advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সিলেটে বানভাসিদের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই

সিলেট ব্যুরো
২৬ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ জুন ২০২২ ১১:৫২ পিএম
বন্যাকবলিত সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার একটি বাজার - আমাদের সময়
advertisement

সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। যদিও কুশিয়ারাবিধৌত উপজেলাগুলোতে এখনো বন্যা কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং অনেক জায়গা নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। তবে আবহাওয়া অফিস বলছে, খুব বেশি বৃষ্টিপাত না হলে পানি নেমে যাবে ধীরে ধীরে।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকেও ফিরছে মানুষ। এ পর্যন্ত দেড় লাখের বেশি মানুষ ফিরেছেন নিজের বসতভিটায়। তবে সেসব বসতভিটা আর বাসের উপযোগী নেই।

advertisement 3

শুধু ভিটাটাই টিকে আছে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের জইকার কান্দিগ্রামের হাসিম আলীর। বাকি সবই তছনছ করে দিয়ে গেছে বন্যা। গত বৃহস্পতিবার আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ঘরে ফিরেছেন। ঘরের সঙ্গে ভেঙে গেছে তার মনও। নিজে ফিরলেও পরিবারের অন্যদের নিয়ে আসতে পারছেন না। নিরুপায় হয়ে বলেন, ‘নানান জনে খাবার দিচ্ছে এনে। তাই খাচ্ছি একবেলা করে। কিন্তু বানের পানি আমাদের সব নিয়ে গেছে।

advertisement 4

পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। এখন ঘর মেরামত করব কী করে? আসবাবপত্র কেনারই বা টাকা পাব কোথায়?’

একই দিন ঘরে ফিরেছেন জৈন্তাপুরের রাসেল মিয়া। তিনি বলেন, ‘পানিতে ঘর ভেঙে গেছে। ঘরের ভেতরে হাঁটুসমান কাদা। এই ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকব কী করে? আয়-রোজগার বন্ধ। ভাত খাওয়ারও পয়সা নেই। ঘর মেরামত করব কী করে?’

বানের পানি নামতে শুরু করলেও হাসিম ও রাসেলের মতো অনেকেই এখন দিশেহারা। ঘরবাড়ি বানের পানিতে ভেঙে গেছে; নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র। নিম্ন আয়ের মানুষজন সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন।

গত ১৫ জুন থেকে চলতি বছরে তৃতীয় দফায় বন্যা দেখেছে সিলেট। স্মরণকালের ভয়াবহ এ বন্যায় তলিয়েছে সিলেটের প্রায় ৮০ শতাংশ। এখনো বেশির ভাগ এলাকা জলমগ্ন।

জেলা প্রশাসনের হিসাবে, চলমান বন্যায় জেলায় ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৪ জন মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। শুক্রবার (২৪ জুন) পর্যন্ত সিলেট সিটি করপোরেশনের আংশিক, জেলার ১৩টি উপজেলা ও ৫টি পৌরসভায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৩২০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২২ হাজার ১৫০টি ঘরবাড়ি। ফসল নষ্ট হয়েছে ২৮ হাজার ৯৪৫ হেক্টর।

গত ২০ জুন পর্যন্ত সিলেট জেলার ১৩ উপজেলা ও সিলেট সিটি করপোরেশনে ৬১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৮ জন আশ্রয় নেন। তবে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন ৯১ হাজার ৬২৩ জন। সে হিসেবে, প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরেছেন।

সুফিয়া খাতুনের বাড়ি সদর উপজেলার মইয়ারচর এলাকায়। তিনিও পাঁচ দিন বাদাঘাট স্কুলে থেকে বাড়ি ফিরেছেন। ফিরে দেখেন ভেসে গেছে শৌচাগার। আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এগুলো এখন মেরামত করাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।

দুর্গত এলাকার মানুষের হাতে এক বেলার খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। এদের একজন বাপ্পা ঘোষ চৌধুরী বলেন, আপাতত শুকনা খাবার বিতরণের চেয়ে বন্যার্তদের পুনর্বাসনের জন্য ফান্ড গঠন করা দরকার। মানুষ তার আপদকালীন সঞ্চয় আর ত্রাণ দিয়ে বন্যা চলাকালীন সংকট পার করে দিতে পারবে। কিন্তু তার মূল বিপদ পানি নামার পরেই দেখা দেবে। কারণ টিনের চাল, ঘরের বেড়া পানিতে তলিয়ে গেছে। ঘরের আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাঁস-মুরগি ভেসে গেছে। পানি নামার পর এগুলো মেরামতে বিপদে পড়বে তারা। এই মানুষজন ঘর ও আসবাবপত্র মেরামতে মহাজন বা বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান থেকে হয়তো ঋণ নেবে। তখন তারা আরও বিপদে পড়বে।

এদিকে শনিবার (২৫ জুন) দুপুরে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান সড়কগুলোর যেসব স্থানে পানি জমে ছিল, সেগুলো প্রায় নেমে গেছে। তবে কিছু সড়কে এখনো পানি রয়েছে। এর মধ্যে সিলেট নগরীর শাহজালাল উপশহর এবং তালতলা সড়কসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার সড়কগুলোতেও পানি রয়ে গেছে। তবে সব কটি সড়কেই যানবাহন চলাচল করছে।

অপরদিকে, নগরীর যতরপুর, মিরাবাজার, শাহজালাল উপশহর, সোবহানীঘাট, মির্জাজাঙ্গাল, তালতলা, জামতলা, শেখঘাট, ঘাসিটুলা, কুয়ারপাড়, লালাদিঘীর পাড় এলাকার পাড়া-মহল্লার পানি ময়লা ও কালো রং ধারণ করেছে। এসব স্থানে জমে থাকা পানি থেকে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

পাঁচ দিন ধরে ধীরে ধীরে সুরমা নদীর পানি কমতে শুরু করে। অন্যদিকে কুশিয়ারা অববাহিকায় পানি বাড়ছে। কুশিয়ারার পানি বাড়ায় শুক্রবার পর্যন্ত জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, ওসমানীনগর, বিশ্বনাথ, দক্ষিণ সুরমায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, এখনো বেশির ভাগ জায়গায় পানি রয়ে গেছে। এখন আমরা ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছি। পানি পুরো নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হবে। সে ব্যাপারে তালিকা করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষি প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আছে।

ওসমানীনগর (সিলেট) প্রতিনিধি জানান, ওসমানীনগরে বন্যার পানি ধীরগতিতে কমছে। গত দুদিনে কুশিয়ারা নদীতীরবর্তী সাদিপুর এলাকায় প্রায় ৬ ইঞ্চি পানি কমছে। পানি কমায় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ও পানিবন্দিরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বানভাসিরা। তবে শনিবার পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কেউ বাড়িতে ফেরার তথ্য পায়নি উপজেলা কন্ট্রোলরুম। নিজ বাড়িতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আসবাবপত্রসহ বাড়ি ঘরের খোঁজ নিচ্ছেন অনেকই। দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকায় বেশির ভাগ কাঁচা বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মজিদ মিয়া বলেন, পানি ধীরে কমছে। দু-একদিনের মধ্যে বাড়িতে যাব। বাড়িতে গিয়েওবা কী করব। ঘর তো আর আগের মতো নেই। থাকব কোথায়!

জকিগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি জানান, জকিগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। উপজেলার ৯ ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। এ পর্যন্ত ১১০ টন চাল, নগদ সাড়ে ১০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলার ৫৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৮০১টি পরিবারের ৩ হাজার ৪৫৬ জন আশ্রয় নিয়েছেন। তা ছাড়াও আশ্রয়কেন্দ্রে ৭৯টি গরু ও ৪৯টি ছাগল রয়েছে। বন্যায় বন্ধ হয়ে গেছে শেওলা-জকিগঞ্জ ও আটগ্রাম সড়ক। তলিয়ে গেছে জকিগঞ্জ-সিলেট প্রধান সড়কও। জকিগঞ্জ-সিলেট প্রধান সড়ক দিয়ে বড় যানবাহন কিছুটা চলাচল করতে পারলেও শেওলা-জকিগঞ্জ ও আটগ্রাম সড়ক পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সুরমা-কুশিয়ারা নদীতে পানি কিছুটা কমলেও লোকালয়ে পানি এখনো বাড়ছে। গ্রামাঞ্চলে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। উপজেলায় প্রায় ৫০টি ভাঙন দিয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করছে। সময় সময় নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও যাতায়াত সমস্যার কারণে নিম্নাঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি।

advertisement