advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement

অনেক শুভ বার্তার নাসিক নির্বাচন

স্মৃতি চক্রবর্তী
২৭ জানুয়ারি ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২২ ০৪:৪৯ এএম
advertisement

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন (নাসিক) অনেক বার্তা রাখল আমাদের সামনে। নির্বাচন কমিশন ও দেশের নির্বাচনব্যবস্থা যখন নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছিল, তখন প্রশ্নমুক্তভাবে নাসিক নির্বাচন সম্পন্ন করার আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের জন্য। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা সফল হয়েছেন এবং গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির জয় হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই অভিযোগ অত্যন্ত পুষ্ট, বর্তমান কমিশন দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর একমাত্র কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছাড়া আর কোনো নির্বাচনই তারা সুষ্ঠু করতে পারেননি। তাদের মেয়াদের শেষ দিকে স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্নের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে সংঘাত-সহিংসতার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, এতে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত ও সহিংসতা নির্বাচনের দর্শনকেও কালিমালিপ্ত করে।

আমাদের স্থানীয় সরকারের কাঠামোর দর্শনাদি অত্যন্ত উজ্জ্বল। তা বর্তমানে অনেকটাই ম্লান। তবে যূথবদ্ধ প্রচেষ্টায় এর ঔজ্জ্বল্য যে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, নাসিক নির্বাচনই এর সাক্ষ্য দেয়। এমন প্রেক্ষাপটে নাসিক নির্বাচন অবাধ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন তাদের সব সহযোগী শক্তি দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠার যে সাক্ষ্য রেখেছে- এতে প্রতীয়মান হয়, তারা চাইলে সব পারে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস ও পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ৫০ বছরে রাজনৈতিক কিংবা অরাজনৈতিক সরকারের শাসন আমলে দৃষ্টান্তযোগ্য অনেক নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা জানি, নির্বাচনের ক্ষেত্রে মূল নিয়ামক শক্তি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের সময় প্রশাসনসহ অনেক কিছুই থাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে। আমাদের সংবিধান সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটিকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, এর যথাযথ প্রতিপালন ও দায়িত্বশীল সবার নিজ দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে নির্মোহ থাকলে স্বচ্ছ নির্বাচন না হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমরা এও জানি, অতীতে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিল আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত জোট ও বাম রাজনৈতিক জোটগুলোর যৌথ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। কাজেই আমাদের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক যে সুখকর কিংবা অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা রয়েছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে নাসিক নির্বাচনকে আমরা সুখকরের কাতারভুক্ত করারই যেন অবকাশ পেলাম।

নাসিক নির্বাচনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয়েছে, এতে ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য নতুন করে কিছু দিকনির্দেশনাও যেমন মিলেছে- তেমনি আলোর রেখাও দেখা গেছে। আমরা জানি, দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীন দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তর ও জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না অনেক দিন ধরেই। তবে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীই স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও দলের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অন্যতম নেতা তৈমূর আলম খন্দকার মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। তৈমূর আলম খন্দকার শুধু বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাই ছিলেন না, নারায়ণগঞ্জের বিএনপি রাজনীতির শক্তিশালী ভিত গড়ার পেছনেও তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। নাসিক নির্বাচনে হেরে গেলেও তার প্রাপ্ত ভোট সাক্ষ্য দেয়, নারায়ণগঞ্জে তিনি কম জনপ্রিয় নন। নাসিক নির্বাচনে প্রার্থীদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের কিছু অভিযোগ উঠলেও সার্বিকভাবে বলা যায়, এ নির্বাচনী আবহ গণতান্ত্রিকই ছিল। ছিল সৌহর্দপূর্ণও।

ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী তৃতীয়বারের মতো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আবারও তার জনপ্রিয়তা ও কর্মদক্ষতার পরীক্ষায় অত্যন্ত উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে উত্তীর্ণ হলেন। আমরা দেখেছি, প্রতিবারই তাকে স্থানীয়ভাবে দলের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক কুশীলবদের অনেক অপকৌশলই মোকাবিলা করতে হয়েছে। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। কিন্তু ডা. আইভী তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে শুধু চ্যালেঞ্জে জয়ীই হননি, স্থানীয় রাজনীতির কুশীলবদেরও তাদের চক্রান্তের জবাব দিতে পেরেছেন বলিষ্ঠভাবে। নির্বাচনে তিনি বিজয় লাভের পর তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তৈমূর আলম খন্দকারের বাসায় মিষ্টি নিয়ে ছুটে গেছেন। অন্যদিকে তৈমূর আলম খন্দকার তাকে সাদরে গ্রহণ করে ডা. আইভী মেয়র পদে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতার যে আশ^াস দিয়েছেন, তাও দৃষ্টান্তযোগ্য হয়ে থাকবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নাগরিকদের জীবনযাপনের পথ মসৃণ করার ক্ষেত্রে তাদের দুজনেরই অঙ্গীকার আমাদের রাজনীতির জন্য নিঃসন্দেহে শুভবার্তা। আমরা যখন দেখছি দেশের রাজনীতিতে বিদ্বেষ, রেষারেষি, পরস্পর পরস্পরকে ঘায়েল করার মানসিকতা নিয়ে নানা রকম নেতিবাচক চর্চায় মত্তÑ তখন নারায়ণগঞ্জে গণতান্ত্রিক রাজনীতির যে আলো নতুন করে দেখা গেল, তাও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

নাসিক নির্বাচন একসঙ্গে আমাদের সামনে অনেক শুভবার্তা দিয়েছে। এই নির্বাচন নতুন যে আবহ তৈরি করেছে, তা যদি নির্বাচন কমিশন ও সরকার ধরে রাখতে পারে; তা হলে বিদ্যমান রাজনীতির কদর্যতা বহুলাংশে হ্রাসের পথ সুগম করবেÑ এও আশা করা যায়। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্যতিক্রমী নাসিক নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণে কিছু ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের বিশেষভাবে আমলে রাখা উচিত। এই ত্রুটির কারণে অনেক ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। আমাদের স্মরণে আছে যখন এ পদ্ধতিটি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গবেষকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল- পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও আনুষঙ্গিক কিছু বিষয়ের সুরাহা না করে এই প্রক্রিয়ায় যাওয়া ঠিক হবে না। নাসিক নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বিশেষজ্ঞদের অভিমত আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ফের তাগিদ দিয়েছে। আমরা আশা করব, নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন থেকে সবপক্ষই যথাযথ শিক্ষা নেবে। ডা. আইভী এও প্রমাণ করেছেন, দলের চেয়ে দেশের জন্য মানুষের জন্য ভালোবাসা অনেক বড়। তিনি বারবার এ শক্তিবলেই উত্তীর্ণ হয়েছেন অগ্নিপরীক্ষায়। বলা যায়, তিনি তার রাজনৈতিক জীবনে একটি ইতিহাস গড়তে পেরেছেন- যেমনটি গড়েছিলেন চট্টগ্রামের মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। দেশের নানা মহল থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে বারবার সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও কোনো রাজনৈতিক দলই জনগণের এ দাবির প্রতি যথাযথ সম্মান জানায়নি। নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ বটে কিন্তু জনমতের প্রতি সম্মান জানানোও গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ।

আমরা দেখেছি- যদি নির্বাচন প্রক্রিয়া কিংবা ব্যবস্থা প্রশ্নমুক্ত হয়, তা হলে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী তিনি যে দলেরই হন না কেন, জনরায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার পক্ষে যায়। এ রকম দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে অনেক। নাসিক নির্বাচন আমাদের সামনে পুনর্বার এই সত্যও প্রতিষ্ঠা করেছে, বিতর্কিত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা কতটা জরুরি। নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনসহ সবপক্ষ আন্তরিক থাকলে প্রত্যাশিত চিত্র ফুটে ওঠা যে মোটেও দুরূহ নয়, এর প্রমাণ মিলল। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং জনগণই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী- এই সত্যগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। রাজনীতিতে ভুলত্রুটি থাকতেই পারে। কিন্তু এই ভুলত্রুটি সংশোধন করতে হবে শুদ্ধ রাজনীতির চর্চার মধ্য দিয়েই, অন্য কোনো পথে নয়। গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দায় যেমন সরকারের, তেমনি বিরোধী দলসহ সহযোগী সব শক্তিরও- এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। দলীয় সরকারের অধীন বিশে^র বিভিন্ন দেশে তো বটেই, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও অবাধ, স্বচ্ছ, প্রশ্নমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কাজেই আমাদের এ ক্ষেত্রে সফল না হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে কি? দরকার শুধু দায়িত্বশীল সবপক্ষের আন্তরিকতা ও যথাযথ সহযোগিতা।

এ দেশের মানুষ যেমন গণতন্ত্রপ্রিয়, তেমনি নির্বাচনপ্রিয়ও। স্বাধীনতা আগে তো বটেই, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই রক্তাক্ত বাংলাদেশেও এর দৃষ্টান্ত আছে অনেক। সুশাসন এবং একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে জনঅধিকার ভূলুণ্ঠিত হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরশনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই বার্তাও পুনর্বার মিলেছে। রাজনীতি, নির্বাচনব্যবস্থাসহ একটি বিকশিত গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে যেসব ক্ষেত্রে সংস্কার জরুরিÑ তা করতে হবে জাতীয় স্বার্থ ও প্রয়োজনে, দলীয় বিবেচনায় নয়। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন আশার ক্ষেত্র বিস্তৃত সঙ্গত কারণেই করেছে।

 

স্মৃতি চক্রবর্তী : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলাম লেখক