advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

দিনভর ভুগিয়ে রাতে বাড়ল বাসভাড়া

তাওহীদুল ইসলাম
৭ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৭ আগস্ট ২০২২ ০৮:৪৮ এএম
শুক্রবার রাত থেকে বেড়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। প্রতিবাদে সড়কে নেমে গাড়ি চলাচলে বাধার সৃষ্টি করেন শ্রমিকরা। গতকাল সকাল ৮টায় চট্টগ্রামের টাইগারপাসে -এস এম তামান্না
advertisement

এ দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানেই পরের দিন সড়কে গণপরিবহন থাকবে না; মানুষ গাড়ির অপেক্ষায় মোড়ে মোড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকবে; রাইড শেয়ারিং কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ১০০ টাকার ভাড়া হয়ে যাবে ২০০; পেট্রলপাম্পগুলোতে তেল মিলবে না; মানুষ হট্টগোল করবে; এর মধ্যে আবার পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা ভাড়া বাড়ানোর জন্য গোঁ-ধরে বসে থাকবেন; আর সরকার যেটা করবে, তারা দিনভর জনগণকে ভুগিয়ে শেষমেশ জনগণেরই পকেট কেটে ভাড়া বাড়ানোর দাবি মেনে নেবে।

এবারও ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে গতকাল দেশের প্রায় সব সড়কেই চলে নৈরাজ্য। অনেক রুটে বাস বন্ধ হয়ে যায়। যেসব গাড়ি চলে, সেগুলো ভাড়া আদায় হয় দুই থেকে তিনগুণ। পরিবহন মালিকদের যুক্তি, সরকার নতুন ভাড়া নির্ধারণ না করায় তারা গাড়ি বন্ধ রেখেছেন। ভাড়া নির্ধারণের আগে গাড়ি চালালে চালক-হেলপারদের সঙ্গে যাত্রীদের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে বলেও যুক্তি দেখান তারা।
গত শুক্রবার রাতে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসে। ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪, অকটেনে ৪৬ আর পেট্রলের দাম লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ানো হয়। সরকারের এ সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয় শুক্রবার রাত ১২টা থেকে। এখন এক লিটার ডিজেল ও কেরোসিন কিনতে ১১৪ টাকা লাগছে। এক লিটার অকটেনে লাগছে ১৩৫ টাকা। আর প্রতি লিটার পেট্রলের দাম রাখা হচ্ছে ১৩০ টাকা। দেশের ইতিহাসে কখনোই জ্বালানি তেলের দাম এক দফায় এতটা বাড়ানো হয়নি।

advertisement

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার পর শনিবার ভোর থেকেই রাজধানীতে কমতে শুরু করে বাসের সংখ্যা। এতে বড় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। কেবল ঢাকা নয়, সারাদেশে যান চলাচল কমে যায়। পরিবহন কর্মীদের দাবি, জ্বালানির অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক বাস মালিক গাড়ি বের করেননি। নতুন ভাড়া নির্ধারণের আগে তারা বাস নামাতে রাজি নন।

যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও তারা বাস পাচ্ছেন না। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল বা রিকশায় উঠতে গেলে গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া। সকাল থেকে রাজধানীর বনশ্রী, রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা, মগবাজার ও মিরপুর এলাকা ঘুরে বাস সংকটের এ চিত্র দেখা যায়। অন্যান্য অঞ্চলেও বাস সংকট বলে খবর পাওয়া গেছে।

রামপুরা জোনের দায়িত্বে থাকা সার্জেন্ট এনামুল হক শিপন বলেন, ‘সকাল থেকে অনেক যাত্রী অপেক্ষা করেও বাস পাচ্ছেন না। বেশ কয়েকটি কোম্পানির বাস দেখা যাচ্ছে না। আবার কিছু কোম্পানির বাস চলছে, তবে সংখ্যায় কম।’
সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা হঠাৎ দিলেও বিষয়টি আগেই জানতেন বাসমালিকরা। এ কারণে কৌশলী ভূমিকা নিয়েছেন তারা। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করতে দেখা যায় বাসের চালক ও সহকারীদের। মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেল স্বনামধন্য পরিবহনগুলোর টিকিট কাউন্টার খোলা, তবে বন্ধ রয়েছে অনেক পরিবহনের কাউন্টার।
গতকাল সকালে কিশোরগঞ্জগামী অনন্যা পরিবহনের কাউন্টারের দায়িত্বরত মো. শামীম বলেন, ‘আমাদের বাস চলেছে। মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে সমিতির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।’

মহাখালী টার্মিনালের বাইরে ময়মনসিংহগামী স্বাধীন পরিবহনের একটি বাসের সহকারীর সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ান সুমন নামের এক যুবক। তিনি বলেন, ‘আমি মুক্তাগাছা যাব। অন্য সময় ২২০ থেকে ২৫০ টাকায় যাই। আজ ওরা ৩৫০ টাকা চাইছে ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে। সরকার তো এখনো বাসের ভাড়া বাড়ায়নি। তাহলে তারা কেন বাড়তি ভাড়া আদায় করছে’ তবে পরিবহন নেতারা বলেন, জ্বালানির দাম বাড়বে এটা তারা জানতেন।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘মাসখানেক আগে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে একটা বৈঠক করেছিলাম আমরা। তখন এ বিষয়টা নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল।’

এদিকে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি। এক বিবৃতিতে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সরকার গত নভেম্বর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম এক লাফে ১৫ টাকা বাড়িয়েছে। দাম বাড়ানোর পর বাস ভাড়া বাড়ানো হয় প্রায় ২৭ শতাংশ, লঞ্চ ভাড়া বাড়ানো হয় ৩৫ শতাংশ, যা তেলের দাম বাড়ানো হারের চেয়ে অনেক বেশি।’

এদিকে আমাদের সময়ের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, নগরীতে বাস, হিউম্যান হলারসহ গণপরিবহন বন্ধ থাকায় নৈরাজ্যের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। দূরপাল্লার বাস চলাচলও ছিল অনেকটা কম। অভিযোগ পাওয়া গেছে, জেলাপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে পরিবহন শ্রমিকদের বাধার মুখে দূরপাল্লার বাস চলাচল বিঘ্নিত হয়।

চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন বলেন, আমরা সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় গাড়ি চালাচ্ছি। দূরপাল্লার গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক আছে। নোটিশ না দিয়ে হঠাৎ করে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা আমজাদ হোসেন হাজারী আমাদের সময়কে বলেন, ‘অতীতেও আমরা দেখেছি জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও বাড়তি ভাড়া দিতে চান না যাত্রীরা। উল্টো চালক ও হেলপারকে মারধর করেন। তাই আমরা বলেছি, কর্তৃপক্ষ নতুন ভাড়া নির্ধারণ করে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা গাড়ি বের করব না।’

রংপুর ব্যুরো জানায়, নতুন ভাড়া নির্ধারণের আগেই গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকা কোচ স্ট্যান্ড, রংপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, মেডিক্যাল মোড়, মডার্ন মোড়, পার্কের মোড়, মাহিগঞ্জ সাতমাথা ও কুড়িগ্রাম বাসস্ট্যান্ডসহ অস্থায়ী বিভিন্ন স্ট্যান্ডে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে দূরপাল্লার গণপরিবহনে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। দূরপাল্লার এসি ও নন-এসি বাসে সিট প্রতি বাড়তি নেওয়া হচ্ছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা।

গত শুক্রবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ করে দেওয়া হয় রংপুরের পেট্রলপাম্পগুলো। এর ফলে তেল কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন গ্রাহকরা। একপর্যায় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি জানান, কেরোসিনের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার ও তাদের সন্তানদের লেখাপড়া বিঘ্নিত হতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক (সাতক্ষীরা) জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পণ্যপরিবহনে প্রভাব পড়েছে ভোমরা স্থলবন্দরে। অন্যদিকে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ রুটের বাস বেশি আদায় করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভোমরা স্থলবন্দর সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ ট্রাক বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। এ ছাড়া ঢাকা, বগুড়া ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য নিয়ে কিছু ট্রাক ভোমরা স্থলবন্দরে আসে। তবে শুক্রবার রাতে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় দুপুর পর্যন্ত কোনো ট্রাক ভোমরা স্থলবন্দরে আসেনি। একইভাবে কোনো ট্রাক পণ্য নিয়ে ভোমরা স্থলবন্দর ছেড়ে যায়নি। দুপুরের পরে কিছু ট্রাক বাড়তি ভাড়ায় চলাচল শুরু করে।

ভোমরা স্থলবন্দর ট্রান্সপোর্ট সমবায় সমিতির সভাপতি ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘আগের ভাড়ার সঙ্গে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা যোগ করে ট্রাকের ভাড়া নেয়া হচ্ছে।’

নিজজস্ব প্রতিবেদক (কক্সবাজার) জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর খবরে গত শুক্রবার রাতেই কক্সবাজারের পেট্রলপাম্পগুলোতে ভিড় করেন মোটরসাইকেল চালকরা। বাড়তি লাভের আশায় অনেক পাম্প কর্তৃপক্ষ সন্ধ্যার পর থেকে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ করে দেয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, উপজেলার পেট্রলপাম্পগুলোতে হঠাৎ তেল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় ফিলিং স্টেশনগুলোয় ক্রেতাদের হট্টগোল সৃষ্টি হয়। ক্রেতারা বলছেন, গতকাল সকালে কোনো পাম্পেই তেল বিক্রি হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিয়াজ উদ্দিন জানান, পুলিশ সঙ্গে নিয়ে পাম্পগুলো পরিদর্শন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে।

রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভাড়া জটিলতায় সড়কে কমেছে দূরপাল্লা ও স্থানীয় গণপরিবহনের চলাচল। আবার যেসব বাস চলেছে, সেগুলোতেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমএম পরিবহনের ম্যানেজার আলম বলেন, তাদের বাসের ভাড়া আগে ৩০০ টাকা ছিল। সেটা বাড়িয়ে সাড়ে তিনশ টাকা করা হয়েছে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, গোয়ালন্দ উপজেলায় গতকাল সকাল থেকে তেমন গাড়ি চলাচল দেখা যায়নি। দৌলতদিয়া-কুষ্টিয়া, দৌলতদিয়া-ফরিদপুর সড়কে লোকাল বাসও নেই। ফলে যাত্রীরা বিপাকে পড়েন। মাঝে মধ্যে দু-একটি বাস এলেও চড়তে হচ্ছে গাদাগাদি করে। ভাড়াও কয়েকগুণ বেশি।

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি : তেলের দোকানগুলোতে শুক্রবার রাতেই হুমড়ি খেয়ে পড়েন ক্রেতারা। বাড়তি দামেও জ্বালানি তেল মিলছে না কোথাও কোথাও।
কালনা বাজারের তেল বিক্রেতা মহসীন মোল্লা বলেন, ‘পেট্রলের দাম ৮৬ থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা বাড়ার খবর প্রথমে জানতে পারেনি। সকালে দোকান খুলতেই দুই ব্যারেল তেল আগের দামেই বিক্রি হয়ে গেছে। এখন আমার দোকানে তেল নেই।’ একই অবস্থা অন্যসব দোকানেও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার খবরে অনেক বিক্রেতা দোকানের তেল সরিয়ে ফেলেছেন। আরও বেশি দামে বিক্রির আশায় তেল মজুদ রেখেছেন তারা।

advertisement