advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

স্বপ্ন পূরণের দিন আজ

তাওহীদুল ইসলাম
২৫ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ জুন ২০২২ ০৮:০১ এএম
advertisement

স্বপ্ন হলো সত্যি। ২৪ বছর আগে বপন করা স্বপ্ন পূরণের মাহেন্দ্রক্ষণ আজ। বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালের ২৯ জুন ঋণচুক্তি বাতিল করেছিল। এর ঠিক ১০ বছর পর জুন মাসেই নিজের টাকায় সেতু করে দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের সড়ক নেটওয়ার্ককে এক সুতোয় গাঁথতে সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এর মধ্য দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত খুলছে। আজ সকালে মাওয়া প্রান্তের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথমে প্রামাণ্যচিত্র পরিদর্শন করা হতে পারে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট, স্যুভেনির শিট, উদ্বোধন-খাম ও সিলমোহর প্রকাশ করা হবে। পরিবেশন করা হবে পদ্মা সেতুর থিম সং। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিয়ে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তের উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-১ উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মোনাজাত শেষে টোল দিয়ে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে জাজিরা প্রান্তে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-২ উন্মোচন করবেন তিনি। এর পর শিবচর এলাকার কাঁঠালবাড়ীতে জনসভায় বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

advertisement 3

আজকের এই দিনে দেশের ১৭ কোটি মানুষের ৩৪ কোটি চোখ থাকবে সক্ষমতার প্রতীক পদ্মা সেতুর দিকে। কারও কাছে মাথা নত না করা এই বাঙালি সবাইকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে, আমরাই পারি, নিজের টাকায় সেতু নির্মাণ করতে। আজ ২৫ জুন পদ্মা সেতুর এই উদ্বোধনী মুহূর্তে বিশ্বের সব ভাষাভাষী মানুষ বলতে শুরু করবে বাংলাদেশ একটি আত্মবিশ্বাসের দৃষ্টান্ত। আর এর প্রতীক হচ্ছে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু। আজকের এই উদ্বোধনী উৎসব পদ্মার দুই পারে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে সেতু নির্মাণের জয়গান। লাইটিং, ব্যানার, ফেস্টুন শোভা পাচ্ছে শহর-বন্দর-গ্রামে।

advertisement 4

২০০১ সালের ৪ জুলাই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পর ২০১২ সালের ২৯ জুন অর্থায়ন বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। ২০১২ সালের ৯ জুলাই নিজের টাকায় নির্মাণের ঘোষণা দেয় সরকার। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর মূল সেতুর নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

নব্বইয়ের দশকে পদ্মা নদীতে সেতু নির্মাণের দাবি ওঠে। কিন্তু প্রমত্তা পদ্মায় সেতু নির্মাণ কি আদৌ সম্ভব, এমন উপহাস করেছিলেন কেউ কেউ। এর পর আওয়ামী লীগ সরকারের তরফ থেকে খরস্রোতা এই নদীতে সেতু নির্মাণের প্রথম বিজ বপন হয় ১৯৯৮ সালে। এ সময় নির্মাণকাজ নিয়েও অনেক জল ঘোলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কল্পিত দুর্র্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, নিজস্ব অর্থায়নের টাকা জোগানের চ্যালেঞ্জ রূপ নেয় রাজনৈতিক চাপে। এর পরও থেমে থাকেনি প্রতিবন্ধকতা। কারিগরি বাধা ও প্রকৃতির বৈরিতাও জয় করতে হয়েছে। সব শেষে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শুরু করা নির্মাণকাজের সফল সমাপ্তি হলো ৭ বছরে। সাফল্য নিজেই এসে ধরা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য ইচ্ছার কাছে।

কোনো বৈদেশিক সাহায্য ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবায়িত হলো সর্ববৃহৎ এই স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এর আগে ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন ঋণ নিয়ে নির্মিত হয়েছিল যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু। এর পর বিএনপি সরকার, তত্ত্ববধায়ক সরকার শেষে আবার ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকার। সেতু নির্মাণে উন্নয়ন সংস্থা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক, কারিগরি ও প্রাকৃতিক বাধা সবই হার মেনেছে। আওয়ামী লীগ সরকারপ্রধানের একান্ত ইচ্ছায় নির্মিত হলো দেশের সর্ববৃহৎ সেতু। দ্বিতল সেতুর বিবেচনায়ও এটি প্রথম।

ঢাকা থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে সেতুর অবস্থান। মাওয়া ও জাজিরা উপজেলা দুটিকে সংযুক্ত করেছে সেতুটি। বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে এ দুই অঞ্চলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা একান্ত প্রয়োজন ছিল। তাই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১৯টি জেলাকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করতে কোটি জনতার সময়ের দাবি ছিল পদ্মার দুপারের সেতুবন্ধ। এতে করে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল থেকে ঢাকার দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার কমল। ঢাকা ও বেনাপোল স্থলবন্দর, মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর সঙ্গে ঢাকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলো। পদ্মা সেতুতে রেললাইন থাকায় ট্রান্স-এশিয়ান রেল নেটওয়ার্ক এবং ঢাকা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দেশের প্রধান ১০টি মহাসড়কের ৯টিই ফেরি পারাপারের ভোগান্তিমুক্ত হবে (ঢাকা থেকে পাটুরিয়া হয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াত বাদে)। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত নিয়ে আসবে পদ্মা সেতু। অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন- সবই সম্ভব হচ্ছে এই একটি সেতুর ফলে। পদ্মা সেতুর দ্বার উন্মোচনের মধ্য দিয়ে দেশের পর্যটন মানচিত্র পাল্টে যাবে। রাজধানী থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৩৯৪ দশমিক ৭ কিলোমিটার। আর পদ্মা সেতু হয়ে রাজধানী থেকে কুয়াকাটার দূরত্ব ২৯৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার। বিভাগীয় শহর বরিশাল নগর থেকে দূরত্ব ১০৮ কিলোমিটার। কুয়াকাটা থেকে অল্প সময়ে সুন্দরবনের আকর্ষণীয় স্থান কচিখালী, কটকা সৈকত, জামতলা সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনসংলগ্ন সাগরে জেগে ওঠা দ্বীপ পক্ষীর চর, ডিমের চরে যাওয়া সহজ হবে।

পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পদে পদে বাধা ও চ্যালেঞ্জ জয় করতে হয়েছে। শেখ হাসিনার সাহসিকতার কারণে অর্থনৈতিক বাধা থেকে শুরু করে কারিগরি ও প্রাকৃতিক বিপত্তি সবই জয় করেছে সরকার। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারে ওপর বসানো হয় প্রথম স্প্যান। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সেই দিনের ঘটনার বিবরণ দেন। তিনি বলেন, ভারী বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে ৩০ সেপ্টেম্বর সকালেও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছিল না স্প্যান করা যাবে কি না। ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে এবং ৩ হাজার ২০০ টান ভারী স্প্যান দুলছিল ঝড়ো বাতাসে। এর পর ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর সেতুর শেষ স্প্যান স্থাপন কাজও বিঘিœত হয় কুয়াশায়। এ ছাড়া নদীর তলদেশে কাদার স্তর থাকায় পিয়ার স্থাপনেও ছিল জটিলতা। পরের দেড় বছরে বাকি সব কাজ শেষে ঐতিহাসিক পদ্মা সেতু ইতিহাস সৃষ্টি করে। স্প্যান বসানোর কাজে গতি পায় ২০১৯ সালে এসে। ওই বছর সব মিলিয়ে ১৪টি স্প্যান বসানো হয়। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাইলিংয়ের নকশায় সংশোধন, বন্যা, ভাঙনসহ নানা জটিলতায় কাজ অনেকটাই গতি হারায়। এর কারণে ২০১৮ সালের জুনের পর ২০৮ দিন কোনো স্প্যান বসানো যায়নি। অবশ্য ২০২০ সালে পদ্মা সেতুর কাজে বেশ গতি ছিল। মাঝখানে বন্যা ও করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটে। ২০২০ সালের জুন মাসের পর ১২২ দিন স্প্যান বসানো বন্ধ ছিল। এর পর টানা ১০টি স্প্যান বসে যায়। সব মিলিয়ে ২০২০ সালে ২২টি স্প্যান বসে। পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্টিলের কাঠামো (স্প্যান) বসানো হয় ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর। পদ্মা সেতুর ১২ ও ১৩তম পিলারের ওপর ৪১তম স্প্যানটি বসানোর মাধ্যমে পদ্মার দুই পাড় যুক্ত হয়ে যায়। এর মাধ্যমে বহুল আলোচিত পদ্মা সেতুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বড় কাজের সমাপ্তি হয়। পদ্মা সেতুতে প্রথম স্প্যান বসানোর পর বাকি ৪০টি স্প্যান বসাতে তিন বছর দুই মাস লাগে।

কংক্রিটের সø্যাব বসানোর মাধ্যমে পদ্মা সেতু সড়কপথ দিয়ে যুক্ত হয় ২০২১ সালের ২৩ আগস্ট। ২ হাজার ৯১৭টি কংক্রিটের সø্যাব জোড়া দিয়ে মূল সেতুর যানবাহনের পথ তৈরি করা হয়। প্রতিটি সø্যাব ২২ মিটার লম্বা এবং দুই মিটারের কিছু বেশি চওড়া। যান চলাচল উপযোগী করে তুলতে সেতুতে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর। পিচ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয় গত ২৯ এপ্রিল। গত ১৭ মে টোলের হার নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সেতু বিভাগ। টোল আদায় এবং সেতু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে কোরিয়া এক্সপ্রেস করপোরেশন (কেইসি) এবং চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি)। এর মধ্যে কেইসি পদ্মা সেতু প্রকল্পে তদারক পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে, আর এমবিইসি মূল সেতু নির্মাণকাজের দায়িত্বে আছে। তাদের পাঁচ বছরের জন্য ৬৯৩ কোটি টাকায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

পদ্মা সেতুতে ল্যাম্পপোস্ট বসানোর কাজ শুরু ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর। মোট ৪১৫টি ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়েছে। এর মধ্যে মূল সেতুতে ৩২৮টি, জাজিরা প্রান্তের উড়ালপথে (ভায়াডাক্ট) ৪৬টি, মাওয়া প্রান্তের ভায়াডাক্টে ৪১টি ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল এসব ল্যাম্পপোস্ট ও এর মধ্যে বাতি লাগানোর কাজ শেষ হয়। এর পর পুরো সেতুতে ক্যাবল (তার) টানা হয়েছে। প্রথমবারের মতো সেতুতে পরীক্ষামূলক বাতি জ্বালানো হয় ৪ জুন। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত এ সেতুর নামকরণ করেছে ‘পদ্মা সেতু’। গত ২৯ মে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক নামকরণের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে একে একে সেতু হয়েছে। মানুষের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। পণ্য পরিবহন গতি পেয়েছে। বড় বাধা ছিল পদ্মা পারাপার। এই নদী পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলায় যাতায়াতে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো মানুষকে, পণ্যবাহী ট্রাককে। ঢাকাসহ সারা দেশের যানবাহন পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গায় গিয়ে বিভিন্ন দিকে যাবে। মাদারীপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালী হয়ে একটি মহাসড়ক কুয়াকাটায় গিয়ে শেষ হয়েছে। গোপালগঞ্জ হয়ে খুলনামুখী মহাসড়কটির বেশ কিছু বিকল্প পথ আছে। একটি পথ গোপালগঞ্জের ভেতর দিয়ে নড়াইল হয়ে যশোরে সংযোগ স্থাপন করবে। যশোর সংযুক্ত হওয়া মানে হলো সেখান থেকে উত্তরবঙ্গের সঙ্গেও সংযুক্তি। তবে এর জন্য গোপালগঞ্জ ও নড়াইলের মধ্যে নির্মাণাধীন কালনা সেতু চালু হতে হবে। সেতুটির নির্মাণকাজ শেষের পথে। গোপালগঞ্জ হয়ে বাগেরহাট, মোংলাবন্দর এবং পিরোজপুরের সহজ যোগাযোগ রয়েছে। ভাঙ্গা থেকে একটি মহাসড়ক গোয়ালন্দের দিকে গেছে। সেটি পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া হয়ে খুলনাগামী মহাসড়কে সংযুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এই পদ্মা সেতু সারা দেশের সঙ্গেই সড়কপথে এক যোগসূত্র স্থাপন করে দিয়েছে।

নদীবেষ্টিত দক্ষিণাঞ্চলে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেবল সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকায় পর্যটনশিল্পের বিকাশ হয়নি। পদ্মা সেতু চালু হলে পুরো দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হবে। সড়ক যোগাযোগ হবে ফেরিমুক্ত। সাশ্রয় হবে সময়ের। এ ছাড়া ঢাকা থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় যাতায়াতে কোনো ফেরি পার হতে হবে না। এতে যাতায়াতের সময় কমবে কয়েক ঘণ্টা। এতকাল যে নদীটি কোটি মানুষের অবাধ যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে বিদ্যমান ছিল সেই পদ্মা নদীর উভয় তীরের মধ্যে একটি সহজ, নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ স্থাপিত হলো একটি সেতু নির্মাণের মাধ্যমে।

পদ্মা সেতু ১৯ জেলার মানুষকে যুক্ত করবে এমনটাই বলা হয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি)। আসলে সড়কপথে যোগাযোগ স্থাপিত হবে ২১ জেলার সঙ্গে, অর্থাৎ পুরো খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চল। পদ্মা সেতু পার হয়ে এ জেলাগুলোতে যাতায়াতের মূল কেন্দ্র হচ্ছে ভাঙ্গা। সেখানে চারটি মহাসড়ক গিয়ে মিশেছে। এসব মহাসড়কের যানবাহন চলার পথ নির্বিঘœ করতে ভাঙ্গায় নির্মাণ করা হয়েছে বহুমুখী উড়ালপথ, যা প্রকৌশলীদের ভাষায় ‘ক্লোভারলিফ ইন্টারচেঞ্জ’ নামে পরিচিত। এটি চারটি মূল মহাসড়কে উড়ালপথে যুক্ত করেছে। ইন্টারচেঞ্জটির নির্মাণকৌশল ঘোরানো-প্যাঁচানো। এর যে কোনো একটি পথ ধরে আসা যানবাহন অন্য যে কোনো তিনটি পথে চলে যেতে পারবে।

পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয় সরকারের অর্থায়নে ১৯৯৮-৯৯ সালে। জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় জাইকা ২০০৩ সালে সেতুর সমীক্ষা শুরু করে এবং মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে পদ্মা সেতু নির্মাণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে সুপারিশ করে। ২০০৭ সালে প্রস্তুতকৃত রোড মাস্টারপ্ল্যানে পদ্মা সেতু নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় সরকার। বাংলাদেশের দ্রুততম ট্রেন চলাচল উপযোগী সেতু এটি। যাত্রীবাহী ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার এবং পণ্যবাহী ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার। সড়ক যান চলবে ৬০ কিলোমিটার গতিতে। এ সেতুর স্থায়ীত্বকাল ১০০ বছর। ভায়াডাক্টসহ সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার। সেতুতে আরও থাকছে ৭৬২ মিমি ব্যাসের গ্যাস পাইপলাইন, ফাইবার অপটিক ক্যাবল ডাক্ট এবং ২ কিলোমিটার ভাটিতে আলাদাভাবে নির্মিত ৪০০ কেভি বৈদ্যুতিক লাইনের জন্য ৭টি প্ল্যাটফরম। সেতুর বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশি-বিদেশিদের গবেষণার বস্তুতে দাঁড়াবে পদ্মা সেতু। এ কারণে সবাই তখন স্মরণ করবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসিকতাকে। একই কারণে উচ্চারিত হবে বাংলাদেশের নাম।

advertisement