advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শেখ হাসিনার ফেরা

অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার
১৭ মে ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৭ মে ২০২২ ১০:১৬ এএম
advertisement

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিশ্ব ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। আমাদের দেশে প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস অতটা দীর্ঘ না হলেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কতটা অপরিহার্য হতে পারে একটি জাতির জন্য, সেটি বাংলাদেশের দুটি তারিখের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যায়। একটি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম পদার্পণ, অন্যটি হলো ১৯৭৫-পরবর্তী পাকিস্তানমুখী যাত্রারত বাংলাদেশে ১৯৮১ সালের ১৭ মে জাতির পিতার কন্যা ও স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।

স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা বাঙালির অনেক পুরনো। শত শত বছর ধরে বাঙালি বিজাতীয়দের দ্বারা শাসিত হয়েছে। বাংলার সন্তান সূর্য সেন, প্রীতিলতা, ক্ষুদিরাম জীবন দিয়েছেন। কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ, নেতাজি সুভাষ বোস, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানীসহ অনেকেই আজীবন বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন। অবশেষে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু মুক্তির সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত যাত্রা শুরু করতে নেতার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে গোটা জাতি। নির্মাণের যোগ্য নেতার মাধ্যমে সম্পন্ন করার জন্য জাতি উন্মুখ হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় লাভের পর থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত এবং ১০৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর, ১৯৮১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত দেশ একটি জাতীয় নেতৃত্বের অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম ও অযুত লক্ষ মানুষের অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা পেলাম- এর যাত্রা যেন শুরু হয়েও গতিহীন, কা-ারিবিহীন, লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ে একজন মানুষের, একজন নেতার অনুপস্থিতিতে। তিনি তো একজন ব্যক্তি নন, তিনি হলেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের নিউরোন ও হৃদয়ের অলিন্দ। তা ছাড়া জাতি অচল, তার স্পর্শবিহীন জাতি নিথর। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি যখন সদ্য স্বাধীন বাংলার মাটিতে পা রাখলেন, তখন মনে হলো প্রত্যেক বাঙালি তার স্পর্শে উজ্জীবিত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে অপূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগের আনন্দে মেতে উঠেছে। বাংলাদেশে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিধ্বস্ত ব্রিজ-কালভার্ট, সড়ক-রেলপথ বিধ্বস্ত, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, শিল্প-কলকারাখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিব্যবস্থাও নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন পড়ে। এই বিধ্বস্ত বাংলাকে প্রত্যাশার দেশ হিসেবে নির্মাণের পথে বঙ্গবন্ধু যখন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই দেশি-বিদেশি মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি জাতির পিতাকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে হারিয়ে জাতি কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দেয় খুনিচক্রের নেতৃত্বে পরাজিত শক্তি।

advertisement

সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপায় আবির্ভূত হন আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণের কা-ারি জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকা-ের পর ৬ বছর জার্মানি, ইংল্যান্ড, ভারতে নির্বাসিত ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এটি বাঙালি জাতির জীবনে ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। বৃষ্টিভেজা দিনে আনন্দ অশ্রু ও আকাশের পানিতে সেদিন বাঙালি জাতি শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানায়। আবার নতুন করে স্বাধীনতার ধারায় বুক বেঁধে অমিত সম্ভবনা সামনে রেখে পথ চলতে শুরু করে। এর আগে ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগের কনফারেন্সে শেখ হাসিনাকে সভাপতি করা হয়। বঙ্গবন্ধু যেমন আওয়ামী লীগের সভাপতির চেয়ে বড় হয়ে জাতির নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন, তেমনি শেখ হাসিনাকেও মানুষ আওয়ামী লীগের সভাপতির চেয়ে বড় করে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের নেতা হিসেবে বিবেচনায় নেয়। তিনি এলেন, আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করলেন, শক্তিশালী করেন। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। ১৫ দল, ১১ দল ও সর্বশেষ ১৪-দলীয় জোট গঠন ও এর নেতৃত্ব প্রদান করেন। শুধু রাজনৈতিক শক্তি নয়, এর বাইরেও তিনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেন। পাকিস্তানি ধারায় চলতে থাকা পশ্চাৎমুখী বাংলাদেশকে আবার মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য তাকে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছে। তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় ১৯ বার। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ধারায় বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য তিনি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, পঁচাত্তর ও একাত্তরের খুনিদের বিরুদ্ধে অন্দোলন, জনমত তৈরি এবং তাদের বিচারের জন্য তিনি নিজের মেধা ও দৃঢ়তা কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যান। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে, এরও আগে কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে তিনি খুনি রাজাকার, আলবদর, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারের জন্য অনেক সাহসী, ধৈর্যশীল, কৌশলী ও দৃঢ় ভূমিকা রাখেন অন্দোলন-সংগ্রাম তৈরির ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, বিচারপতি কেএম সোবাহানসহ অনেকের নাম বলা যায়। তিনি বুদ্ধিজীবী, শিল্প-সাহিত্যিকদের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ নির্মাণে অবদান রাখতে শক্তি-সাহস জুুগিয়েছেন।

বাংলাদেশে আজও অনেক সমস্যা আছে, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ নির্মাণের ক্ষেত্রে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা চালু করা বর্তমানের একটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ৩০ লাখ শহীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ তৈরি করা আজকের অপরিহার্য কর্তব্য। ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধুকন্যা দুর্নীতির বিরুদ্ধের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। দুর্নীতি যেখানেই হোক, সেটির মূল উৎপাটনের রাজনৈতিক কর্তব্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সম্পাদন করতে হবে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যসহ অনেক সূচকে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। বিধবাভাতা, বয়স্কভাতা, গৃহহীনদের আবাসনের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধিসহ অনেক কল্যাণকর পদক্ষেপের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার আজ দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। সম্প্রতি করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত সত্য। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনুন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। উন্নয়নের যাত্রা অব্যাহত থাকলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামী কয়েক বছরেই বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে শামিল হতে পারবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস রাখি।

উন্নয়নের স্বীকৃতি হিসেবে এবং সরকারের সাফল্যের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান রাখায় শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। তিনি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। তার অনেক সাফল্য রয়েছে। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সাফল্য নিজ দলের অনেক বর্ণচোর, বিশ্বাসঘাতক ও বাম-প্রগতিশীল মিত্রশক্তির অনেক অতিবিপ্লবীয় অসহযোগিতার পরও নিজে দায়িত্ব নিয়ে তার মেধা, পরিশ্রম, সাহস এবং দৃঢ়তা দিয়ে ১৯৭১ ও ১৯৭৫ সালের দাম্ভিক তথাকথিত শক্তিধর পাশবিক খুনিদের যে বিচারের ব্যবস্থা করতে পেরেছেন- সেটিই হলো সবচেয়ে বড় সাফল্য।

শেখ হাসিনা তার মেধা, যোগ্যতা ও দৃঢ়তা দিয়ে আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকেও ঐক্যবদ্ধ করেন এবং ১৯৭৫ সাল-পরবর্তী পাকিস্তানপন্থি পেছন দিকে হাঁটতে থাকা বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনেন। এক সময় মনে হয়েছিল, আমরা সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে হারাতে যাচ্ছি। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, দেশের জন্য ৩০ লাখ বাঙালি জীবন দিয়েছে, ২ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছে, অযুত লক্ষ মানুষ অবর্ণনীয় ত্যগ স্বীকার করেছে- সে দেশ হারিয়ে যেতে পারে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু নেই। তবে তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা রয়েছেন। তিনি এলেন, মানুষকে আশায় বুক বাঁধতে শক্তি জোগান, দেশবাসীকে ঐক্য বদ্ধ করেলেন, তাদের সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিকে আবারও পরাজিত করলেন এবং ১৭ কোটি বাঙালির কাছে তাদের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দিলেন। তিনি যদি দেশে ফিরে না আসতেন, তা হলে এই সাফল্য সম্ভব হতো না। কাজেই শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন মানে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ স্বদেশবাসীর কাছে ফিরে আসা।

সাম্প্রতিক করোনা সংকটেও দেখেছি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। তিনি একজন জননীর মতো দেশমাতৃকার যে কোনো সংকটে মায়ের মমতা নিয়ে জীবন বাজি রেখে এগিয়ে এসেছেন। শেখ হাসিনা একজন জননী, কন্যা। তিনি সংগ্রামী, যোদ্ধা, দার্শনিক, শিল্পী। তিনি নেতা, সফল রাষ্ট্রনায়ক- যিনি পিতার অবর্তমানে একই ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে হাজার বছরের বঞ্চিত বাংলার কৃষক, শ্রমিক, গৃহবধূ, ছাত্র, শিক্ষক, কবি, শিল্পী-সাহিত্যিকের স্বপ্ন এবং দর্শনকে নিজস্ব মেধা ও মনন দিয়ে নিপুণভাবে নিরন্তর এঁকে চলেছেন। তার ফিরে আসা দেশের ও জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন।

 

অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার : সাবেক উপ-উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়

 

advertisement