advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সবার ভেতর প্রত্যেকের থাকা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
১১ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২২ ০৯:০৪ এএম
advertisement

প্রত্যেকের ভেতর সবাই থাকে, নাকি সবার ভেতর প্রত্যেকে? দুটো থাকাই সত্য এবং উভয়েই স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। মূল প্রশ্নটা আসলে ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির সম্পর্কের। সবার ভেতর প্রত্যেকে থাকবে- এ ব্যবস্থা স্বাধীনতার ভেতরই কেবল সম্ভবপর। থাকাটা ঘটবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে। সমষ্টি ব্যক্তিকে ধারণ করবে, লালন-পালন করবে, মুক্তি দেবে। এটা শুধু তখনই সম্ভব- যখন রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েই হয় গণতান্ত্রিক। আর গণতান্ত্রিক হওয়াটাই হচ্ছে প্রকৃত স্বাধীনতা। অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যক্তিকে গ্রাস করে ফেলে, তাকে আজ্ঞাবহ করে রাখে, তার ব্যক্তিসত্তাকে স্বীকৃতি দেয় না। সমষ্টি সেখানে ব্যক্তির শত্রু, নিপীড়ক ও শোষক।

অন্যদিকে প্রত্যেক ব্যক্তির ভেতরই কোনো না কোনোভাবে সবাই থাকে। সেই প্রত্যক্ষ হোক কিংবা হোক অপ্রত্যক্ষ। সবার যে সমষ্টিগত রূপ, সেটিই তো রাষ্ট্র ও সমাজ। আর আমরা কে কবে রাষ্ট্রের বাইরে যেতে পেরেছি বা পারব, তা স্থানের দিক থেকে দেশের ভেতরেই থাকি অথবা থাকি অতিদূরদেশে। সমাজের সংস্কৃতি, রাষ্ট্রের ধ্যান-ধারণাকে আমরা সঙ্গে নিয়েই চলি। তারা থাকে আমাদের অভ্যাসে, আচার-আচরণে ও চিন্তাধারায়। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজ যদি স্বাধীন না হয়, হয় যদি তারা স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক একনায়ক অথবা ধনিক শ্রেণির দ্বারা শাসিত- তা হলে আমরা, রাষ্ট্র ও সমাজের সদস্যরা স্বাধীনতা ভোগ করছি এমনটা বলার উপায় থাকে না। বিপরীতে রাষ্ট্র ও সমাজ যদি স্বাধীন হয়, তা হলে ওই যে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে তার উপস্থিতি- সেটি আমাদের বন্দি করে না, উল্টো মুক্তি দেয়। তাই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবেই পরস্পর নির্ভরশীল।

advertisement 3

প্রকৃত স্বাধীনতারই অপর নাম হচ্ছে মুক্তি। গণতন্ত্র নেই অথচ স্বাধীনতা আছে- এমন কথা বলার উপায় নেই। আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি। প্রথমে ব্রিটিশকে, পরে পাকিস্তানিদের তাড়িয়েছি। তাই বলে আমরা কি বলতে পারব যে, আমরা যথার্থ অর্থে স্বাধীন হয়েছি? না, পারি না। না পারার কারণ হলো, আমরা গণতন্ত্র পাইনি। গণতন্ত্রের পরিবর্তে বৈধ-অবৈধ নানা কিসিমের ও নানা নামের স্বৈরশাসন পেয়েছি।

advertisement 4

আমাদের মুক্তির সংগ্রাম শেষ হয়ে গেছে- এ কথা বলাটা তাই মস্ত বড় আত্মপ্রবঞ্চনা অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টির সচেতন অপপ্রয়াস। এটা তো আমাদের অবশ্যই জানতে ও মানতে হবে যে, সবার মুক্তি না ঘটলে প্রত্যেকের মুক্তি কিছুতেই আসবে না এবং সবার সেই মুক্তির জন্য আমাদের প্রত্যেককেই সচেষ্ট হতে হবে- বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে নয়, ঐক্যবদ্ধ হয়ে।

আমাদের কালে আদর্শলিপির বইয়ে ও পাঠ্যপুস্তকেও নানাবিধ উপদেশাবলি পাওয়া যেত। এগুলোর একটি ছিল, ‘সকলের তরে সকলে আমরা/প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’ ব্যাপারটাকে তখন কেমন মনে হতো স্মরণে নেই। কিন্তু এই প্রবীণ বয়সে মনে হয়- উপদেশটা যতই উদ্দীপক হোক না কেন, মোটেই সঠিক ছিল না। একটা মোটা সত্য তো এই যে, প্রত্যেক মানুষই আসলে নিজের তরে। আমার যে বন্ধুটি দীর্ঘকাল ধরে আমেরিকায় বাস করেন এবং মনে-প্রাণে খাঁটি ও বিশ্বাসযোগ্য বাঙালি, তিনি প্রায়ই আমাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে- অন্যসব প্রাণীর মতো মানুষও অত্যন্ত আত্মস্বার্থসচেতন অর্থাৎ কিনা পুঁজিবাদী। তা সে সত্যটা অস্বীকার করে কোন মূর্খে? এবং সেটি স্বীকার করে নিয়েই তো আমরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখি। কেবল স্বপ্ন দেখি না, তাদের রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সংগ্রাম করে থাকি। তা হলে? হ্যাঁ, মানুষ স্বার্থপর প্রাণী ঠিকই কিন্তু মানুুষ আবার মানুষও। তার ভেতরে এই বোধটুকুও কার্যকর রয়েছে যে- অন্যের সঙ্গে না মিললে, অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা না পেলে তার পক্ষে উন্নতি করা তো দূরের কথা, বেঁচে থাকাটাও সম্ভব হবে নয়।

যথার্থ কথাটা যদি এমন হয় যে- প্রত্যেকেই আমরা নিজের তরে, তা হলে উচ্চৈঃস্বরে সেটি বলাতেও আপত্তি দেখি না। কেননা নিজের তরে হওয়ার জন্যই তো পরের তরে হতে হবে। নিজে স্বাধীন হওয়ার প্রয়োজনেই সবাইকে স্বাধীন করা দরকার। নইলে গৃহযুদ্ধের ভেতরেই বসবাস করতে হবে। এখন যেমনটা করছি। নির্বুদ্ধিতা ও অন্ধত্ব পরিহার করে আমরা যদি নিজেকে মুক্ত করতে চাই, তা হলে সবার সঙ্গে মিলিত না হয়ে কোনো উপায় নেই এবং সেই মিলন স্থবির বা স্থিতিশীল কোনো ঘটনা হবে না। তাকে যেতে হবে সামনে, সর্বদাই থাকবে সে চঞ্চল এক অভিযাত্রী।

আরেকটি প্রবাদ বাক্যও স্মরণযোগ্য। সেটি কেবল আমাদের এখানে নয়, পুরো বিশ্বেই প্রচলিত। তা হলো ‘দশের লাঠি একের বোঝা’। এটাও ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির সম্পর্কবিষয়ক একটি প্রস্তাবনা বৈকি। কথাটা সত্য। দশজনে বহন করলে কোনো বোঝাই আর বোঝা থাকে না, অত্যন্ত সহজ হয় বহন করা। আর সবাই মিলে কাজ করলে বিরোধী থাকবে না, গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটবে, উৎপাদন ও বিতরণের ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আসবে। পরস্পরকে শ্রদ্ধা করতে শিখে, ভালোবেসে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে আমরা মর্যাদাবান হব, আমাদের দুর্দশা ঘুচবে, অবনতির দিক থেকে শীর্ষস্থান অধিকারের গ্লানিকর পরিস্থিতির অবসান ঘটবে।

লাঠি প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের সেই অবিস্মরণীয় উক্তিটি স্মরণ না করে উপায় থাকে না। ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে তিনি লিখেছেন, ‘হায় লাঠি! তোমার দিন গিয়াছে।’ কিন্তু সত্যি কি সেটিই? লাঠির দিন চলে গেছে, নাকি তার উন্নতি ঘটেছে এবং উন্নত হয়ে অত্যন্ত পরাক্রান্ত, অনেক ক্ষেত্রে খুবই সূক্ষ্ম মারণাস্ত্রে পরিণত হয়েছে? সর্বত্রই তো লাঠি মারামারি অর্থাৎ অস্ত্রের খেলা চলছে। আমরাও খেলছি। কিন্তু শত্রুকে চেনা হচ্ছে না। তাই আঘাত করছি পরস্পরকে ও ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি নিজেরাই। শত্রু হচ্ছে পুঁজিবাদ। আমরা একাধিকবার স্বাধীন হয়েছি। তবে পুঁজিবাদ আমাদের অব্যাহতি তো দেয়নিই, বরং ক্রমাগত নিজের শক্তি বৃদ্ধি করে আমাদের গৃহযুদ্ধে লিপ্ত রেখেছে। ওই যে তালেবান ও আল কায়েদারা আমেরিকার বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মার্কিন আধিপত্যবিরোধী ঠিকই কিন্তু মোটেই পুঁজিবাদবিরোধী নয়; বরং তারাও আমেরিকানদের মতোই পুঁজিবাদে অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পত্তির পবিত্রতায় আস্থা রাখে। ব্যবধান অবশ্যই রয়েছে। সেটি হচ্ছে ডান হাতের সঙ্গে বাঁ হাতের। নইলে তারা একই দেহে দুই অঙ্গ বটে।

আমার আমেরিকা প্রবাসী সজ্জন বন্ধুটি প্রতিবছরই একবার করে দেশে আসেন। এসে মন খারাপ করেন। দেশে যে তার বিপুল পরিমাণ বিষয়-সম্পত্তি রয়েছে, তা নয়। দেশে আসেন দেশের মানুষকে ভালোবাসেন বলে এবং অবস্থা দেখে খুবই দুঃখ পান। আমি তাকে পুঁজিবাদের কর্মতৎপরতার কথা বলি। তিনি সেটি বুঝেও বুঝতে চান না। তিনি বলেন- আমেরিকায় বসবাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে সরাসরি জানেন যে, পুঁজিবাদেরও অনেক ভালো দিক রয়েছে।

আমি সেটি অস্বীকার করি না। কিন্তু বোঝানোর চেষ্টা করি যে, পুঁজিবাদের পক্ষে এখন আর ভালো কিছু দেওয়ার নেই। আমাদের যেতে হবে সেই স্তরে- যেখানে পুঁজিবাদের অর্জনগুলো থাকবে ঠিকই কিন্তু মালিকানাটা হবে সামাজিক। আমি তাকে বলতে পারি না- ওই যে তিনি যথার্থ দেশপ্রেমিক হয়েও উৎপাটিত হয়ে গেছেন, থাকছেন আমেরিকায়, কাজ করছেন সেখানে; এটা পুঁজিবাদেরই দৌরাত্ম্য। পুঁজিবাদই তো তাকে দেশে থাকতে দিল না। তিনি মানেন সেটি। তবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রশ্নে সাড়া দেন না। হয়তো ভেতরে ভেতরে তিনি জাতীয়তাবাদীই রয়ে গেছেন। হয়তো ভাবেন, আর এগোলে এমন নৈরাজ্য দেখা দেবে- যেটা নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তা হলে কী করতে হবে? জবাবে সংস্কারের কথা বলেন- যেসব কথা অনেক শুনেছি। সংস্কারে যদি কাজ হতো, তা হলে তো যুদ্ধে যাওয়ার দরকার হতো না। তিনিও যুদ্ধে গিয়েছেন, একাত্তরে।

আরেকজনের সঙ্গেও কথা হয়। তিনি পুঁজিবাদে নন, সমাজতন্ত্রেই বিশ্বাসী। একাত্তরে তিনিও যুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু মতাদর্শিক প্রবণতায় ছিলেন মস্কোপন্থি। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর থেকে নিজেকে বড়ই অসহায় মনে করেন। তার মূল জিজ্ঞাসাটা হলো, আন্দোলন তো করবেন। কিন্তু তহবিল আসবে কোত্থেকে? শুনে বড়ই বিচলিতবোধ করি। তহবিলের অভাবে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন থেমে গেছে- এমন সংবাদ তো কোথাও পাইনি। তার অভিযোগ যে, সবাই জিজ্ঞাসা করে- লড়াই-সংগ্রাম তো অনেক করলাম। তবে আমি কী পেলাম? এখানটায় তার রোগ নির্ণয় সম্পূর্ণ নির্ভুল। আমি কী পেলাম- এ প্রশ্নটা পুঁজিবাদীদের বটে। তারা নিজেকে সবার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে অপরাগ। সবার মধ্যেই যে ব্যক্তির মুক্তি নিহিত রয়েছে, এই অতিসাধারণ সত্যটিকে তারা ধরতে পারেন না। আমি তো এটাও বিশ্বাস না করার কারণ দেখি না- ওই যে প্রবীণ জননেতা তহবিলের দুশ্চিন্তায় কাতর থাকছেন, সেটিও তার মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট পুঁজিবাদী ব্যাধিরই লক্ষণ বটে।

কথাটা দাঁড়াচ্ছে এই- সবার মুক্তির যে সংগ্রাম, সেটি শেষ হয়নি। সেই সংগ্রামটা পুঁজিবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক। সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দেশপ্রেমিক মানুষের অপরিহার্য কর্তব্য।

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement