advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বাজেটে করারোপ ও কর প্রত্যাহার
কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে

মাহফুজুর রহমান
২৬ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৬ জুন ২০২২ ০৯:২০ এএম
মাহফুজুর রহমান
advertisement

বাংলাদেশে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হয়েছে। বাজেট নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা রকম আলোচনা হচ্ছে। সিরিয়াস আলোচনা যেমন হচ্ছে, চুটকি-রসিকতাও হচ্ছে তেমনি। মুড়ির ওপর কর কমানো হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এখন ভাতের বদলে বসে বসে মুড়ি খাব। ছেলেবেলায় শুনেছিলাম, দশ টন মুড়ি খেলে এক ফোঁটা রক্ত হয়। এটা অবশ্যই গ্রামীণ চটুল কথা, প্রমাণিত কোনো তথ্য নয়। তবে কোনো কোনো ডাক্তার বলে থাকেন, মুড়ি একটি নির্দোষ খাবার। খেলে গ্যাসের উপকার হয়। এগুলো বাদ দিলেও মুড়ি গ্রামীণ জনপদে ফার্স্ট ফুড হিসেবে দীর্ঘকাল আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। খিদে পেলে এক বাটি মুড়ির সঙ্গে গোটা কয়েক কাঁচামরিচ আর পানি খেয়ে নিলে একবেলা চলে যায়। মুড়িকে ভ্যাটের বোঝা থেকে অব্যাহতি প্রদান করায় সাধুবাদ জানাই।

আমদানি করা ল্যাপটপের ওপর বর্তমানে শতকরা ১৬ ভাগ করারোপ করা আছে। এই বাজেটে খাতটিতে আরও শতকরা ১৫ ভাগ কর আরোপ করে করা হয়েছে শতকরা ৩১ ভাগ। কম্পিউটার সমিতির সভাপতি সুব্রত সরকার বলেছেন, চাহিদার শতকরা ৯০ ভাগ ল্যাপটপই আমদানি করা। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা প্রদানের জন্যই আমদানি করা ল্যাপটপের ওপর এত অধিক পরিমাণে কর ধার্য করা হয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের পথে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে ল্যাপটপের ব্যবহারকারী প্রধানত ছাত্রছাত্রীরা। দেশীয় ল্যাপটপ তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারবে কিনা এবং এসব ল্যাপটপের মান কেমন- এসব বিষয় ভালো করে দেখে নেওয়া দরকার। দেশীয় শিল্পকে এভাবে সুরক্ষা দিতে গিয়ে প্রযুক্তিতে আমাদের জনগণ, বিশেষ করে নবীনরা পিছিয়ে যাক- এটি নিশ্চয়ই আমাদের কাম্য হতে পারে না।

advertisement

পয়ঃশোধনাগারের আমদানি শুল্ক কমেছে শতকরা ২০ ভাগ। এ ক্ষেত্রে দেশীয় পণ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনায় আনা হলো না। বিদেশি ল্যাপটপ ব্যবহার করার বদলে বিদেশি কমোড ব্যবহার খুব সুখকর হবে বলে মনে হয় না। কর অব্যাহতি সুবিধা বাতিল করে শতকরা ৫ ভাগ ভ্যাট বসানো হচ্ছে দেশি রেফ্রিজারেটরের বেলায়। এতে দেশি রেফ্রিজারেটরের দাম বাড়বে। এখন পর্যন্ত দেশে চলমান ব্যবস্থায় খোঁজ নিলে জানা যাবে, আমদানি করা রেফ্রিজারেটর কেনেন শহরে বসবাসকারী সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা। উল্টোদিকে গ্রামীণ জনপদের দরিদ্র মানুষ কম দামে দেশি রেফ্রিজারেটর কিনে উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে। এ ক্ষেত্রে দেশি রেফ্রিজারেটরের কর অব্যাহতি সুবিধা বাতিল করে নতুন করে ভ্যাট আরোপ করা হলে রেফ্রিজারেটরের দাম বাড়বে এবং প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণ রেফ্রিজারেটরের সুবিধা ভোগ করতে পারবে না। বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। পাওয়ার টিলার উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিবেচনাপ্রসূত।

কর অব্যাহতির বেলায় বলপয়েন্ট কলমের বলপয়েন্টের ওপর আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের কানে শোনার যন্ত্রে ব্যবহৃত ব্যাটারির ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার শুভঙ্করের ফাঁকি বলেই মনে হয়। ল্যাপটপের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে বলপয়েন্ট কলমের বলপয়েন্টটির ওপর কর প্রত্যাহার হাস্যকর। একটি বলপয়েন্ট কলমের দাম (আজকাল কলমের ব্যবহার দিনে দিনে কমে যাচ্ছে) পাঁচ টাকা। তা হলে এর বলপয়েন্টটির দাম কত? এর ভ্যাট মওকুফের ফলে জনগণের হাতে কত টাকা পৌঁছাবে?

এবার আসা যাক শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের কানে শোনার যন্ত্রে ব্যবহৃত ব্যাটারির ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার প্রসঙ্গে। বিশিষ্ট নিউরো কর্ণবিজ্ঞানী মোহাম্মদ সামাদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রতি দশজনে একজন কিছুটা হলেও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। তাদের মধ্যে সামান্য কয়েকজন কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার করে থাকেন। তবে দেশে কত মানুষ কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার করে এবং তাদের ব্যাটারি কতদিন চলে- এ ব্যাপারে কোনো পরিসংখ্যান নেই। একান্তই অনুমান নির্ভরভাবে ধরা যায় যে, দেশে ১০ লাখ লোক কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার করে থাকে। এসব যন্ত্রে ব্যবহৃত ব্যাটারির দাম কত টাকা? এই ব্যাটারির ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার কতজনের কাজে লাগবে? এসব ব্যাটারির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন দুই-চারজন আমদানিকারী। তারা কি সাশ্রয়ী সুবিধা ভোক্তাদের দেবেন?

বাজেটে রেলের প্রথম শ্রেণির টিকিট, সিগারেট, বিদেশি পনির ও কফির ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এসব পণ্য ও সেবা যারা ব্যবহার করেন, তারা সচ্ছল। তাই এসব পণ্য ও সেবার ওপর শুল্কারোপ যথাযথ হয়েছে। রেলে প্রথম শ্রেণির টিকিটে মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সেবার মান বৃদ্ধি ও টিকিটহীন যাত্রীদের উৎপাত কিছুটা কমানো গেলে ভালো হয়।

ওয়াটার পিউরিফাইয়ার একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পণ্য। এর ওপর আমদানির শুল্ক বিদ্যমান শতকরা ১ ভাগ থেকে বাড়িয়ে এক লাফে শতকরা ১০ ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট প্রণয়নকারীরা এরূপ প্রস্তাব উপস্থাপনের আগে ওয়াসার পানি সম্পর্কে কোনো খোঁজখবর নিয়েছেন কি? ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে নিত্যঅভিযোগ শোনা যায়, ওয়াসার পানি ময়লা ও খাওয়ার অনুপযোগী। এ কথা অস্বীকার করায় ভুক্তভোগীরা একবার ওয়াসার চেয়ারম্যানকে ওই পানি দিয়ে শরবত খাওয়াতে গিয়েছিলেন। আশা করি, মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে ওয়াটার পিউরিফাইয়ারের ওপর কর কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় আনা হবে।

অনেকা পণ্যের ওপর থেতে শুল্ক কমানো হয়েছে বা বাদ দেওয়া হয়েছে- যা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক বিদ্যমান শতকরা ২৫ ভাগ থেকে কমিয়ে শতকরা ১ ভাগে নামিয়ে আনার বিষয়টি বোধগম্য হলো না। তাই কোনো মন্তব্য করছি না। কাজুবাদাম আমার মতোই যারা খেতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি সুখবর। দাম কমলেও কমতে পারে।

হেলিকপ্টারের মূল্য কমানোর জন্য শুল্ক কমানো হয়েছে। হেলিকপ্টারের ব্যবহার দিনে দিনে বিত্তবানদের কাছে বাড়ছে। এতদিন বাংলাদেশে ধনী ও দরিদ্র মানুষের ভেতর দৃশ্যমান শ্রেণি পার্থক্য খুব একটা ছিল না। এই হেলিকপ্টারের ব্যবহার দেশে শ্রেণি পার্থক্য বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে হয়। সর্বোপরি আকাশপথে বন্যার পানি দেখা থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করা গেলে রাস্তাঘাট মেরামতের দিকে ভবিষ্যতে নজর কমও থাকতে পারে। ব্রাজিলে অত্যন্ত দরিদ্র মানুষ রাস্তাঘাটে খিদে নিয়ে শুয়ে থাকে। অন্যদিকে শিল্পপতিরা একই শহরে অবস্থিত বাসা থেকে অফিসে যায় হেলিকপ্টারে চড়ে। সরকারের দারিদ্র্য বিমোচনের প্রতিশ্রুতি হেলিকপ্টারের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে বাস্তবায়ন করা যাবে না।

পাচার করা টাকা সামান্য কর দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব নৈতিক ও যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করি না। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অধিক হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেট পাস করার বেলায় বিজ্ঞ আইন প্রণয়নকারীরা এসব বিষয় কতটা বিবেচনায় নেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মাহফুজুর রহমান : কলাম লেখক ও কথাসাহিত্যিক এবং সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement