advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি অভিঘাতে মানুষ দিশাহারা

সৈয়দ ফারুক হোসেন
৬ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২২ ০১:১৮ এএম
advertisement

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির শিকার প্রধানত শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবীসহ নির্দিষ্ট আয়ের কর্মচারী। মেহনতি মানুষের মজুরি বাড়ে না, কৃষক ফসলের যুক্তিসঙ্গত দাম পান না, কর্মচারীদের বেতন দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অনেক ক্ষেত্রে বাড়ে না, কিন্তু জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগতই বাড়ছে। সব মিলিয়ে মধ্যম ও নিম্নআয়ের মানুষ এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে অনেকে জীবনযাত্রার মান কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি অনেকে বাড়তি খাবার কেনাও কমিয়ে দিয়েছেন। মধ্যবিত্ত জীবনের কী যে কষ্ট তা শুধু মধ্যবিত্তরাই জানে। লাগামহীন ঘোড়ার মতো ছুটে চলা নিত্যপণ্যের দামে দিশাহারা সাধারণ ভোক্তারা। মধ্যবিত্তের পকেট কুলাতে পারছে না বাজারখরচ। অপরদিকে সামান্য ডাল-ভাত খেতেও বেগ পেতে হচ্ছে খেটেখাওয়া মানুষদের। সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন দরিদ্ররা। মানুষ বাধ্য হয়ে খাবার কম খাচ্ছে। একে একে বেড়ে চলেছে সব জিনিসপত্রের দাম। মানুষ এখন অর্থনৈতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বেশিরভাগ কর্মজীবীর আয়ও কমেছে। ফলে এমন অবস্থায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রায় সব মানুষেরই নাভিশ্বাস উঠেছে জীবন চালাতে।

advertisement

একটি পরিবার কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে নির্বাহ করবে তা নির্ভর করে তাদের আয়, চাহিদা এবং দ্রব্যমূল্যের ওপর। প্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন সহজ হয়। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যখন সাধারণ মানুষের আর্থিক সঙ্গতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়, তখন দরিদ্র, অতিদরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত পরিবারে সংসারে শুরু হয় টানাপড়েন। তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের জনজীবনে নেমে আসে কষ্টের কালো ছায়া। বাজারে নিম্নআয়ের মানুষগুলোরও করুণ দশা। তারা এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছোটাছুটি করেও একটু কম দামে পণ্য কিনতে পারছেন না। চালের বাজার দীর্ঘদিন ধরে চড়া। ডালের দামও বেড়েছে। সামান্য ডিমের দামটাও লাফিয়ে বাড়ছে। অনেকেই আবার কুলাতে না পেরে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনছে। অর্থাৎ ভাত, আলু কিংবা ডালের পরিমাণ ঠিক রেখে মাছ, মাংস কম খাচ্ছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যে লাগামহীন বৃদ্ধি বর্তমান যুগে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের পথে সম্মুখীন হওয়া সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে শিল্পমালিকরা ধরাশায়ী হচ্ছেন। অনেকেই ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধ করতে পারছেন না। আবার সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট তো রয়েছেই। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকার প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ছেই। এ পরিস্থিতিতে দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না দরিদ্র, সমস্যাগ্রস্ত, নিম্নআয় ও সীমিত আয়ের মানুষ। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে দেশের সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সংকট এখনো দৃশ্যমান। এখন থেকেই খাদ্য সমন্বয় করতে না পারলে পরে ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। একদিকে ছিল করোনা ভাইরাস, অন্যদিকে ইউরোপে যুদ্ধের দামামা। এ কারণেই দ্বিমুখী সংকটে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ববাণিজ্য। যুদ্ধ কেবল ইউক্রেনের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সবখানে। এতে করে বৈশ্বিক অর্থনীতি পড়েছে ভয়াবহ সংকটে। করোনার অভিঘাতে গত দুই বছর কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। লকডাউনে বন্ধ থাকা কলকারখানাগুলো এখনো পুরোদমে চালু করা যায়নি। এজন্য খাদ্যগুদাম থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য রিলিজ দেওয়ার পাশাপাশি মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। আমরা অত্যন্ত সংকটাপন্ন সময় অতিবাহিত করছি। বৈশ্বিক অর্থনীতি দোদুল্যমান পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমাজে মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয় এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে। সব সময় মনে রাখা দরকার যে, মানুষের আয়ের উৎস তথা উপার্জনের মাত্রা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সব সময় বাড়ে না এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সীমিত থাকে। সে কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য লাগামহীনভাবে বাড়লে সেগুলো দ্রুতই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সার্বিক মানে বিশেষ অবনতি দেখা যেতে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে মানুষের জীবনে নেমে আসতে পারে অনাহার, অপুষ্টি, ইত্যাদি নানা প্রকার জটিল ব্যাধির প্রকোপ। ফলে সার্বিকভাবে এর প্রভাব পড়ে কোনো একটি দেশের জাতীয় ভাবমূর্তিতে। খাদ্যভা-ার হিসেবে পরিচিত ইউক্রেন ও রাশিয়ার সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অনেক উন্নত দেশেও দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জানিয়ে দেশবাসীকে মিতব্যয়ী ও সঞ্চয়মুখী হওয়ার আহ্বানও রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের এক ইঞ্চি আবাদি জমিও ফেলে না রেখে কিছু না কিছু পণ্য উৎপাদন করা হলে সংকট মোকাবিলা সম্ভব হবে বলেও মনে করছেন তিনি। বৈশ্বিক দুর্ভিক্ষ নিয়ে সতর্কতা জরুরি।

গত দুই বছরে বিশ্বে নতুন করে দুই কোটি মানুষ খাদ্য সংকটে পড়েছে। করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার কারণে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক সংকট, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও যুদ্ধ-সংঘাতের কারণে এই বিপুল পরিমাণ মানুষের তিনবেলা ন্যূনতম খাবারও জুটছে না। বিশ্বের যে ৫৫-৬০টি দেশে খাদ্য সংকটে পড়া মানুষের বাস। বৈশ্বিক দুর্ভিক্ষ নিয়ে সতর্কতা জরুরি। বিশ্বব্যাপী করোনার প্রাদুর্ভাব কতদিন চলবে সে সম্পর্কে এই মুহূর্তে সঠিক উত্তর কারও জানা না থাকায় নিজ নিজ দেশের জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার সরবরাহের তাগিদে খাদ্যপণ্য রপ্তানি সীমিত অথবা বন্ধ করে দিয়েছে রপ্তানিকারক অনেক দেশ। ফলে খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলো খাদ্যপণ্যের সংকটে পড়েছিল। এ অবস্থায় বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।

ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে যুদ্ধের প্রভাব সারাবিশ্বেই পড়ছে। খাদ্য এবং জ্বালানির ঘাটতি আর অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছেন বিশ্বের অন্তত ১৭০ কোটি মানুষ, যাদের এক-তৃতীয়াংশই এখন দারিদ্র্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশ্বের অনেক দেশের আমদানি করা খাদ্যশস্যের কমবেশি ৫০ শতাংশ আসে ইউক্রেন থেকে। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব ধনী দেশগুলোতেও পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির দেশ অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। শ্রীলংকা, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণ বিক্ষোভ করেছে। আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশ চরম অর্থনৈতিক দুর্দশার মধ্যে পড়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বজুড়ে ২৩০ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হতে পারে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জের ধরে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাসসহ দাম বেড়েছে নিত্যপণ্যের। সেই সঙ্গে পরিবহণব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়েছে, ভেঙে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা। এটা এখন পরিষ্কার যে, একদিকে করোনাভাইরাস অন্যদিকে যুদ্ধের আবহে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে দেখা দিয়েছে মারাত্মক অব্যবস্থাপনা। এতে করে কমেছে বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধি, বেড়েছে মুদ্রাস্ফীতির হার। মূলত বিশ্বের দুই বড় খাদ্য রপ্তানিকারী দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন তাদের রপ্তানি বন্ধ রাখায় আফ্রিকার ৩৫টি দেশে ভয়াবহ খাদ্য সংকট সৃষ্টি হতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জের ধরে বিশ্বজুড়ে দেখা দিচ্ছে অর্থনৈতিক মন্দা। দেশে দেশে দেখা দিচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি, কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পরিস্থিতি সামলাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যয় সংকোচন নীতি নেওয়া হচ্ছে আমদানি পণ্যেও আরোপ হয়েছে নানা বিধিনিষেধ? দেশের মানুষের কথা ভেবে রপ্তানি বন্ধেরও পদক্ষেপ নিয়েছে কিছু দেশ। এর বাইরে নয় বাংলাদেশও। ফলে চলমান সংকট নিরসনে ‘কৃচ্ছ্রসাধন’ বা ‘ব্যয় সংকোচন’ নীতিকেই বেছে নিতে হয়েছে সরকারকে। গত এক যুগে বিদ্যুৎ খাতে নানা পদক্ষেপের পর বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও বাধ্য হয়ে লোডশেডিংয়ের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। সরকারের এমন ‘অজনপ্রিয়’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনেও রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এ বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। নির্দেশ দিয়েছেন সূচি করে লোডশেডিং দিতে। আমাদের হিসাব করে চলতে হবে। আমাদের যা কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, বিলাসপণ্য আমদানি কমানো হচ্ছে, বিদেশ ভ্রমণ কমানো হয়েছে, অপচয় রোধ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- এজন্যই আমাদের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কম আছে। বিশ্বায়নের এ যুগে বাংলাদেশও আর বিচ্ছিন্ন নয়। সংগত কারণেই বাংলাদেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। করোনা সংকট মোকাবিলায় যেখানে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ হিমশিম খেয়েছে সেখানে শেখ হাসিনা সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করোনা সংকট মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন।

সৈয়দ ফারুক হোসেন : রেজিস্ট্রার, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, জামালপুর

advertisement