advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চীন-তাইওয়ান সংঘাত কেন

ডা. রফিকুর রহমান
১১ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২২ ১০:৪৩ এএম
advertisement

১৭ শতকে প্রথমবারের মতো তাইওয়ানের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ পায় চীন। তখন চীন শাসন করছিল কুইং রাজবংশ। তাইওয়ানের জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ মূল ভূখ- চীন থেকে পর্যায়ক্রমে আগত। জনসংখ্যার অতিক্ষুদ্র অংশ আদিবাসী। ঐতিহাসিকভাবেই তাইওয়ান চীনের অংশ। এর বিপরীতে যাদের অবস্থান, তারা আসলে এই দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যে অনেক ছোট ছোট লুফ হোল খুঁজে থাকেন। তবে ইতিহাসটা মোটেও সরল ছিল না। দুর্বল চীন বারবার আক্রান্ত হয়েছে আঞ্চলিক এবং এই অঞ্চলের বাইরের শক্তিগুলো দিয়ে। সময়ের ব্যবধানে শক্তিগুলোর ক্ষমতার পালাবদল হলেও নতুন নতুন শক্তির খড়গ এখনো চীনের মাথার ওপর বিরাজমান। তা আধুনিক চীনকে এই ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে কৃত্রিমভাবে তৈরি নতুন নতুন সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাই তাইওয়ান ঘিরে চীনের আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বও চ্যালেঞ্জর সম্মুখীন।

তাইওয়ান এক সময় প্রায় পঞ্চাশ বছর জাপানের দখলে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মূল ভূখ-ের সঙ্গে যুক্ত হলেও ১৯৪৯ সালে চীন বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের নানা অনৈতিক কূটকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে তাইওয়ানকে আবারও মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে।

advertisement 3

১৮৯৫ সালে প্রথম সাইনো জাপান যুদ্ধে জাপান কুইং রাজবংশের কাছ থেকে তাইওয়ানকে দখল করে নেয়। ১৯১২ সালে কুইং ডায়নাসটির পতনের পর চীন তখন রিপাবলিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পুরো চীনের নামকরণ করা হয় ‘রিপাবলিক অব চায়না’ সংক্ষেপে আরওসি। তাইওয়ান জাপানের দখলে থাকায় সেখানে চীন তখন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান নিশর্ত আত্মসমর্পণ করলে চীন (আরওসি) তাইওয়ানকে নিজেদের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আবারও একীভূত করে। কিছু বছরের জন্য মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত থাকলেও ১৯৪৯ সালে চীন বিপ্লবের পর তাইওয়ান আবার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ১৯৪৯ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে চীনের কর্তৃত্ব গ্রহণ করলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট চিয়ং কাই শেক তাইওয়ানে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকে সরকার পরিচালনা করেন। তিনি আশা করেছিলেন, মূল চীনা ভূখণ্ড হয়তো অতিসত্বর তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

advertisement 4

যুক্তরাষ্ট্রের সব সহযোগিতা সত্ত্বেও চিয়াং কাই শেকের পরাজয় এবং মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে চীনে সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় আঘাত। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল রাজনৈতিক ও সামরিক পরাজয়। তা যুক্তরাষ্ট্র সহজে মেনে নিতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব তখন তাইওয়ানভিত্তিক চিয়াং কাই শেকের সরকারকেই মূল চীন হিসেবে তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখে। তা পরবর্তী ৩০ বছর তথা ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় বলিয়ান হয়ে চিয়াং কাই শেকের নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র দ্বীপ তাইওয়ানভিত্তিক সরকার ‘রিপাবলিক অব চায়না’ নামে জাতিসংঘের সদস্য ও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে মূল চীনকে প্রতিনিধিত্ব করে। মজার ব্যাপার হলো, এই তাইওয়ান ১৯৫৫ সালে মঙ্গোলিয়াকে জাতিসংঘের সদস্যপদপ্রাপ্তির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার সুবাদে ভিটো প্রদান করেছিল। তাইওয়ানের দাবি ছিল, মঙ্গোলিয়া চীনের অবিচ্ছেদ অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ওই সময় বিশ্ববাসীর সামনে এ রকম নাটকই মঞ্চস্থ করেছিল। তা আজও সময়ে সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মঞ্চস্থ হচ্ছে।

জাতিসংঘের শুভবুদ্ধির উদয় হয় ১৯৭১ সালে। এক রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে তাইওয়ান নাটকের অবসান হয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি ‘এক চায়না’ নীতির আরেক মূল ভিত্তি ওই রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে স্বীকৃত হয়।

১৯৭১ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৬তম অধিবেশন ২৭৫৮ নম্বর রেজ্যুলেশন পাস করে। এর মাধ্যমে ওয়ান চায়না পলিসি আবারও প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে বলা হয়, শুধু পিপুলস রিপাবলিক অব চায়নার (পিআরসি) প্রতিনিধিরা জাতিসংঘে চীনের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি এবং পিআরসি নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একটি। এর মাধ্যমে জাতিসংঘে পিপুলস রিপাবলিক অব চায়নার আইনগত অধিকার পুনরুদ্ধার হয়। একই রেজ্যুলেশনে তাইওয়ানভিত্তিক চিয়াং কাই শেকের প্রতিনিধিদের তৎক্ষণাৎ বহিষ্কার করা হয় যে, জায়গাটি তারা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় বেআইনিভাবে জাতিসংঘে এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত সব সংস্থায় ২২ বছর ধরে দখল করেছিল।

তাইওয়ানকে জাতিসংঘ থেকে বের করে দেওয়ার পরও আরও আট বছর অর্থাৎ ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখে। ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়ান চায়না পলিসিকে সমর্থন করে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতার শেষ নেই। ১৯৭৯ সালেই যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান স্পেশাল অ্যাক্ট নামে একটি আইন প্রণয়ন করে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে সামরিক অস্ত্র সরবরাহসহ অন্যান্য সুবিধা প্রদান করে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি করে চলেছে। এ অ্যাক্ট স্পষ্টতই জাতিসংঘের নেওয়া রেজ্যুলেশনের সম্পূর্ণ বিরোধী।

যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা কেউই তাইওয়ানকে একটি ‘দেশ’ হিসেবে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা ওয়ান চায়না পলিসিকে সমর্থন করেন। এর অর্থ তাইওয়ান চীনের অংশ। তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে চীনের বিরুদ্ধে উসসে দিচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার শামিল। আন্তর্জাতিক আইনে এর কোনো বৈধ ভিত্তি নেই। যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে যা চায়, তা হলো দক্ষিণ চীন সাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তার একচ্ছত্র সামরিক উপস্থিতি এবং এই অঞ্চলে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা। ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরও ওই লক্ষ্য অর্জনে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি সম্প্রতি অন্য ছয় মার্কিন আইন প্রণেতাকে নিয়ে তাইওয়ান সফর করেন। একটি অঘোষিত তবুও সম্ভাব্য এ সফরের বিরুদ্ধে বেইজিং প্রথম থেকেই প্রতিবাদ করে আসছিল। গত ২৫ বছরের মধ্যে তাইওয়ান সফর করা তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ র‌্যাংকিং রাজনীতিবিদ। তার আগমনে তাইওয়ানের ভাণ্ডারে নতুন কোনো কিছু সংযোজন হয়নি। বরং তার সফর এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং তাইওয়ানের বিরাজমান স্থিতিবস্থাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করার পেছনে তার সফর রেসিপি হিসেবে কাজ করেছে। ইউরোপে ইউক্রেন সংকটের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নতুন সংকট সৃষ্টির দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। এখনে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনও বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখার স্বার্থে আলোচনার পরিবর্তে আক্রান্ত হলে চীনকে সামরিকভাবে জবাব দেওয়ার পথে হাঁটছেন। একই ধরনের মনোভাব ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মধ্যেও দেখা গিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র এখন তাইওয়ানকে চীনের আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য গতিশীল ও নির্ভুলভাবে ডিজাইন করা নতুন নতুন অস্ত্র কেনার পরামর্শ দিচ্ছে। তারা বলছেন, কৌশলটি হলো- একটি বৃহত্তর শক্তির সঙ্গে লড়াই করার জন্য ছোট কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র ব্যবহার করা। উদাহরণস্বরূপ- তারা বলছে, রাশিয়ার আক্রমণের প্রথম পর্বে ইউক্রেনের সাফল্য ছিল রাশিয়ান ট্যাংকগুলো ধ্বংস করার জন্য কাঁধ থেকে চালিত রকেট ব্যবহার। এ কৌশলটির একটি সফল প্রয়োগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তথাকথিত সফলতায় ওই ইতোমধ্যে ইউক্রেন যে রাশিয়ার কাছে ২৫ শতাংশ ল্যান্ড ও সমুদ্রবন্দর হারিয়ে একটি ল্যান্ড লক দেশে পরিণত হওয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে ‘কৌশল’-এ, পরাজয়ের এ বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়নি।

তাইওয়ানকে একটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নতুন কোনো ব্যবস্থাপত্র নেই। একই ব্যর্থ ব্যবস্থাপত্র ইউক্রেনেও চলমান। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের একটিই লক্ষ্য- যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলা। ইউক্রেনের দিকে তাকালেই ওই সত্যটি দিবালকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাইওয়ানকে তার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সরাসরি চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে বর্তমান স্থিতিবস্থাকে প্রাধান্য দিয়ে ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্দিষ্ট করতে হবে। হাজার মাইল দূরে থাকা বাইরের কোনো শক্তি দিয়ে এই অঞ্চলের শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়।

 

ডা. রফিকুর রহমান : আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক

advertisement