advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নারীর ভূমিকার মূল্যায়ন ও স্বীকৃতির লড়াই

ড. জোবাইদা নাসরীন
১৩ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২২ ১২:০৭ এএম
advertisement

গত ৯ আগস্ট ছিল বিশ্ব ‘আদিবাসী’ দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো এ দেশেও সরকারি উদ্যোগে না হলেও বেসরকারিভাবেই নানা উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এই দিবসটি পালিত হয়েছে। দিবসটির এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘ঐতিহ্যগত বিদ্যা সংরক্ষণ ও বিকাশে আদিবাসী নারীর ভূমিকা।’ তবে এবার ‘আদিবাসী’ দিবস আসার আগেই ‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে সরকারের তোড়জোড় এবং প্রজ্ঞাপন অনেক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি করেছিল।

advertisement 3

কী ছিল সেই প্রজ্ঞাপনে? তবে এখানে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন যে, প্রতিবছরই ৯ আগস্টের আগেই সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে এই ধরনের প্রজ্ঞাপন আসে এবং সেগুলোর যথাযথ প্রতিবাদ হয়েছে। এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে এবং সেগুলো প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনোটিই আমলে নেয়নি সরকার। তবে এবারের প্রজ্ঞাপনটি পাঠানো হয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে। বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং আরও কয়েকটি সংশ্লিষ্ট অফিসে পাঠানো হয়েছে। এবং সেগুলো করা হয়েছে ১৯ জুলাই। প্রজ্ঞাপনটিতে সই করেছেন সেই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শামসুর রহমান। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রেরিত সেই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ছোট ছোট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।’

advertisement 4

এ প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় অংশটি আরও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সেখানে লেখা আছে যে, “বর্ণিতাবস্থায় আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত টক শোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্য ব্যক্তিদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করার বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে প্রচারের জন্য অনুরোধ করা হলো।”

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্ক চালু রাখা হয়েছে আর সেটি হলো কারা এ দেশের ‘আদিবাসী’? নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি স্পষ্টভাবে জানান দিতে চাই যে, কে আগে এসেছে আর কে পরে এসেছে সেটি দিয়ে ‘আদিবাসী’ চিহ্নিত হয় না। কারণ জাতিরাষ্ট্রের ধারণা খুবই সাম্প্রতিক। কিন্তু মানুষের চলাচল সব সময়ই ছিল। ধরুন কোনো জাতির মানুষকে আপনি বললেন তার পূর্বপুরষ/নারীদের বাসস্থান কোথায়? তিনি জানালেন, তুরা পাহাড়। তা হলে আপনি তাকে কীভাবে রাষ্ট্রের সীমানায় ফেলবেন?

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা এবং জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ বসবাসরত ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠী ‘আদিবাসী’ সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। কারণ তারা ব্রিটিশ শাসনামলের আগে থেকেই এই অঞ্চলে বসবাস করছে, তারা দেশের অধিপতি জনগোষ্ঠীর অংশ নয়। এ দেশে কোনো জাতিকে উচ্ছেদ করে বসতি স্থাপনের ইতিহাস তাদের নেই। তারা তাদের নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতি অক্ষুণœ রেখেছে। তা হলে সরকার কেন তাদের এই স্বীকৃতি দিতে চায় না? কেন তাদের বিভিন্ন সময় ‘উপজাতি’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘ট্রাইব’ এগুলো বলা হচ্ছে? প্রতিটি জাতিরই অধিকার আছে নিজের মতো পরিচিত পাওয়ার।

২০০৮ সালে বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। তা হলে ক্ষমতায় এসেই কেন তাদের এই ভিন্ন রাজনৈতিক মোড়? সরকারের কেন ‘আদিবাসী’ শব্দটির প্রতি এত এলার্জি?

এর কারণ যদি ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ তাদের অনেক অধিকারকে নিশ্চিত করবে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের প্রথাগত আইনের স্বীকৃতি। ‘আদিবাসী’রা তাদের নিজস্ব আইনে চলে। তাদের আইন অনুযায়ী ভূমির মালিকানার কোনো লিখিত কাগজের রেওয়াজ নেই। এই কারণেই তাদের অনেক ভূমিই বাঙালিরা দখল করে নিয়েছে। তাদের ভূমি তাদের থেকে হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন তাদের প্রথাগত আইনের স্বীকৃতি দিলে সেই জমিগুলোকে ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা জোরদার হয় এবং যেটি সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের বিপক্ষে যাবে, যা মূলত সরকারের ভোটের রাজনীতিকে প্রভাবান্বিত করবে। সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতির হিসেবে সব সময় সরকার চলে। জাতীয়তাবাদের রাজনীতিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

তবে এই ধরনের প্রজ্ঞাপন যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি সেটি আর বলার অবকাশ নেই।

এবার আসি আন্তর্জাতিক ‘আদিবাসী’ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ে- ‘ঐতিহ্যগত বিদ্যা সংরক্ষণ ও বিকাশে আদিবাসী নারীর ভূমিকা’ প্রসঙ্গে। আমরা জানি এ দেশের ইতিহাসে ‘আদিবাসী’রা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রথম সাঁওতাল বিদ্রোহ থেকে শুরু করে সব মুক্তি সংগ্রামেই ‘আদিবাসী’রা অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু জাতীয়তাবাদী ইতিহাস নির্মাণের রাজনীতি ইতিহাসে তাদের যোগ্য স্থান দেয়নি।

আর ‘আদিবাসী’ নারীদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে এই উপমহাদেশে প্রথম ‘আদিবাসী’ নারীরাই স্লোগান তুলেছিল ‘জান দেব তবু ধান দিব না।’ এ ছাড়া চিপকো আন্দোলনসহ বহু আন্দোলনে ‘আদিবাসী’ নারীরই প্রথম প্রতিবাদ করেছে, রক্ত দিয়েছে। বজ্র কণ্ঠে উচ্চারণ করেছে, ‘জান দেব তবু গাছ কাটতে দেব না’।

বিশ্বের বনাঞ্চলের প্রায় ৮৫% সংরক্ষণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত ‘আদিবাসী’রা, বিশেষ করে ‘আদিবাসী’ নারীরা। তারা তাদের নিজস্ব বিদ্যা এবং ঐতিহ্যগত জ্ঞান দিয়েই এই বন রক্ষা করে চলছে। তারা নিজস্ব পদ্ধতি তৈরি করছে প্রাকৃতিক রং। হাতেচালিত মেশিন দিয়ে বুনছে তাদের কাপড়। সেই কাপড়ে আছে তাদের জাতি পরিচয়ের নকশা। সেই নকশা দেখে সবাই বুঝে যায় তাদের জাতির পরিচয়। নিজস্ব ঢংয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে তাদের ভাষা, কৃষ্টি ও আচার। কিন্তু স্বীকৃতি মিলেছে খুবই কম। কারণ বিশ্বজুড়েই চলছে পুরুষতান্ত্রিকতার দাপট আর সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেওয়ার এক অদম্য বাসনা।

যদি আমরা বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের কথাই বলি, তা হলে দেখব যে, করোনাকালীন সময়ে হাত ধোয়ার জন্য যত ধরনের পদ্ধিত সরকার বাতলে ছিল সেটি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ‘আদিবাসী’ সমাজগুলোর প্রযোজ্য ছিল না। কারণ তখন সেখানে সব ‘ঝি’রের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। সেখানে হাত ধোয়া এবং জীবাণুমুক্ত করার পানি ছিল না। সরকার থেকেও সেই অঞ্চলের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যবিধির কথা আমরা শুনিনি। কিন্তু সেখানে সেই ‘আদিবাসী’ নারীরা নিজেদের মতো করে স্বাস্থ্যবিধি তৈরি করে নিয়েছিল। তাই ‘ঐতিহ্যগত বিদ্যা সংরক্ষণ ও বিকাশে আদিবাসী নারীর ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই। তার সঙ্গে প্রয়োজন নারীর ভূমিকার স্বীকৃতি।

শুধু ‘আদিবাসী’ সমাজেই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে নারীর ভূমিকার যথাযথ গুরুত্ব এবং স্বীকৃতি নেই। তাই এবারের আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় যে শুধু ‘আদিবাসী’ সমাজেই ইঙ্গিত করছে, এমনটি নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে নারীর ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন এবং স্বীকৃতির প্রশ্নটিই সামনে এসেছে যা একভাবে বহুদিন ধরেই কাক্সিক্ষত ছিল।

আমি বিশ্বাস করি এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সরকার অচিরেই এই ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি থেকে সরে আসবে এবং বাংলাদেশে বসবাসরত ‘আদিবাসী’দের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ‘আদিবাসী’ হিসেবে দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিক হবে। সেই সঙ্গে ঐতিহ্যগত বিদ্যা সংরক্ষণ এবং বিকাশে ‘আদিবাসী’ নারীসহ সব নারীর ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন এবং স্বীকৃতি মিলবে।

ড. জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement