advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধীশক্তিসম্পন্ন ফজিলাতুন নেছা ও একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়

সুমনা গুপ্তা
৮ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৮ আগস্ট ২০২২ ০২:৪৬ এএম
advertisement

‘আমি ভালোবাসি মানুষকে, তুমি ভালোবাসো আমাকে, আমাদের দুজনের সব ভালোবাসা আজ এসো বিলিয়ে দিই এই দেশটাকে।’ শিল্পী ভুপেন হাজারিকার এই গানটির বাণী শুনলে বাঙালির মানসপটে যে নাম দুটি সমুজ্জ্বল হয়ে জেগে ওঠে তারা হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার স্ত্রী, মহীয়সী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। যিনি অসামান্য দৃঢ়তা, আত্মপ্রত্যয়, সাহস এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের দ্বারা একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বাঙালির মনোমন্দিরে আজও অনন্য উজ্জ্বল, তিনি আর কেউ নন, আমাদের জাতির পিতার সহধর্মিণী, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। খুব সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত লোকদৃষ্টিতে একজন সাধারণ রমণী যে কতটা অসামান্য ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে পারেন তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত আমাদের বঙ্গমাতা। মাতা, জায়া বা পত্নীর পরিচয়ের বাইরে তিনি ছিলেন জাতির পিতার স্বপ্নের সারথি। একটি স্বাধীন জাতি প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখতেন তার সমান অংশীদার ছিলেন বঙ্গমাতা।

advertisement

খোকা থেকে শেখ মুজিব। শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু। আবার বঙ্গবন্ধু থেকে আমরা পেয়েছি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে। এর পেছনে সলতের মতো জ্বলে জ্বলে আজীবন স্বামীকে সাহস জুগিয়েছেন ফজিলাতুন নেছা মুজিব, দিয়েছেন অনুপ্রেরণা ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শও।

advertisement 4

বঙ্গমাতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসের উৎস এবং তার সমর্থন ও সহায়তা ছিল বলেই বঙ্গবন্ধু তার গোটা জীবন দেশের কল্যাণে উৎসর্গ করতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ, সাহস, অনুপ্রেরণা এবং সব কাজে সহযোগিতা দিয়ে গেছেন। যা অনস্বীকার্য। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অনন্য ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সুগভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী এই নারী আওয়ামী লীগকে তার ক্রান্তিকালে সংগঠিত করেছিলেন এবং নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতেন। সত্যিকার অর্থে, বঙ্গবন্ধুর পর আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ফসল আমাদের স্বাধীনতার পেছনে আড়াল থেকেই নীরবে বঙ্গমাতা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ।

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বাল্যকাল থেকেই একই পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। বাল্যকালে বঙ্গমাতা তার বাবা-মাকে হারালে বঙ্গবন্ধুর বাবা-মাই বঙ্গমাতাকে লালন-পালন করেন। তাই বাল্যকাল থেকেই তাদের মধ্যে চিন্তাধারা ও মনের মিল ছিল এবং আমৃত্যু তাদের মধ্যে এটা একইরকম ছিল। শুধু তাই নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়টি মাস অসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল ও ধৈর্য নিয়ে শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। এই সময়টায় ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেকটা বন্দিদশায় কেটেছে তার।

১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর পরই বঙ্গমাতাকে হত্যা করা হয়। তাই আমরা বলতে পারি যে, তারা পরস্পরের জন্য জন্মেছিলেন, আজীবন একসঙ্গে বেঁচেছিলেন এবং একসঙ্গেই শাহাদাতবরণ করেন। বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে ধাপে বঙ্গমাতার অবদান রয়েছে। আর সেটা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী হিসেবে নয়, একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে। যিনি ধূপের মতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়সম আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর জীবনে তার সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছার অবদান ঠিক কতখানি তার এক প্রচ্ছন্ন ধারণা পাওয়া যায় তার জীবনীগ্রন্থের প্রারম্ভের দ্বিতীয় ও তৃতীয় লাইনে- ‘আমার সহধর্মিণী একদিন জেল গেটে বলল, ‘বসেই তো আছো, লেখো তোমার জীবনকাহিনি’ (পৃ. ১)।

আসলে প্রত্যেক সৃষ্টিশীল পুরুষের জীবনে একজন অসামান্য সমার্থক ব্যক্তি থাকেন। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, যার ডাকনাম ছিল রেণু। সর্বদা সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে কীভাবে জীবনকে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করতে হয় তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে গ্রন্থখানিতে। বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে আরও লেখেন যে, বঙ্গবন্ধু যখন ছাত্র ছিলেন, তখন থেকেই বঙ্গমাতা তার স্বামীর জন্য সব সময়ই কিছু টাকা বাঁচিয়ে রাখতেন এবং বঙ্গবন্ধু যখন ঢাকা বা কলকাতা থেকে গোপালগঞ্জ যেতেন তখন বঙ্গমাতা তাকে সেই টাকা দিতেন।

স্বাধীনতার পর বঙ্গমাতাই প্রথম বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে উদ্বুদ্ধ করেন। বেগম মুজিবের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধুর ধানম-ি ৩২ নম্বর বাসভবনে নির্যাতিত এই নারীদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাধীনতার পর বীরাঙ্গনাদের উদ্দেশে বঙ্গমাতা বলেন, ‘আমি তোমাদের মা।’ তিনি বলেন, ‘এই বীরাঙ্গনা রমণীদের জন্য জাতি গর্বিত। তাদের লজ্জা কিংবা গ্লানিবোধের কোনো কারণ নেই। কেননা তারাই প্রথম প্রমাণ করেছেন যে, কেবল বাংলাদেশের ছেলেরাই নয়, মেয়েরাও আত্মমর্যাদাবোধে কী অসম্ভব বলীয়ান। (দৈনিক বাংলার বাণী, ১৭ ফাল্গুন, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ)।

১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ এই মাটির প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বঙ্গমাতার অত্যন্ত জোরালো অবদান ছিল। কেননা তিনি সব সময় বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতেন। উদাহরণস্বরূপ, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের আগে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে কী বলবেন তা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয় এবং সেই সময় বঙ্গমাতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন যা আমরা অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে জানতে পারি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যখন বঙ্গবন্ধু এবং অন্য ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো, তখন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব দেন। কিন্তু বঙ্গমাতা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বঙ্গমাতা এ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন কারণ তিনি প্যারোলে মুক্তির মাধ্যমে জাতির জন্য বঙ্গবন্ধুর বিশাল ত্যাগ বিনষ্ট করতে চাননি। বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি না চাওয়ায় পাকিস্তানি শাসকরা তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মূলত এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয় এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের বীজ বপনকে আরও গতিশীল করে। জেল-জুলুমজর্জরিত বঙ্গবন্ধুর ওপর পাকিস্তান সরকার যে অবিচার করেছিল সেই সময় স্বামীর পাশে ঢাল হয়ে ছিলেন বঙ্গমাতা। নিজের ঘরের আসবাবপত্র, অলঙ্কার বিক্রি করেও দল ও নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। একজন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হয়েও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন তিনি। তার সদয় আচরণ ও বিনয়ে মুগ্ধ ছিল সবাই। সন্তানদের যেমন ভালোবেসেছেন, তেমন শাসনও করেছেন। পিতা-মাতা উভয়েরই কর্তব্য পালন করে গেছেন তিনি। কোমলে-কঠোরে মিশ্রিত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই সাহসী নারী স্বামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সন্তানদের গড়ে তোলেন।

বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে ধাপে বঙ্গমাতা শুধু বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী হিসেবেই নয়, একজন নীরব দক্ষ সংগঠক হিসেবেও সর্বদা ছায়া হয়ে ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের কণ্টকাকীর্ণ পথে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ছিলেন প্রচ- ধীশক্তিসম্পন্ন তীক্ষè বুদ্ধিমত্তার অধিকারী এক অকুতোভয় বীর, যার সুমহান ব্যক্তিত্ব ও অপরিসীম ত্যাগ এবং দেশমাতৃকার প্রতি নির্মোহ চিত্তে আত্মনিবেদন জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

মহীয়সী এই জননীর জন্মদিনে আমার কৃতজ্ঞ চিত্তের অশেষ শুদ্ধা।

সুমনা গুপ্তা : কলাম লেখক, গবেষক ও শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement