকে ইয়োলো জোন ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে রংপুরবাসীর মধ্যে এখনো এ ঘোষণার কোনো প্রভাব লক্ষ করা যায়নি। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলা হলেও মাস্ক পরা ছেড়েই দিয়েছে রংপুরের মানুষজন। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. রেজাউল ইসলাম জানান, এখন পর্যন্ত রংপুরে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন শনাক্ত হয়নি। হাসপাতালে ৪০ শয্যাবিশিষ্ট আইসোলেশন ভবন ওমিক্রন শনাক্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রেখেছি। রংপুরের ১০ হাজার লিটার তরল অক্সিজেন রাখার একটি ট্যাংক ছিল। আগাম পদক্ষেপ হিসেবে আরও ১টি ট্যাংকে ১০ হাজার লিটার তরল অক্সিজেন রাখা হয়েছে। বিগত দিনে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টা শনাক্ত হওয়ার পর বেশি রোগীর চাপে প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ হাজার লিটার তরল অক্সিজেনের ব্যবহার হতো। রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. হিরম্ব কুমার রায় জানান, জেলার ১শ শয্যাবিশিষ্ট করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালকে প্রস্তুত রেখেছি।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন তৈয়ব সুমন, চট্টগ্রাম ব্যুরো; আমজাদ হোসেন শিমুল, রাজশাহী ব্যুরো; ওয়াদুদ আলী, রংপুর ব্যুরো; মো. নজরুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক ময়মনসিংহ ও কামাল হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদক খুলনা

advertisement
advertisement