advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

৫০ বছর পরেও গণহত্যার দায় অস্বীকার পাকিস্তান ও চীনের

মো. মনিরুজ্জামান
২৭ মার্চ ২০২২ ১০:৩৮ এএম | আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২২ ১০:৪০ এএম
পুরোনো ছবি
advertisement

মানব সভ্যতার ইতিহাসে একাত্তরের গণহত্যার মতো বর্বরোচিত ও নৃশংস ঘটনা খুব কম ঘটেছে। অথচ গণহত্যার ৫০ বছর পরও চলছে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা। পাকিস্তান, চীন বা যুক্তরাষ্ট্র বাঙালি জাতিকে শেষ করে দেওয়ার সেই ষড়যন্ত্রকে আজও খাটো করে দেখাতে ব্যস্ত। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনার নৃশংস হত্যাযজ্ঞকে বাংলাদেশ প্রথম থেকেই গণহত্যা বলে আসছে। কিন্তু পাকিস্তান ব্যস্ত গণহত্যার ইতিহাস বিকৃতিতে। পাকিস্তানি গবেষক ও লেখকরা এখন নতুন নতুন গল্প বানিয়ে সেই গণহত্যাকে আড়াল করার চেষ্টা শুরু করেছেন। ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা, ৩ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠনের পিছনেও যুক্তি খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান। তথ্য গোপান বা বিকৃতির মাধ্যমে ইতিহাসকে ভুল পথে চালিত করতে সহায়তা করে চলেছে চীন। সেইসঙ্গে চলছে সেনা অভিযানের পক্ষে যুক্তি সাজানোরও মরিয়া চেষ্টা। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন গত ৩১ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে বলেছে, একাত্তরের হত্যাযজ্ঞ অবশ্যই গণহত্যা বা জেনোসাইড। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক দুনিয়াকেও একাত্তরের পাকিস্তানি বর্বরতাকে গণহত্যা বলে স্বীকৃতি দানের অনুরোধ জানিয়েছে।

ঘাতক ও দালালদের শাস্তি দিতে চায় বাংলাদেশ। কিন্তু পাকিস্তানি চিন্তাবিদরা তীব্র সমালোচনা করছে এই উদ্যোগের। নিজেদের দোষ আড়াল করতে তারা আওয়ামী লীগকে বদনাম করে চলেছে। পাকিস্তান বলছে, বিএনপিকে বদনাম করতেই নাকি একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের বিচারপর্ব শুরু হয়েছে। গণহত্যায় জড়িত বিহারীদের আড়াল করারও চেষ্টা চলছে। বলা হচ্ছে, পাকিস্তানি সেনার মদদাতা বিহারীরা নাকি ন্যায় বিচার পাচ্ছে না। শুধুমাত্র বাঙালিদের হামলা, হত্যাকাণ্ড বা ধর্ষণের অভিযোগকেই নাকি বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে।

আসলে ইতিহাস ভুলে যাওয়াটা পাকিস্তানের চরিত্র। একাত্তরের ঘটনাকে বিকৃত করে চলেছে তারা। হারের স্মৃতি ভুলতে না পেরে বাহাত্তর সাল থেকেই পাকিস্তান বাড়িয়ে চলেছে প্রতিরক্ষা বরাদ্দ। একাত্তরের ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণের পরের বছরই তারা শুরু করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি। বাহাত্তরের জানুয়ারিতে পরমানু অস্ত্র বানাতে শুরু করে ইসলামাবাদ। সেইসঙ্গে পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকেও সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে নিজেদের বর্বরতার ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানোর পাশাপাশি শুরু করা হয়েছে ভারত ও হিন্দু বিরোধী প্রচার। বাঙালির মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানিত করে শুরু হয় দোষারোপের পালা। এখন আবার বলা হচ্ছে, ভারতীয় মদদপুষ্ঠ হিন্দু বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই নাকি পূর্ব পাকিস্তানে গোলমাল পাকায়। ভারতদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের থেকেই নাকি শুরু হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের অশান্তি। পাঞ্জাবের খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিযুদ্ধের। সবটাই হচ্ছে ইতিহাসকে আড়াল করার জন্য। অনলাইনে বাংলাদেশি তরুণদের মগজধোলাইয়েরও কাজ করছেন পাকিস্তানি চিন্তাবিদরা। পুরোটাই হচ্ছে সুপরিকল্পিত ষরযন্ত্রের অঙ্গ হিসেবে। নেতৃত্বে রয়েছে কুখ্যাত পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই।

তবে একাত্তরের আসল ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার পাকিস্তানি চেষ্টা সফল হতে পারে না। কারণ ২৫ মার্চের ভয়ঙ্কর সেই রাত বাঙালি জাতি কিছুতেই ভুলতে পারে না। বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মী, শিল্পী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ থেকে সাধারণ মানুষ, কাউকেই রেয়াত করেনি খান সেনারা। অপারেশন সার্চ লাইটের নামে গোটা বাঙালি জাতিকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিল তারা। সেই গণহত্যায় নেতৃত্বদানকারী এক সেনাকর্তা তো বলেইছিলেন, ‘আমরা যাকে খুশি হত্যা করতে পারি। সবাইকে হত্যা করব। যা খুশি তাই করব। আমরা কারও কাছে দায়বদ্ধ নই।’

খান সেনাদের সেই বর্বরতার কথা বারবার অস্বীকার করে চলেছে পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীরাও। তারা কিছুতেই সত্য প্রকাশ করতে চান না। দু-একজন ব্যতিক্রমী গবেষক বর্বরতার কথা উল্লেখ করতে চাইলেও পাকিস্তান সরকার এবং তাদের ধামাধরা গবেষকরা চিরকাল ব্যস্ত থেকেছে সত্যকে ধামাচাপা দিতে। পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর সন্ত্রাস নিয়ে মুখ খোলার অধিকারও নেই কারও। কারণ সেনাই সে দেশের শেষ কথা বলে এসেছে চিরকাল।

পাকিস্তান সরকারও চিরকাল একাত্তরের গণহত্যার বিচারে বাধা দিয়ে এসেছে। ঘাতকদের বিচার প্রক্রিয়াকেও তারা বিরোধিতা করেছে। ২০১৫ সালে যুদ্ধাপরাধী বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামাত-ই-ইসলামী নেতা আলি আহসান মোহম্মদ মোজাহিদের বিচার প্রক্রিয়ারও বিরোধিতা করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রক এই দুই যু্দ্ধাপরাধীর বিচারপর্বের শেষে ফাঁসি কার্যকরেরও বিরোধিতা করেছে। অথচ দুজনই বহু নৃশংস ও মানবসভ্যতা বিরোধী হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্বে ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা নিশ্চিত হলেও রাষ্ট্র হিসাবে এখনও মার্কিন প্রশাসন একাত্তরের হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা বলে স্বীকৃতি দেয়নি। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বরতাকে তারা আড়াল করতেই ব্যস্ত। নিউইয়র্কের ইথাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডোনাল্ড ডব্লিউ বিচলারের মতে, ‘পাকিস্তান সরকার বারাবর গণহত্যার কথা অস্বীকার করে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানি সেনার হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যার স্বীকৃতি দেওয়া তো দূরের কথা, নিন্দাও করতে রাজি নয়।’

চীন গোটা দুনিয়াকে সমাজতন্ত্রের কথা বলে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানকে মদদ জোগানো দেশটি এখন পাকিস্তানি বর্বরতার ইতিহাসকেও ধংস করতে চাইছে। চীনে এমনিতেই স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার নেই। গবেষকরা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তথ্য প্রকাশ করতে পারেন না। মুক্তিযুদ্ধের সময় বেজিং-এর মদদে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা বাহিনী যে ভয়ঙ্কর মানবতা বিরোধী নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তাকে ৫০ বছর পরও চীন গণহত্যা বলতে রাজি নয়। কারণ সেই গণহত্যায় নানাভাবে চীনও সাহায্য করেছিল খান সেনাকে।

পাকিস্তান চিরকালই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে খাটো করে দেখাতে চেয়েছে। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের সংগ্রাম তাদের কাছে মামুলি রাজনৈতিক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী অশান্তি হিসাবেই স্বীকৃত। অথচ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের লড়াই। শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম নয়, ঐতিহাসিকদের মতে একটি জাতিগোষ্ঠীর মুক্তির লড়াই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তান সেই মুক্তিযুদ্ধকে সর্বতোভাবে ধংস করতে চেয়েছিল। রাজাকার, আল-বাদরদের সঙ্গে নিয়ে মেতে উঠেছিল গণহত্যায়। ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে শুরু হয় গণহত্যা। ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনার হাতে ধর্ষিতা হন তিন লক্ষেরও বেশি বাঙালি নারী। জাতিসংঘের গণহত্যা বা জেনোসাইড বিষয়ক ঘোষণা অনুযায়ী একাত্তরের হত্যাযজ্ঞ অবশ্যই গণহত্যা। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন গণহত্যা খুবই কম হয়েছে। খান সেনাদের বর্বরতায় বাংলাদেশের মাটি রক্তাক্ত হলেও আজও ক্ষমা চায়নি পাকিস্তান। তাদের দুই বন্ধু রাষ্ট্র চীন ও যুক্তরাষ্ট্রও পাকিস্তানি গণহত্যা নিয়ে আজও মুখে কুলুপ এঁটে আছে।