advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ইমতিয়াজ পারভেজ
কঙ্গোয় ব্যানএমপির সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

২৯ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম
আপডেট: ২৮ জুন ২০২২ ১১:৪৬ পিএম
advertisement

ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় বহুদিন ধরে চালা সংঘাতের অংশ গোমার কাছে রুয়ান্ডার সীমান্তজুড়ে যার শেষ প্রান্তে অবস্থিত উত্তর প্রদেশের পাহাড় বেষ্টিত অঞ্চল সাকে। সমুদ্র সমতল থেকে ১ হাজার ৪৬০ মিটার ওপরে অবস্থিত ২ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের আফ্রিকার অষ্টম স্থানীয় হ্রদ কিভুর পাড়ে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি নাইরোগঙ্গার পাদদেশে আগ্নেয়গিরির শিলা ও পাথরের ওপর বাংলাদেশ মিলিটারি পুলিশের এই সাকে ক্যাম্প হ্রদের পূর্বদিকে ৪০ শতাংশ পড়েছে রুয়ান্ডায় ও ৬০ শতাংশ অবস্থিত ডিআর কঙ্গোয়। হ্রদের উত্তরদিকে দুটি বড় শহরের একটি গোমা পড়েছে কঙ্গোয় আর গিনসে নামক শহরটি পড়ছে রুয়ান্ডায়। দুটি শহরের মধ্যবর্তী দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার। নাইরোগঙ্গা আগ্নেয়গিরিটির সর্বশেষ অগ্ন্যুপাত ঘটেছে ২০২১ সালের ২ মে। এতে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বাড়ি, ৭টি স্কুল ও ৪টি হাসপাতাল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং ২ লক্ষাধিক লোক পানীয় জলের তীব্র সংকটে পড়ে।

advertisement

সাকে বেসে ব্যানএমপির ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটালিয়ন, ভারতীয় ব্যাটালিয়ন ও মালাউয়ি ব্যাটালিয়ন ছিল। কেউ আক্রান্ত হলে হেলি সাপোর্ট পেতে হবে গোমা বা অন্য জায়গা থেকে। দেড়-দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে আনতে হয় রেশন। সাকে ক্যাম্প সংলগ্ন লেক- যেখানে মেঘের ডানায় জীবন উৎসবে ভেসে বেড়ানোর আহ্বান। অন্যদিকে পাথুরে কালো মাটির সুউচ্চ পাহাড় বেষ্টিত এলাকা। পরক্ষণেই সংবিত ফেরে তীব্র অচেনা সময়ে বৃত্তবন্দি শান্তিরক্ষীর জীবনে- যেখানে সংঘাতের আন্দোলিত ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর মানুষের বিধ্বস্ত জীবনপ্রবাহের পটলিপি। আর এই চ্যালেঞ্জিং দায়িত্বে ব্রত ছিল ফোর্স ব্যানএমপি-১৫ ইউনিট। সাকে ক্যাম্প ডিটাচমেন্ট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ ঘটেছিল মার্চ ২০২১-এ। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বেসের বাইরে তেমন একটা যাওয়া হয়ে ওঠে না। পাথুরে সংযোগ সড়ক, মনুস্ক সব ধরনের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনার সব ধরনের নিরাপত্তা বিধান, দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ কোনো ধরনের ঘটনা-দুর্ঘটনার পর্যাপ্ত তদন্ত করে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা, কঙ্গোলিজ স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং জাতিসংঘ কর্তৃপক্ষের মধ্যে যথাযথ সংযোগ সাধন করা ব্যানএমপির কাজ। সাকের এমটির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা প্রায় ২৮০ কিলোমিটার সব সময় জাতিসংঘ বেস ক্যাম্পের শুরুতে বা শেষে জাতিসংঘ মিলিটারি পুলিশ থাকে- যাতে কোনো ধরনের আক্রমণ বা প্রশাসনিক জটিলতা হলে প্রথমেই তাদের মোকাবিলা করতে হয়। তবে জনবল খুব কম। যেমন- সাকে ব্যানএমপির জনবল ছিল ১৬ জন (একজন অফিসার ও ১৫ জন অন্যান্য পদমর্যাদার)

২০০৩ সালে প্রথম ব্যানএমপির সদস্যরা মনুস্কর জাতিসংঘ মিশনে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শুরু করে। বর্তমানে মনুস্কতে সাউথ আফ্রিকান মিলিটারি পুলিশকে পেছনে ফেলে অভিযানিক দক্ষতা ও সক্ষমতায় সেরা বাংলাদেশ মিলিটারি পুলিশ ফোর্স ব্যানএমপি কন্টিনজেন্ট বাংলাদেশ থেকে ১৬ গুণ বড় আয়তনের কঙ্গোয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন প্রত্যয়ে রাজধানী কিনাশাসাসহ তিনটি নতুন ডিটাচমেন্টের দায়িত্ব নিয়েছে। আর এর মাধ্যমে পুরো কঙ্গোয় বাংলাদেশ মিলিটারি পুলিশ ইউনিট (ফোর্স ব্যানএমপি) হয়েছে ১১টি।

উল্লেখ্য, ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত তিনটি ইউনিট বৃদ্ধি পায়- যা আগে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার (কিনশাসা, এনতেবে, বুনিয়া)। বর্তমানে ব্যানএমপির সদস্যরা কঙ্গোর গোমা, বেনি বুনিয়া, কামেলি, বুকাকু, কাবুমু, উভিরা, কিনশাসা, এনতেবে, সাকেতে নিয়োজিত রয়েছেন। ওই কন্টিনজেন্টের ওপর মিশন এলাকায় জাতিসংঘের নিয়ম-কানুন পালন ও সামরিক শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়। আপাদমস্তক পেশাদার ফোর্স ব্যানএমপি সব ভূমিকাতেই অনন্য এবং সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে অবিচল থেকে সর্বদা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সচেষ্ট।

শান্তিরক্ষীদের যানবাহনের শৃঙ্খলা বজায় রাখা ছাড়াও ব্যানএমপি তাদের মিশন এলাকায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। কঙ্গোর সড়কে যে কোনো দেশের শান্তিরক্ষীদের গাড়িতে দুর্ঘটনা ঘটলেও এর প্রতিবেদন দাখিল ও সুপারিশ উপস্থাপন এবং জাতিসংঘের সব যানবাহনের অপারেশনাল ব্যবহার নিশ্চিত করা, রাতে জাতিসংঘ কারফিউ আওতায় চালাকালীন (জাতিসংঘে কর্মরত সামরিক-বেসামরিক সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য) যে কোনো দেশের শান্তিরক্ষীদের নিষিদ্ধ এলাকা বা ক্লাব বারে গমনাগমন রোধ ও পর্যবেক্ষণ করে ব্যানএমপি। সামরিক কন্টিনজেন্টের রোটেশন বা বদলির সময় বিমানবন্দর থেকে তাদের লাগেজ চেক এবং কেউ নিষিদ্ধ কিছু বহন করেছে কিনা, তাও পরীক্ষা করে থাকেন তারা। কঙ্গোর সঙ্গে রুয়ান্ডা ও বুরুন্ডি সীমান্তে চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে জাতিসংঘের কোনো সদস্য অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেছে কিনা, এটিও পরীক্ষা করে ব্যানএমপি। বিভিন্ন পদে দায়িত্বরত শান্তিরক্ষীদের পরিচয়পত্র যাচাই করা তাদের দায়িত্ব। ফোর্স কমান্ডারের প্রটোকল হিসেবে সার্বক্ষণিক এসকর্ট প্রদান করে থাকে। ব্যানএমপির আরেকটি দায়িত্ব হলো কঙ্গোয় যৌন হয়রানি ও শোষণ প্রতিরোধে শান্তিরক্ষীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা পালন করা। অধিকন্তু বিভিন্ন দেশের কন্টিনজেন্টের গাড়িচালকদের দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে জয়েন্ট অপারেশন করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে (আউট অব বাউন্ড এরিয়া) ঘোষণা করা হয়ে থাকে।

অতিমারী করোনা পেরিয়ে সংঘাতপূর্ণ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় শান্তি স্থাপনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠায় ব্যানএমপি ১৫-এর সংগঠিত, দৃঢ় ও গতিময় উপস্থিতিতে ব্যান ইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্টের শান্তিরক্ষীদের পরিচালনায় তিনটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে কঙ্গোয় কন্টিনজেন্ট প্রতিস্থাপন করতে আসা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীসহ মরক্কো ও কেনিয়ার শান্তিরক্ষীরা বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিন পালন করেছেন, এর সার্বিক নিরাপত্তা ও নিয়ম শৃঙ্খলার বিষয়টি দেখভাল করেছেন। তবে সাকেতে বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষীরা এ কাজটি আন্তরিকতার সঙ্গে যথাযথভাবে সচল রেখেছেন। তা ইতোমধ্যে জাতিসংঘ কর্তৃক ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, আমি ব্যানএমপি-১৫ কিনশাসা ডিটাচমেন্ট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অন্য একটি দেশের (মরক্কো) অ্যারোমেডিক ইভাকুয়েশন টিমের পরিদর্শনে এর বড় ধরনের ব্যত্যয় খুঁজে পেয়ে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রতিফলিত করায় এর পরিবর্তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অ্যারোমেডিক ইভাকুয়েশন টিমের ওই স্থলে স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সুযোগ ঘটে। তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের পেশাদারিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২০-২১ সালে ব্যানএমপি ১৫-তে নিয়োজিত হয়ে পেশাগত নৈপুণ্যের নিদর্শনস্বরূপ মনুস্ক ফোর্স কমান্ডার প্রশংসাপত্র দ্বিতীয়বারের মতো অর্জন করি।

২০১৩-১৪ সালে ব্যানএমপি-৯ নিযুক্ত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পেশাগত দায়িত্ব পালনে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করায় মনুস্ক ফোর্স কমান্ডার প্রশংসাপত্র প্রথমবার অর্জন করি। জীবনের কিছু ক্ষুদ্র মুহূর্ত মনে হয় সুখময় স্মৃতির এক বিরাট আঁধার। কিছু প্রাপ্তি, স্বীকৃতি সব সময় এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ এমনি লীলাতব’ পার্থিব অনেক কিছুই হয়তো আছে- যার মূল্য অর্থের মাপকাঠিতে ছবির স্মারক দুটির চেয়ে বেশি। কিন্তু নিজেকে সবচেয়ে বেশি ঋদ্ধ আর পূর্ণ মনে করি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের দুটি ফোর্স কমান্ডার সার্টিফিকেটের জন্য।

ডিআর কঙ্গোয় নিয়োজিত শান্তিরক্ষা মিশনের অন্য সদস্যদের শৃঙ্খলাজনিত বিষয়গুলো দেখভালের দায়িত্ব পাওয়া সম্মানজনক। এ দায়িত্ব ব্যানএমপি সফলতার সঙ্গে পালন করছে। এতে অন্যান্য দেশের শান্তিরক্ষী ও স্থানীয় কঙ্গোলিজ জনগোষ্ঠীর কাছে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা এক অন্য রকম আস্থার জায়গা করে নিয়েছেন। দেশ থেকে ৮ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে থাকার পরও বাংলাদেশের মিলিটারি পুলিশের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে সবার পেশাদারি মনোভাব, আন্তরিকতা, পারস্পরিক বিশ্বাস ও চেইন অব কমান্ডের প্রতি আস্থার কারণে। বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ফোরামে মনুস্ক ফোর্স কমান্ডার ব্যানএমপি-১৫ যখন ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে, তখন মনে হয়েছে প্রাপ্তির মাপকাঠিতে আরও একটি পালক যুক্ত হলো।

বিষাদ কেটে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া সুখ খুঁজে পাক ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর সাধারণ মানুষ, সূর্যাস্তের পর নতুন সূর্যোদয়ের দেখা পাক। সংঘাতে আন্দোলিত ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিধ্বস্ত জীবনপ্রবাহের যোগসূত্রে স্থাপিত হোক শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চিন্তে আলিঙ্গনে। অতিমারীর দুর্বিষহ সময় পাড়ি দিয়ে মৃত্যুর মিছিল থেকে মুক্ত হয়ে আফ্রিকার এই পশ্চাৎপদ জনপদ উদ্ভাসিত হোক নতুন দিনের সৌরভে।

ইমতিয়াজ পারভেজ : মেজর

advertisement