advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বিএনপির মূল চিন্তা যুগপৎ আন্দোলন

নজরুল ইসলাম
৬ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২২ ১২:১৫ এএম
advertisement

সরকার পতনে রাজপথের চূড়ান্ত আন্দোলন বিষয়ে তাড়াহুড়া করতে চাইছে না বিএনপি। হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন করতে চাইছে। ধীরে ধীরে এই আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায় নিয়ে নিরপেক্ষ সরকার দাবি আদায় করাই মূল লক্ষ্য বিএনপির।

advertisement

এ লক্ষ্যেই ‘অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা’ দূর করে নেতাকর্মীদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করা, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় আনা এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নিতে কাজ করছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। দলটি এবার জোটবদ্ধ নয়, রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন করতেই ব্যস্ত সময় পার করছে।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নয়, সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে আন্দোলনের সুফল ঘরে তুলতে চায় দলটি। এ জন্য ‘সন্তোষজনক’ প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে চাইছে। এবারের আন্দোলনে ব্যর্থ হলে বিএনপি ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে ‘বড়’ খেসারত দিতে হবে।

আন্দোলন প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগ থেকে যে আন্দোলন, তাতেই আছি। যখন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নামব, আন্দোলনই বলে দেবে এর ধারা কোন পথে যাবে। যুগপৎ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। ১৯৯০ সালে ৫ দল, ৭ দল ও ৮ দল মিলে যুগপৎ আন্দোলন হয়েছে। সেই মডেলে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আমরা কথা বলছি। সবাই যার যার অবস্থান থেকে আন্দোলন শুরু করবে।

নিরপেক্ষ সরকার দাবিতে রাজপথে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গত ২৪ মে থেকে ধারাবাহিক বৈঠক করে আসছে বিএনপি। গতকাল বুধবার পর্যন্ত ২২টি রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক করেছে দলটি।

দলীয় সূত্র জানায়, জামায়াত ও সিপিবির সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করবে বিএনপি। জামায়াতের সাথে বৈঠকের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সিপিবির সঙ্গে বৈঠক করার বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও এখন পর্যন্ত কোনো জবাব পায়নি বিএনপি।

এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক সাবেক সংসদ সদস্য জহিরউদ্দিন স্বপন আমাদের সময়কে বলেন, এ পর্যন্ত যেসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমরা সংলাপ করেছি, তারা আগেই শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল। আমাদের সংলাপের মধ্য দিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার দাবিতেও (যুগপৎ বা বিএনপির নেতৃত্বে) রাজপথে থাকার বিষয়ে ২২টি রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছে। তিনি আরও বলেন, প্রথম ধাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর সঙ্গে বিএনপি খুব দ্রুতই আবার সংলাপে বসবে। রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে ‘কার্যকরী গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র প্রস্তুত’ করতে বা রাষ্ট্র মেরামতে কী কী সংস্কার প্রয়োজন সেই বিষয়ে একটি কর্মসূচি ঠিক করা হবে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির সঙ্গে সংলাপে সাংবিধানিক সংস্কারসহ ২১ দফা প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। জবাবদিহি ও ভারসাম্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়তে গণসংহতি আন্দোলন দিয়েছে সাত দফা প্রস্তাব। অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সংস্কারসহ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি উত্থাপন করেছে ৩১ দফা। রাজনৈতিক গুণগত পরিবর্তনের জন্য নির্বাচনে শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টনেই ভারসাম্য চায় নাগরিক ঐক্য। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সংবিধানের সংশোধনসহ ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে গণঅধিকার পরিষদ।

দলের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা আমাদের সময়কে বলেন, প্রথম দফা বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় দফা বৈঠকে আলোচনা হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দ্বিতীয় দফা বৈঠকে খালেদা জিয়ার ভিশন- ২০৩০ আলোচনার টেবিলে উপস্থাপন করা হবে। দুই পর্বের সংলাপ শেষে আলোচনার মাধ্যমে মাঠের কর্মসূচির ধরন ও কৌশল ঠিক করা হবে।

দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা আমাদের সময়কে বলেন, ভোলায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের গুলি এবং দুজন নেতা নিহত এবং শতাধিক নেতাকর্মী আহত হওয়ায় এই বিষয়টিকে আন্দোলনের আগে সরকারের দিক থেকে একটা বার্তা মনে করছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এই বাস্তবতা মেনেই আগামী দিনে আন্দোলনের পরিকল্পনা ঠিক করবে বিএনপি।

দায়িত্বশীল নেতারা জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পেলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলোর সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে বিএনপি। বিএনপির এই বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র মেরামতের কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, আন্দোলনে সফল হতে গেলে সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক দল ও জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ এবং কূটনৈতিক সফলতা থাকতে হয়। বিভিন্ন সময়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেতাদের বিশ্লেষণে বিষয়গুলো উঠে এসেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ধারাবাহিক বৈঠকেও একই ধরনের মতামত দিয়েছেন নেতারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, সেনা সমর্থিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের ওপর ভর করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারছে না। আমরা তা জনগণকে ফিরিয়ে দিতে চাই। এ জন্য প্রয়োজন নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। এই দাবি আদায় করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে রাজপথে আন্দোলন জোরদার করার কাজটি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি করছে। যেভাবে চারদিক থেকে সাড়া পাচ্ছি তাতে করে আমরা আশাবাদী।

যদিও দলীয় নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনে নামলে বিএনপিকে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। তা হচ্ছে শর্তসাপেক্ষে মুক্তিপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। গুলশানের ফিরোজায় থাকা অসুস্থ খালেদা জিয়া রাজনীতিতে দাবার গুটি হতে পারেন। নির্বাচন বা সরকার পতন আন্দোলনে নামার আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সরকারের দিক থেকে দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান আলোচনার প্রস্তাব আসতে পারে বলে মনে করেন তারা। তখন বিএনপি কী সিদ্ধান্ত নেয় সেটাও দেখার বিষয়।

দলীয় নেতাদের সূত্রে আরও জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে বিএনপি যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে- দলের এই ঘোষণার ওপর দলের নেতাকর্মীরা আস্থাও রাখতে পারছে না। দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে কোনো ‘ঐক্য’ নেই। একজন আরেকজনকে সরকারের লোক হিসেবে সন্দেহ করে। দলের তৃণমূলের নেতার্মীরা মনে করেন, দাবি পূরণ হোক বা না হোক এসব নেতাই আগামীতে বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ সব সন্দেহের কারণে কমিটি গঠন থেকে সর্বত্র দলে একজন আরেকজনকে সাইজ করার কাজে ব্যস্ত কিছু নেতা। এসব সন্দেহ দূর করতে হবে।

দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, আন্দোলনে সফল হতে গেলে ঢাকাকে প্রস্তুত করতে হবে। কিন্তু এখনো ঢাকা প্রস্তুত নয়। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের ছোট্ট পরিসর, যেখানে দুই-তিন হাজারের বেশি লোক ধরে না, তার মধ্যেই আটকে আছে দল। মহানগরের ওলি-গলিতে একটি মিছিল দূরে থাক, চা খেতেও একসাথে বসে না। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মাঝে বন্ধন নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা গুরুত্বপূর্ণ সড়কে মিছিলেরও চেষ্টা হয় না।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে দলের অভ্যন্তরীণ ত্রুটিগুলো জানানো হয়েছে। খুব দ্রুতই তিনি মহাসচিবের উপস্থিতিতে ভার্চুয়ালি বসবেন। সেখানে ঢাকা মহানগর বিএনপি ও অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের ডাকার কথা রয়েছে। এর মূল্য উদ্দেশ্য নেতাকর্মীদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি।

নির্র্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট নয়। ক্ষণে ক্ষণে বিশ্ব রাজনীতির পটপরিবর্র্তন হচ্ছে। দেশের স্বার্থে একসময়ের বন্ধু শত্রু হচ্ছে, শত্রু বন্ধু হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ করে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার দূতদের সঙ্গেও বিএনপি ভাবনা বিনিময় করছে।

advertisement