advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নিম্নমুখী সূচকে শঙ্কা বাড়ছে অর্থনীতিতে

জিয়াদুল ইসলাম
১৬ মে ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৬ মে ২০২২ ০৯:৫৬ এএম
advertisement

অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক নিয়েই অস্বস্তিতে রয়েছে বাংলাদেশ। রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি থাকলেও আমদানি, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক বিনিময় হার, বাণিজ্য ঘাটতি ও বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে অস্বস্তি বিরাজ করছে। চাপে পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। গত সাড়ে আট মাসে রিজার্ভ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার কমে ৪১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য, সেবা ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং লাগামহীন আমদানির কারণে অব্যাহতভাবে কমে যাচ্ছে রিজার্ভ।

অন্যদিকে সংকটের কারণে মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রতিনিয়ত মান হারাচ্ছে বাংলাদেশি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে ডলার ও রিজার্ভ সাশ্রয়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর বন্ধ করা হয়েছে। বিলাসী পণ্য আমদানির লাগাম টানা হয়েছে আরও আগেই। কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

advertisement

এসব পদক্ষেপকে ইতিবাচক উল্লেখ করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শ্রীলংকা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ ধরনের পদক্ষেপ আরও আগে নেওয়া দরকার ছিল। একই সঙ্গে এ মুহূর্তে অর্থনীতির স্বার্থে বৈদেশিক বিনিময় হার আরও সমন্বয় করা এবং আমদানীকৃত পণ্যের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর আমাদের সময়কে বলেন, ‘রিজার্ভ ধরে রাখতে আমাদের আমদানি কমাতেই হবে; রপ্তানি বাড়াতে হবে। রেমিট্যান্স বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে ডলারের বিপরীতে টাকার আরও অবমূল্যায়ন করতে হবে। পণ্যমূল্য আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলেও অর্থনীতির স্বার্থেই এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। তা ছাড়া পণ্যমূল্য যা বাড়ার, তা বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে আমদানিতে ডলারের রেট ৯২-৯৩ টাকা উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া রেট এখনো ৮৭ টাকার নিচে। কাজেই টাকার অবমূল্যায়নের বিকল্প নেই।’

দেশের অর্থনীতিতে মহামারীর আঘাত আসার পরপর আমদানি ও রপ্তানি দুই-ই কমে গিয়েছিল। সে সময়ে একের পর এক রেকর্ড গড়ে অর্থনীতিতে আশা জাগিয়েছিল প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তবে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর আমদানি ও রপ্তানি দুই-ই বাড়ছে, কিন্তু কমে যাচ্ছে রেমিট্যান্স।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ১০ মাসেই রপ্তানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৪ কোটি ৪৩ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। অর্থবছরের বাকি দুই মাসে এ খাতের আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারের ঘর ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে রপ্তানি আয়ের এই সুখবরের মধ্যেই অর্থনীতির জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ আমদানি ব্যয়। কারণ রপ্তানি আয়ে বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধি থাকলেও আমদানি ব্যয় বাড়ছে তার চেয়েও বেশি হারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ৮ মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৪৩৮ কোটি ডলার। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি।

সাধারণত আমদানি ও রপ্তানি আয়ের ব্যবধান রেমিট্যান্সের মাধ্যমে সামাল দেওয়া হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। করোনা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার পর থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ নিম্নমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ। এ সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৭৩০ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ২ হাজার ৬৬ কোটি ডলার।

রপ্তানি আয়ের জোরালো প্রবৃদ্ধির পরও বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মূলত রপ্তানির চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ায় এ পরিস্থিতি। একই কারণে লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি বড় হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে ২ হাজার ৪৯০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ সময়ে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪০৭ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল সাড়ে ৫৫ কোটি ডলার। এর আগে কোনো অর্থবছরেই বৈদেশিক লেনদেনে এত বেশি ঘাটতির মুখে পড়েনি বাংলাদেশ।

সাধারণত চলতি হিসাবে ঘাটতি হলে বিদেশের সঙ্গে লেনদেনের জন্য দেশকে ঋণ করতে হয়। কারণ চলতি হিসাবে ঘাটতি মানেই সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা আয় কম, ব্যয় বেশি। আর আয় ও ব্যয়ের এই ভারসাম্যহীনতায় চাপ বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের ২৪ আগস্ট রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল, যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এক সময়ের এই রেকর্ড রিজার্ভ অব্যাহতভাবে কমতে কমতে এখন ৪১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে। গত বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪১ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে আমদানি খরচ যেভাবে বাড়ছে, তাতে সামনে তা আরও নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া ঠেকাতে আমদানীকৃত পণ্যের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দেন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বাংলাদেশ (ইউএনডিপি)-এর কান্ট্রি ইকোনমিস্ট নাজনীন আহমেদ। গত সপ্তাহে ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘রিজার্ভ কমে যাওয়া ঠেকাতে আমাদের ভূমিকা এখন কম নয়। অন্তত আগামী দুই বছর আমদানিনির্ভর বিলাসী পণ্য ব্যবহার কমাতে হবে। দেশি পণ্য ব্যবহারে মনোযোগ দিতে হবে।’

এদিকে কয়েক মাস ধরে বৈদেশিক লেনদেনে ডলারের চাহিদা বেশ বেড়েছে, কিন্তু জোগান কম। এতে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা বিরাজ করছে ডলারের বাজারে, কমে যাচ্ছে টাকার মূল্যমান। বর্তমানে আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলারের মূল্য উঠেছে ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দামে ডলার মিলছে না। ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের থেকে ৯১-৯২ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া খোলাবজারেও এখন প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৯৩ টাকা। আর ডলারের উচ্চ মূল্য ও আমদানি খরচ বৃদ্ধির কারণে দেশে পণ্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে, দেশে এখন মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২২ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির ঝুঁঁকি নিয়ে হলেও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মুদ্রা বিনিময় হার আরও সমন্বয় তথা ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন করার পক্ষে মত দেন বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘এতে আমদানি নিরুৎসাহিত হবে। রপ্তানি বাড়বে। তবে এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়তে পারে। তারপরও অর্থনীতির স্বার্থে এটা করা উচিত।’

 

advertisement