advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জীবনের পালাবদলে রবীন্দ্রনাথ

ড. সৌমিত্র শেখর
৬ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২২ ০১:১৮ এএম
advertisement

পালাবদল ছাড়া জীবন প্রবাহিত থাকে না। কিন্তু সেই পালাবদলে জীবন যদি গতি হারিয়ে ফেলে অথবা দিক থেকে বিচ্যুত হয় তা হলেই এর সমাপ্তি। এটি হতে দেওয়া উচিত নয়। রবীন্দ্রের জীবন থেকে এই পালাবদল আর প্রবাহের যে ইঙ্গিতটুকু পাওয়া যায় তা মানবজীবনে পাথেয় হতে পারে। বাংলা আর বাঙালির অতি আপনজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যে মানুষটি বাংলার রূপ-প্রকৃতিকে চমৎকারভাবে রূপায়ণ শুধু করেননি, বাঙালির চারিত্রিক বেশিষ্ট্যকেই সুন্দর করে তুলে ধরেছেন তার রচনায়। তিনি জন্মেছিলেন কলকাতার ইট-কাঠ-কংক্রিটের পরিম-লে। বাঙালির বাসও সে তুলনায় খুব বেশি ছিল না। প্রতিবেশীদের প্রায় সবাই ছিলেন অবাঙালি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পরিবার এমন এক পরিম-ল তৈরি করেছিল যার জন্য অন্য কিছু প্রয়োজন ছিল না। নিজের নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-বিজ্ঞান সবদিকের লোক ছিল। বাইরে এ কারণেই রবীন্দ্রনাথকে খুব বেশি যেতে হয়নি। বাংলার রূপকল্প তিনি পড়েছিলেন বইয়ে। সবুজ শ্যামল বাংলার প্রকৃতি তিনি চোখে কখনো দেখেননি। পিতার সঙ্গে হিমালয় গিয়েছিলেন, সেখানে ওত সবুজ নেই বললেই চলে। শান্তিনিকেতনে যে জমি কিনেছিল তার পিতা সেই জমি মূলত রুক্ষ মাটির দেশে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : বইপত্রে যে শ্যামল বাংলা তিনি পড়েছেন সেই সবুজে কাদায় মেশানো বাংলাকে তিনি দেখবেন বলে গেছেন শান্তিনিকেতনে। কলকাতা থেকে ট্রেনে শান্তিনিকেতন যেতে সন্ধ্যে হয়ে গেছে। ট্রেন থেকে নেওয়ার জন্য পালকি এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ভাবলেন চারদিকে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সবুজ ভালো দেখা যাবে না। তাই তিনি চোখ বন্ধ করে পালকিতে উঠে বসলেন আর ভাবলেন, পরদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে তিনি সবুজ দেখবেন এই স্নিগ্ধ মাটির স্পর্শ করবেন। করলেনও তাই। পরদিন ভোরে দৌড়ে গেলেন মাঠে চোখ খুললেন কিন্তু যা দেখলেন সেখানে একটু সবুজ নেই, একটুও স্নিগ্ধতা নেই, একটুও নেই আশার কোনো ছোঁয়া। রবীন্দ্রনাথের যে মাটি দেখলেন সেটি খুবই রুক্ষ, যে সবুজ গাছ দেখবেন বলে মনে মনে আশা ছিল, সেই গাছেও নেই একটু সবুজ আর মাটি ফেটে চৌচির হয়ে আছে, সেটি লালমাটি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, সেই মাটি তিনি দেখেছিলেন পূর্ববাংলায় শাহজাদপুর পতিসর আর শিলাইদহে এসে। পদ্মা নদী দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে বাংলাদেশে প্রবেশ করলেন সেই পদ্মা নদীর স্বচ্ছ জল এবং তার তীরবর্তী উর্বর ভূমি তার পর ধীরে ধীরে সবুজের বেষ্টনীতে চমৎকার অরণ্য এবং এর সাধারণ মানুষ রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল। এই মুগ্ধতার ছায়া পড়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী কাব্যগ্রন্থে। এ সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথের লেখার ধরন যায় পাল্টে, সেখানে আসে মাটি আর মানুষের যোগ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ধরা তলে দিন ঘরে যদি তার প্রেয়সী জন্মগ্রহণ করে তা হলে সেই প্রেয়সী কোভিদ জন্য খুব যত্ন করে তার আদর তুলে রাখবে আর একই সঙ্গে সব মনোযোগের আধার হয়ে উঠবে সেই প্রেয়সী। অথচ এর আগে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু মরণকে শ্যাম হিসেবে কল্পনা করে তার গলায় মালা দিতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে আসার পর রবীন্দ্রনাথের লেখার ধরন যায় পাল্টে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছিলেন, যে আছে মাটির কাছাকাছি সে কোভিদ বাণীর জন্য তিনি কান পেতে আছেন। এই কবি প্রতীকী হলেও এই কবি আসলে সাধারণ মানুষকেই প্রতিনিধিত্ব করেন। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য এবং চিন্তা মূলত একই জায়গা থেকে উৎসারিত। তিনি খুবই সাধারণ বা বায়বীয় সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেননি। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য মূলত তার দর্শন চিন্তার প্রতিফলন। রবীন্দ্রনাথের জীবনের পালাবদল হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলাদেশে আসেন অর্থাৎ পূর্ববঙ্গে তিনি একাধিকবার ঘুরে যান। বলা চলে রবীন্দ্রনাথের জীবন মূলত তিন ভাগে বিভক্ত। এর প্রথম অংশে থাকবে রবীন্দ্রনাথের কলকাতাকেন্দ্রিক জীবন; এর পর থাকবে রবীন্দ্রনাথের পূর্ববঙ্গকেন্দ্রিক জীবন; আর শেষে থাকবে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনকেন্দ্রিক জীবন। প্রতিটি পর্বেই রবীন্দ্রনাথ যেন নতুন করে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। তবে বাংলাদেশকেন্দ্রিক বা পূর্ববাংলাকেন্দ্রিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে মানুষের কাছাকাছি এসেছিলেন ঠিক সেভাবে আর কোনো পর্বে মানুষের এত কাছাকাছি আসতে রবীন্দ্রনাথকে দেখা যাবে না। গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ১৯১৩ সালে। এই গীতাঞ্জলির মধ্যে একাধিক রকমের লেখা রয়েছে এবং এর অনেকগুলোই পূর্ববাংলায় বসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন। গীতাঞ্জলির গানগুলোর মধ্যে ঐশ্বরিক চিন্তা যেমন প্রকাশ পেয়েছে, আধ্যাত্মিক ভাবনা যেভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে, ইহজাগতিক জীবন জিজ্ঞাসাও কিন্তু সেখানে কম প্রকাশ পায়নি। পূর্ববাংলার মাটি আর নদীর জলে ভেসে ভেসে রবীন্দ্রনাথ এখানে এমন কিছু গান রচনা করেছেন যে গানে মূলত আধ্যাত্মিকতার মধ্য দিয়ে জীবন জিজ্ঞাসা প্রকাশমান। ঠিক এখানেই রবীন্দ্রনাথের লেখার বা রচনা চরিত্রের পালাবদল দেখা যায়। বলা চলে এখানে রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জন্মটি যেমন ছিল তার ঠাকুরবাড়িতে এবং সেখানে তিনি মূলত উপনিষদের আলোকে জীবনকে সাজিয়েছিলেন, লেখার ধরনকে তৈরি করেছিলেন, দ্বিতীয় জন্মের ঠিক তেমনটি নয়। এখানে এসে তিনি লালন সাঁইয়ের দর্শনের খোঁজ পেলেন, গগন হরকরার গানে আর গান পরিবেশনার ছন্দে এক নতুন জীবন অনুসন্ধান করেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, পূর্ববাংলার মাটি, মানুষ আর প্রকৃতি তার জীবনবোধকেই দিয়েছে পাল্টে। আগে যে জীবনে তিনি অধ্যাত্মবোধের নিরিখে এসব কিছু বিবেচনা করতেন, পরে বাস্তবতার নিরিখে তিনি জীবনের পর্বগুলো দেখার পাঠ নিয়েছিলেন। এরই মধ্যে অবশ্য জাতীয়ভাবে রাজনীতিতে বেশ পালাবদলের ঢেউ ওঠে। এ সময় রবীন্দ্রনাথ দেশাত্মবোধক বেশকিছু গান আর কবিতা লেখেন, যে গান আর কবিতাগুলোর পেছনে থাকে মূলত পূর্ববাংলার প্রতিচ্ছবি। যে তোমায় ছাড়ে ছাড়–ক আমি তোমায় ছাড়ব না মা অথবা গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ অথবা আজ বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি... এই যে গানগুলো, এসব গানের উৎস মূলত পূর্ববঙ্গ। পূর্ববঙ্গ রবীন্দ্রনাথের মানসপটে বড় রকমের ছায়া ফেললেও তিনি মূলত অখ- বঙ্গেই বিশ্বাসী ছিলেন। বাংলার খ-িত রূপ তিনি প্রত্যাশা করেননি এবং বাঙালির বিভক্তি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই যখনই বাংলা ভাগের কথা এসেছে বা বাঙালিদের দ্বিখ-িতরূপে অবস্থানের প্রশ্ন এসেছে তখনই তিনি সেখান থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেছেন। তাই বলা চলে রবীন্দ্রনাথের বাংলা মূলত বাঙালির অখ- পরিচয়। রবীন্দ্রনাথের জীবনে অবশ্য একটি পর্যায়ে দর্শনতাত্ত্বিকতা বেশ বড় হয়ে দেখা দেয়। তিনি পাশ্চাত্য দর্শন দিয়ে অনেকটাই তাড়িত হন। কিন্তু সেটা সাময়িক। এর পর রবীন্দ্রনাথ কিন্তু আরেক জীবন নিয়ে সিদ্ধপুরুষ হয়ে শান্তিনিকেতনে অবস্থান করেন। এ সময় তিনি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় চিরায়ত দর্শন আর আত্মার অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব নিয়ে ভাবিত। যে কারণে তিনি জীবনের প্রান্তিকে এসে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন এবং পরমসত্তাকে সম্বোধন করতে পারেন ছলনাময়ী বলে। এ এক বিরাট সাহস। জীবনের শেষ লগ্নে মানুষ যখন সমর্পণ করতে চায় নিজেকে এবং সবকিছুই মেনে নেয় বিনা প্রশ্নে, রবীন্দ্রনাথ তখন বরং অনেক বেশি প্রশ্ন করেছেন এবং শুধু প্রশ্নই নয় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাই তিনি উচ্চারণ করেন, হে পরমসত্তা তুমি তোমার পথকে বিচিত্র ছলনাজালে রুদ্ধ করে রেখেছো আর তাই তুমি ছলনাময়ী। এর পর রবীন্দ্রনাথ আর বেশি লেখা লিখতে পারেননি, তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে-আগে এই লেখাগুলোতে রবীন্দ্রনাথ যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তা মূলত তার চলমান পালাবদলকেই মূর্ত করে। রবীন্দ্রনাথ মূলত সব ধরনের সংকটকে অতিক্রম করে জীবনের চলমানতার কথা বলেছেন, বলেছেন জীবনের ইতিবাচক পালাবদলের কথা। সে পথ অনুসরণে জীবনে সতত আনন্দ নিশ্চয়।

advertisement

অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

advertisement