advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সরকারের বোঝা মানুষের ঘাড়ে

লুৎফর রহমান কাকন
৭ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৭ আগস্ট ২০২২ ১২:৪৮ এএম
প্রতীকি ছবি
advertisement

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ‘নজিরবিহীন’ দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অনেকে দেখছেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ¦ালানি তেলের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিতে দেশের অর্থনীতি মন্থর হয়ে যেতে পারে। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুলনীতি ও দুর্নীতির দায়ভার মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব সমালোচনার জবাবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে- জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দাম না বাড়িয়ে তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। সরকারের এ যুক্তির বিরোধিতা করে অনেকেই বলছেন, অভ্যন্তরীণ টাকার সংস্থান, আইএমএফের শর্তপূরণ এবং ভর্তুকির বোঝা কমিয়ে আনতেই জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বলা হচ্ছে- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে সরকার ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। আইএমএফের ঋণের শর্তের মধ্যে অন্যতম হলো- জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার। সরকার এবার যে পরিমাণ দাম বাড়িয়েছে তাতে জ্বালানি তেল বিক্রির সব ভর্তুকি তুলে নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে- আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বেশি। ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান বেশি হচ্ছে। এ ছাড়া দাম কম হওয়ায় আশপাশের দেশে পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব কারণে বিপিসি জ¦ালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে।

advertisement

গত শুক্রবার রাতে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর যে ঘোষণা আসে, তাতে ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪ টাকা, অকটেনের দাম লিটারে ৪৬ টাকা আর পেট্রলের দাম লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ানো হয়।

এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, গত বছরের নভেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। ওই সময় ডিজেল ও কেরোসিন লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছিল ৮০ টাকা। তার আগে এই দুই ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ছিল লিটারে ৬৫ টাকা। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা থাকলেও অকটেন ও পেট্রলের দাম বাড়ায়নি সরকার। এর পর ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরুতে করোনার প্রকোপ কিছুটা কমায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়।

জ্বালানি বিভাগের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে, এ বছর ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ধারাবাহিকভাবে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকে। গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ছিল ৮৩ দশমিক ৩৫ মার্কিন ডলার। গত জুলাই মাসে যা ছিল ১৩৯ দশমিক ৪৩ মার্কিন ডলার। আর একই সময়ে অকটেনের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৮৫ দশমিক ২৫ মার্কিন ডলার, গত জুলাইয়ে যা ছিল ১১৪ দশমিক ৯৬ মার্কিন ডলার। তবে গত মে ও জুন মাসের তুলনায় এ দাম কিছুটা কম।

মন্ত্রণালয় বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল প্রতি ব্যারেল ৭৪ দশমিক শূন্য ৪ ও অকটেন ৮৪ দশমিক ৮৪ মার্কিন ডলারে নেমে এলে ডিজেল ও অকটেন প্রতি লিটার যথাক্রমে ৮০ ও ৮৯ টাকায় বিক্রি সম্ভব হতো, যা এখন প্রায় অসম্ভব। গত জুলাইয়ে ডিজেল ও অকটেনে বিপিসি প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এর আগের দুই মাসে লোকসানের পরিমাণ ছিল শত কোটি টাকা। এ বছর ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিপিসি লোকসান দিয়েছে ৮ হাজার ১৪ কোটি টাকারও বেশি। এখন প্রতি লিটার ডিজেল ১১৪ টাকায় বিক্রি হলেও বিপিসিকে ৮ দশমিক ১৩ টাকা করে প্রতি লিটারে লোকসান গুনতে হবে। কারণ হিসাবে বলা হয়, গত মাসের গড় হিসাবে প্রতি লিটার ডিজেলে ১২২ দশমিক ১৩ টাকা খরচ পড়বে।

একই সঙ্গে তেলের দাম বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক অনেক বেশি। গত মাসের তথ্য অনুযায়ী ভারতের কলকাতায় ডিজেল প্রতি লিটার ৯২ দশমিক ৭৬ রুপিতে (১১৮.০৯ টাকা) বিক্রি হয়। ওই সময়ের হিসাবে কলকাতার প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩৪ টাকা বেশি। এ পার্থক্যের কারণে জ্বালানি পণ্য পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই মূল্য সমন্বয়ে পাশ^বর্তী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি পণ্যের মূল্যের পার্থক্যজনিত পাচার রোধ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শাসমুল আলম বলেন, ‘বিইআরসিকে দাম বাড়ানোর দায়িত্ব না দিয়ে জ¦ালানি বিভাগ নিজেরা দাম বাড়াচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের জ¦ালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটা পুরোপুরি অবৈধ। তিনি বলেন, দাম বৃদ্ধির পক্ষে সরকার যেসব যুক্তি দেখাচ্ছে, সেগুলো আসলে সঠিক কোনো যুক্তি নয়। বরং ভুলনীতি এবং দুর্নীতির কারণেই আজ জনগণের কাঁধে সব দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

এদিকে মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে। এ ছাড়া ডলারের বিনিময় হারের প্রভাবেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যদি জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ানো না হতো, তবে আগস্টের পর জ¦ালানি তেল আমদানি ও সরবরাহ অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ত।

এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া আমাদের আর কিছু করার ছিল না। বিশ^বাজারের প্রেক্ষাপটে আমরা বাড়তি কিছু করিনি। আর বিশ্ববাজারে যদি দাম কমে আসে, তা হলে আমরা দাম আবার সমন্বয় করব।’ তিনি বলেন, ‘জ¦ালানি তেলের যে দাম বৃদ্ধি, সেটা সাময়িক। দেশবাসীকে ধৈর্য ধরতেই হবে। জ্বালানি তেলের নতুন দাম সমাজের সবার কাছে সহনীয় হবে না। অর্থনীতির স্বার্থেই সরকারের কাছে মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া উপায় ছিল না।’

এদিকে জ¦ালানি মন্ত্রণালয় থেকে তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বাস, লঞ্চ ভাড়া বৃদ্ধির একটি ধারণা তৈরি করে গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। তাতে দেখা যায়, রেকর্ড হারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর প্রতি কিলোমিটারে বাসভাড়া সর্বোচ্চ ২৯ পয়সা আর লঞ্চে ৪২ পয়সা বাড়তে পারে। বর্তমানে দূরপাল্লার বাসে (৫২ আসনের) প্রতি কিলোমিটারে প্রত্যেক যাত্রীর ভাড়া ১ টাকা ৮০ পয়সা। ডিজেলে দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়ানোয় প্রতি কিলোমিটারে ২৯ পয়সা বেড়ে এই ভাড়া হবে ২ টাকার মতো। প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ছে ১৬ দশমিক ২২ শতাংশ। বর্তমানে সিটি এলাকায় (৫২ আসনের) বাসে প্রতি কিলোমিটারের প্রত্যেক যাত্রীর ভাড়া ২ টাকা ১৫ পয়সা। প্রতি কিলোমিটারে ২৮ পয়সা বেড়ে এই ভাড়া হবে ২ টাকা ৪৩ পয়সার মতো। প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ছে ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। এ ছাড়া লঞ্চে বর্তমানে প্রতি কিলোমিটারে প্রত্যেক যাত্রীর ভাড়া ২ টাকা ১৯ পয়সা। প্রতি কিলোমিটারে ৪২ পয়সা বেড়ে এই ভাড়া হবে ২ টাকা ৬২ পয়সা। সে হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়বে ১৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এর আগে ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর দেশে দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসের ভাড়া গড়ে ২৭ শতাংশ বাড়িয়েছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভাড়া নির্ধারণী কমিটি। একইভাবে মহানগর এলাকার বাসভাড়া ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই দিন সব লঞ্চের ভাড়া ৩৫ শতাংশ বাড়িয়েছিল অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। সে হিসাবে কিলোমিটার প্রতি ৬০ পয়সা করে ভাড়া বেড়েছিল। বিশ^বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ওই সময় ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার।

এদিকে একাধিক রাজনৈতিক দল বর্ধিত তেলের দাম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তারা বলছে, সরকারের সিদ্ধান্ত ‘অযৌক্তিক’। যাত্রীকল্যাণ সমিতি মনে করে, এই সিদ্ধান্ত গণবিরোধী।

 

 

advertisement