advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কী শিখেছি এত বছরে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
২৯ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৯ জুন ২০২২ ১১:৪২ এএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
advertisement

ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রবেশ বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বছরে। তার পর অনেক ঘটনা ঘটেছে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে। ওই যে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা, সেখান থেকে আর সরা হয়নি। ইচ্ছা করেই সরিনি। কিন্তু কী শিখেছি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে? এক কথায় বলতে গেলে বিশেষভাবে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছি দুটি ব্যাপারে। একটি গ্রন্থমনস্কতা, অন্যটি সামাজিকতা। আলাদাভাবে নয়, একসঙ্গেই। ওই দুই বস্তু আমার ভেতর কতটুকু ছিল জানি না, যতটুকু ছিল- তারা উভয়েই যে বিকশিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

আমরা ঢাকায় এসেছি ১৯৪৮ সালে। তখন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশেই এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভেতরেই পারিবারিকভাবে আমার বসবাস। কিশোর বয়সে যখন বাইরে থেকে দেখেছি, ছাত্র হয়ে ভেতরে প্রবেশ করিনি- তখন পুরনো কলাভবনের পাশ দিয়ে নিত্যযাতায়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি প্রতিষ্ঠান আমাকে খুব টানত। একটি এর গ্রন্থাগার, অন্যটি মধুর দোকান। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে অনেকের সঙ্গে আমিও পুরনো কলাভবনের আমতলা, গ্রন্থাগার ও মধুর দোকানের মাঝখানে ঘটনাবিখ্যাত জায়গাটিতে ছিলাম। টিয়ার শেলের তাড়া খেয়ে বাসায় ফিরে আসি। কিছুক্ষণ পর শুনলাম গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তখন আমি আইএ পরীক্ষার্থী। বছরের শেষ দিকে ফল প্রকাশ পেল এবং আমি ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে গেলাম।

advertisement

আমার পিতা চেয়েছিলেন আমি অর্থনীতি পড়ি। আমার ভয় জমেছিল গণিতে। অর্থনীতিবিদ্যাটি ওই সময় আকীর্ণ ছিল গণিতের দ্বারা। তাই ওমুখো হওয়ার মতো সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি। ভেতরে ভেতরে ইচ্ছা ছিল বাংলা বিভাগে ভর্তি হব। এর কারণ সাহিত্যে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ। পরে পিতা-পুত্রে সমঝোতা হয়েছে। আমি ইংরেজিতে ভর্তি হয়েছি। ভর্তি হওয়ার ব্যাপারটি তখন খুবই সহজ ছিল। হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্টই ছাত্র বাছাই করতেন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার সফল শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা তার টেবিলে থাকত। সেটি দেখেই অনুমতি দিয়ে দিতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেই একেবারে হাতের কাছে পেয়ে গেলাম হাতছানি দেওয়া গ্রন্থাগার ও মধুর দোকানকে। ক্লাসের ফাঁকে গ্রন্থাগারে যাওয়া। সেখান থেকে বের হয়ে মধুর দোকানে গিয়ে চা-শিঙাড়া খেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজব করে সম্ভব হলে আবার গ্রন্থাগারে ফিরে আসা। গ্রন্থাগার পুষ্ট করেছে আমার গ্রন্থমনস্কতাকে আর মধুর দোকান ছিল সামাজিকতার জন্য প্রশস্ত ক্ষেত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছাত্রজীবনের চার বছরে শ্রেষ্ঠ সময় ছিল অনার্স পরীক্ষার আগের কয়েকটি মাস। পরীক্ষা দেওয়ার ঘটনাটি মোটেই আনন্দদায়ক হয়নি, হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু প্রস্তুতিটা ছিল নিজের ভেতর একটি জাগরণের মতো। তখন আমরা থাকতাম আজিমপুর সরকারি কর্মচারীদের আবাসিক এলাকায়। রোজ বিকালে চলে আসতাম গ্রন্থাগারে। ফিরতাম রাতে, ৯টায় যখন গ্রন্থাগার বন্ধ হতো; এর পর। অজানা কিন্তু নাম শোনা সব বই পড়ছি, নোট নিচ্ছি, ক্লাসে যেসব টেক্সট পড়ানো হয়েছে- সেগুলো নতুনভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। তা একটি মস্ত চাঞ্চল্য, ভোলার নয়।

এদিকে ১৯৫২ সালে ভর্তি হওয়ার মাস কয়েক পরই দেখতে পেলাম, আমি হল সংসদের নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গিয়েছি। সদস্যপদে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বছরটি সবেমাত্র কেটেছে। মুসলিম লীগবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলেছে। ওই ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে আমরা যারা দাঁড়িয়েছিলাম, তারা সবাই অতিসহজেই নির্বাচিত হয়ে গিয়েছি। এর আগে আজিমপুরে আমরা ছাত্র সংঘ গড়েছিলাম। সেখানেও একটি সামাজিক পরিসর তৈরি হয়েছিল। হল সংসদে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমি আরও বড় একটি সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম। বিশ্ববিদ্যালয় তখন এত বড় হয়নি। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বোধ করি আড়াই হাজার হবে, শিক্ষক ছিলেন মনে হয় দেড়শজনের মতো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জীবনটি ছিল প্রাণবন্ত। আবাসিক হলে নানা ধরনের অনুষ্ঠান হতো, নির্বাচন তো ছিল রীতিমতো উৎসব। নিয়মিত সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো, হল বার্ষিকী প্রকাশিত হতো- এতে আমরা লিখতাম। মতাদর্শিক তর্কবিতর্ক চলতো। কাছেই ছিল বেতারকেন্দ্র। বেতার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগও পেয়েছি।

ওই যে আমার দুটি প্রবণতা- বই পড়ার আগ্রহ ও সামাজিক হওয়ার ইচ্ছা। এগুলো পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক ছিল গ্রন্থাগার ও মধুর দোকানের মতোই। ছাত্রজীবন শেষ করে যখন শিক্ষক হলাম, তখন আর মধুর দোকানে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু পুরনো কলাভবনের ওপরই ছিল শিক্ষকদের ক্লাব। ক্লাবকে মধুর দোকানেরই উন্নত সংস্করণ বলে মনে হতো আমার। অন্য বিভাগের সমবয়স্ক শিক্ষকরা তো অবশ্যই, সরাসরি যারা আমার শিক্ষক ছিলেন- তারাও প্রশ্রয় দিতেন। একটি প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ক্লাবে যাতায়াতের দরুন। বিভাগীয় শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রন্থমনস্ক ছিলেন বিসি রায়। তার সঙ্গে প্রায়ই আমার দেখা হতো গ্রন্থাগারে। কিন্তু তিনি ক্লাবে আসতেন না। আমাদের অধিকাংশেরই ক্লাবে গিয়ে চা ও ডিমের অমলেট না খেলে চলত না।

পেছনে ফিরে দেখি বই পড়ার ঝোঁক আমাকে যে গ্রন্থকীটে পরিণত করতে পারেনি, এর কারণ হলো সামাজিকতার বোধ। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় এর চেয়েও বড়। তা একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানও। বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে বুঝতে শিখিয়েছে, কোনো বৃদ্ধিই একাকী ঘটার নয়। এ জন্য অন্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। বই তো আমাদের বড় জগতেই নিয়ে যায়; অনুভব ও কল্পনাজগতের অনিঃশেষ যে পরিধি, সেখানে প্রবেশের আহ্বান জানায়; প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।

বলছিলাম প্রথম বছরেই নির্বাচনে দাঁড়ানোর ব্যাপারটি ঘটেছিল। সেটি আকস্মিক নয়, বরং ছিল খুবই স্বাভাবিক। তার পর সভা, সমিতি, আন্দোলন, সম্মেলন, পত্রিকা সম্পাদনা, বহু রকমের কাজ করেছি। কিন্তু বই আমাকে ছাড়েনি, আমিও বইকে ছাড়ার কথা ভাবতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে নানা রকমের প্রতিষ্ঠান আছে। শিক্ষকতার কালে এগুলোর কয়েকটিতেই আমি নির্বাচনপ্রার্থী হয়েছি। কখনো স্বেচ্ছায়, কখনো বা বাধ্য হয়ে। নির্বাচনে দাঁড়ানোটি অপরিহার্যই ছিল- পদের জন্য নয়, প্রতিবাদের জন্য। রাষ্ট্র ছিল স্বৈরাচারী। আমরা দাঁড়াতাম এর বিরুদ্ধে। আমাদের পূর্ব প্রজন্মের সব মানুষ ছিল সাতচল্লিশের দেশভাগের উপকারভোগী ও ভুক্তভোগী- দুটিই। আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে। ওই আন্দোলনের প্রেরণাটি ভেতরে রয়ে গেছে। এ জন্য অবস্থান বদলানো সম্ভব হয়নি।

বলা হয়ে থাকে যে, শিক্ষার মান নেমে গেছে। সেটি কতটি সত্য, তা পরিমাপ করে বলা কঠিন। তবে গ্রন্থমনস্কতা ও সামাজিকতায় যে ঘাটতি পড়েছে, এতে সন্দেহ নেই। এটি কাক্সিক্ষত ছিল না। একাত্তরের বিজয়ের পর মনে হয়েছিল একটি জাগরণ এসেছে। কিন্তু সেটিকে ধরে রাখা সম্ভব হলো না। আমরা পারলাম না। হেরে গেলাম। বইয়ের ব্যবহার কমেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে সাংস্কৃতিক জীবন নিতান্ত সীমিত। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন এমনটি ভাবতেই পারতাম না। আমাদের জন্য শিক্ষার তিনটি জায়গা ছিল- ক্লাসরুম, গ্রন্থাগার ও ছাত্র সংসদ। মধুর দোকান ছিল ছাত্র সংসদেরই অংশ।

সাংস্কৃতিক জীবনের স্তিমিতদশার পেছনে মূল কারণটি অবশ্য আর্থসামাজিক। সমাজে হতাশা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের দিকে তাকালে আলো যত না দেখে, এর চেয়ে অধিক দেখতে পায় অন্ধকার। তারা পড়ালেখায় উৎসাহ পায় না। বার্ষিকী প্রকাশিত হয় না। নাটক, গান, আবৃত্তি, বক্তৃতা- এসবের প্রতিযোগিতা প্রায় উঠেই গেছে। খেলাধুলায় নিয়মিত অনুশীলন ঘটে না। কিন্তু ব্যর্থতার দায়ভার কেবল অন্যদের ঘাড়ে চাপানোর উপায় নেই। আমরা যারা শিক্ষকতা করি, তারাও পারিনি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক জীবনকে প্রাণবন্ত করে তুলতে। সামাজিক জীবন সাংস্কৃতিক জীবনেরই অংশ, একে অপরের ওপর নির্ভরশীলও বটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই- এ কথাটিই জোর দিয়ে বলব। যদি দ্বিতীয় জীবন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত, তা হলে কোনো সন্দেহ নেই যে- আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়েই থাকব, এ কথাই বলতাম।

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement