advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পদ্মা সেতুর ‘থিম সং’ তৈরির গল্প জানালেন তারকারা

শিমুল আহমেদ
২৩ জুন ২০২২ ০৬:২১ পিএম | আপডেট: ২৪ জুন ২০২২ ১২:৩৭ এএম
পদ্মা সেতুকে নিয়ে তৈরি গানে অংশ নেওয়া শিল্পীরা।
advertisement

বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু কাঙ্ক্ষিত সর্ববৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পর নাম পদ্মা সেতু। যা উদ্বোধন হচ্ছে আগামী শনিবার। এটিকে বাঙালির স্বপ্নের সেতু বললেও ভুল হবে না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের পাশাপাশি পুরো জাতীয় এখন মেতে আছে এই সেতুর আনন্দে। এটি বাঙালির গর্বে একটি স্থাপনাও। কারণ নিজ দেশের অর্থায়নে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃতে। স্বপ্নের এই সেতুর সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির আবেগ-ভালোবাসা।

স্মরণীয় এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন দেশের একঝাঁক তারকা শিল্পীরাও। সেতু মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির যৌথ আয়োজনে সেতুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে থিম সং (অফিসিয়াল গান)। যে গানটি বাজানো হবে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে উদ্বোধনীয় অনুষ্ঠানে। গানের শিরোনাম- ‘পদ্মা সেতু’। যার কথা লিখেছেন জনপ্রিয় গীতিকবি কবির বকুল।

গানের কথাগুলো এমন- ‘তুমি অবিচল দৃঢ প্রতিজ্ঞ তুমি ধূমকেতু/ বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন দেশ তুমি দিলে পদ্মা সেতু/ পেরিয়ে সকল অপশক্তি শত সহস্র বাঁধা/ পদ্মা সেতু মাথা উঁচু করা আত্মমর্যাদা/ মাথা নোয়াবার নয় বাঙালি যেহেতু/ বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন দেশ তুমি দিলে মর্যাদা পদ্মা সেতু।’ গানটির সুর-সংগীত করেছেন এই প্রজন্মের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কিশোর দাস। আর গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন দেশ বরেণ্য শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন, রফিকুল আলম, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, কুমার বিশ্বজিৎ, বাপ্পা মজুমদার, মমতাজ বেগম, দিলশাদ নাহার কনা, ইমরান মাহমুদুল ও নিশিতা বড়ুয়া। এর ভিডিও নির্মাণ করছেন কামরুল হাসান ইমরান।

গানটির জন্মকথা নিয়ে কথা বললেন এর গীতিকবি কবির বকুল। তার ভাষ্য, ‘শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লাকী (লিয়াকত আলী লাকী) ভাই আমাকে ফোন করে বলেন, “পদ্মা সেতু নিয়ে একটি গান আপনাকে লিখতে হবে। আপনি যদি একটা লেখা পাঠান।” তখন হাতে সময়ও ছিল অনেক কম। গত ২৬ মে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা বেলায় তিনি আমাকে এই প্রস্তাব দেন আর জানান রোববারে জমা দিতে হবে। আর এটা তো অনুমোদনের একটি বিষয় আছে। তাই গানটি অনেক ভেবে-চিন্তে লেখা শেষ করে নির্দিষ্ট সময়ে জমা দিই।’

কবির বকুল বলেন, ‘এরপর এক সপ্তাহ পর শিল্পকলা থেকে ফোন দিয়ে জানানো হলো, গানটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এখন গানটি সম্পন্নেরে জন্য কাজ করার। এরপর আর দেরি করিনি গানটি সুরের জন্য কিশোরকে পাঠালাম। তাকেও বলা হলো অল্প সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ করার। শুরুতে গানটির ডেমো করে তাদের পাঠানো হলো। সেটা শুনে গানটির পূর্ণ অনুমোদন দেওয়া হলো। তারপর আমরা সবাই মিলে স্বল্প সময়ের মধ্যে তালিকা অনুযায়ী শিল্পীদের নিয়ে কাজ ‍শুরু করলাম। এভাবেই তৈরি হয় আমাদের স্বপ্নের গানটি।’

সংগীতশিল্পী কিশোর বলেন, ‘বকুল ভাই ফোন দিয়ে বলল “একটা লিরিক পাঠাচ্ছি, ঘণ্টার মধ্যে আমাকে ডেমো করে দে।” আমি ভাবছি, এটা অন্য দশটা কাজের মতো। কিন্তু লিরিক হাতে পাওয়ার পর দেখলাম, এটা পদ্মা সেতু নিয়ে গান। তখন আমি বকুল ভাইকে ফোন দিয়ে বলি, এটা তো পদ্মা সেতু নিয়ে করা। এতো অল্প সময়ে কীভাবে, কী করব? সে তখন বলল, “তুই ডেমো করে দে। বাকি কথা পরে হবে।” আমি ঘন্টার মধ্যে ভয়েস ও পিয়ানো বাজিয়ে একটা ডেমো তৈরি করে বকুল ভাইকে পাঠালাম।’

কিশোর বলেন, ‘এরপর আর কোন কথা হলো না। পরের দিন বকুল ভাই ফোন দিয়ে বলে, “এটা তো পদ্মা সেতুর অফিসিয়াল গান হয়ে গেছে। এটা সুন্দর ভাবে শেষ করতে হবে।” এরপর শিল্পীদের তালিকায় দেখলাম গুণী অনেক শিল্পীরা আছেন যাদের সঙ্গে আগে কখনও কাজ করা হয়নি। এই যেমন- সাবিনা আপা, বন্যা আপা, মমতাজ আপা, রফিকুল আঙ্কেলের সঙ্গে কাজ করা হয়নি। বাকিদের সঙ্গে টুকটাক কাজ করা হয়েছে। এটা এক অন্য রকম অনুভূতি ছিল- যা বলে বোঝানো যাবে না। যখন সেতুর ওপর উঠে গানটির শুটিং করি, তখন নিজের মধ্যে দারুণ এক ভালো লাগা কাজ করছিল। আমার কাছে এখনও পুরো বিষয়টি স্বপ্নের মতো লাগছে।’

এরপর আসলো শিল্পীদের কথা। গানটির বিভিন্ন অংশে কণ্ঠ দিয়েছেন দেশ বরেণ্য শিল্পীরা। শুরুতে গানটি নিয়ে কথা বললেন রফিকুল আলম। তার ভাষ্য, ‘পুরো গানটি আবেগের জায়গা থেকে তৈরি হয়েছে। আমরা যখন জানলাম, গানটি স্বপ্নের পদ্মা সেতুর থিম সং। তখন সবার মধ্যেই অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করতে লাগলো। এমন একটি ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে সত্যি খুব ভালো লাগছে।’

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কথায় উঠে এলো তার অনুভূতির কথা। তার ভাষ্য, ‘এই সেতু নিয়ে পুরো জাতীর আবেগ-ভালোবাসা মিশে আছে। আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিলাম, আমরাও পারি। যতবার সেতুটির স্থিরচিত্র বা দুর থেকে দেখেছি, ততবারই ভিন্ন এক আবেগ কাজ করেছে, যা বলে বোঝানো যাবে না। আর যখন গানটি গাওয়ার প্রস্তাব পাই, তখন তো বাঁধভাঙা আনন্দ! এমন একটি স্থাপনা ও দেশের অহংকারের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে সত্যি খুব ভালো লাগছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিতে চাই, বাঙালির স্বপ্নকে পূরণ করার জন্য।’

কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘সব কিছুই মুহূর্তের মধ্যেই হয়ে গেছে। আমার কাছে এখনও পুরো বিষয়টি স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। গানটির ভিডিও ধারণের সুযোগে প্রথম সেতুতে পা রাখার সুযোগ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় এমন একটি স্থাপনার সঙ্গে নিজের নাম যুক্ত থাকা, সত্যি ভাগ্যের বিষয়। কালের সাক্ষী হয়ে রইলাম আমরা। আর এটা শুধু বাংলাদেশের না এটা আমাদের গৌরবের ইতিহাস।’

মমতাজের ভাষ্য, ‘এই সেতু তৈরিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যে কত ষড়যন্ত্রের মধ্যে পরতে হয়েছে তা দেশবাসী জানে। প্রধানমন্ত্রীর সব কিছু উপেক্ষা করে দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা পারি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের মাথার ওপর ছায়ার মতো আছে বলেই আমরা বিশ্ব দরবারে মাথা উচু কারে দাঁড়াচ্ছি। আর এই গানটির সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানে একটি ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। সত্যি গর্বে বুকটা ভরে যাচ্ছে।’

বাপ্পা মজুমদার এখনও আছেন ঘোরের মধ্যে। তার কথায়, ‘পদ্মা সেতুকে ঘিরে অনেক গান তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমাদের এই গানটি যে অফিসিয়াল, তা শুরুতে জানা ছিল না। যখন জানলাম, তখন পুরোটা স্বপ্নের মতো মনে হলো। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গানটি বাজানো হবে; সেখানে আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী থাকবেন! থাকবেন অসংখ্য গুণী মানুষজন। এমন একটি ক্ষণের আমাদের গান বাজবে! ভাবতেই আনন্দে বুকটা ভরে যায়।’

কনা বলেন, ‘একজন শিল্পী হিসেবে পদ্মা সেতুর থিম সং-এ অংশ নিতে পেরে আমি আনন্দিত এবং নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করছি। আরও আনন্দের বিষয় হচ্ছে, গানটির সুবাদে দেশ বরেণ্য অনেক শিল্পীর সঙ্গে গাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এছাড়াও পছন্দের সব মানুষদের নিয়ে গানটি গাইতে পারা। সব মিলিয়ে অনুভূতিটা ভীষণ আনন্দের।’

সংগীতশিল্পী ইমরানের ভাষ্য, ‘এমন একটি গানের সঙ্গে নিজের অংশগ্রহন, তার অনুভূতি মুখে প্রকাশ করার মতো না। ভালোবাসার একটি জায়গা থেকে বলব, স্বপ্নের এই সেতুর উদ্বোধনের আয়োজনে অংশ নেওয়াটা সত্যি ভাগ্যের বিষয়।’

কণ্ঠশিল্পী নিশিতা বলেন, ‘গানটির সুবাদে অনেক গুনী শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে পেরেছি। আর স্বপ্নের এই সেতুর সঙ্গে আমার নাম যে এখানে এসেছে- এটা অনেক বড় একটি পাওয়া। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।’

সবশেষে গানটির নির্মাতা কামরুল হাসান ইমরান বলেন, ‘গানটির ভিডিও ধারণের প্রস্তাবটা আসে কিশোর ভাইয়ের পক্ষ থেকে। গানের কথা ও সুর শুনে, চোখের সামনে একটি চিত্র ফুটে উঠে। আমি যেন সেই ভাবনায় মগ্ন হয়ে যাই। এরপর গানটির ভিডিও ধারণ শুরু হয়। সেতুতে পা রাখার পর অন্য এক ভূবনে চলে গেলাম। পুরো সময়টাই যেন কেটেছে ঘোরের মধ্যে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমার বানানো ভিডিও প্রচার হবে আর তা প্রধানমন্ত্রী নিজে দেখবেন- মনের মধ্যে অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করছে।’