advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘এই বাজারে ১২০ টাকা দিয়ে সংসার চলবে কী করে’

কর্মবিরতিতে অচল ২৩১ চা বাগান

আমাদের সময় ডেস্ক
১৪ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২২ ০৯:৫৩ এএম
দৈনিক মজুরি ন্যূনতম ৩০০ টাকা করার দাবিতে গতকাল সিলেটের চৌহট্টি শহীদ মিনার এলাকায় চা শ্রমিকরা অবস্থান ধর্মঘট ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। ফোকাস বাংলা
advertisement

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে সবখানে। এ পরিস্থিতিতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন চা শ্রমিকরা। চা বাগানের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন তারা। গতকাল শনিবার সকাল থেকে দেশের ২৩১টি চা বাগানে একযোগে শুরু হয় শ্রমিকদের কর্মবিরতি। আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে রাজপথেও অবস্থান নেন তারা। সকাল ৬টা থেকে ধর্মঘট শুরু করেন চা-শ্রমিকরা। ফলে সব বাগানেই বন্ধ ছিল পাতা চয়নসহ সব ধরনের কার্যক্রম। সারাদিন পরিশ্রমের পর এখনো একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মাত্র ১২০ টাকা। যা দিয়ে পরিবারের এক বেলার খাবার জোগাড় করাও কষ্টকর।

চা শ্রমিক নেতারা বলছেন, এটি অমানবিক। বারবার মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানানো হলেও নানা অজুহাতে চা শ্রমিকদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা জানান, দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে লাগাতার কর্মসূচির অংশ হিসেবে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিকরা। এর আগে গত মঙ্গলবার থেকে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করেন তারা। দাবি আদায় না হওয়ায় বাধ্য হয়েই লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করেছেন তারা। শ্রমিকদের অভিযোগ, দুবছর পর পর চুক্তি নবায়নের কথা থাকলেও মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।

advertisement

সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ দেশের সব চা বাগানে একযোগে কর্মবিরতি চলছে বলে জানান বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা।

advertisement 4

লাক্কাতুরা চা বাগানের শ্রমিক নয়ন মোদি বলেন, এক কেজি চালের দাম এখন ৭০ টাকা। পেট্রলের লিটার ১৩০ টাকা। অথচ আমরা সারাদিন খেটে মাত্র ১২০ টাকা পাই। এই বাজারে ১২০ টাকা দিয়ে সংসার চলবে কী করে? তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশে সবকিছুর দাম বাড়ছে। কিন্তু আমাদের মজুরি বাড়ছে না। আমরা কি মানুষ না?

সিলেট : সিলেট ভ্যালির আন্দোলনরত শ্রমিকরা সকাল থেকে লাক্কাতুরা এলাকায় বিমানবন্দর সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে বেলা ১১টার দিকে তারা বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে দেন। প্রায় আধাঘণ্টা পর পুলিশ গিয়ে সড়ক শ্রমিকদের সরিয়ে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করে। এর পর চা শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে সিলেট নগরে চলে আসেন। নগরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় এসে অবস্থান নেন তারা।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা বলেন, দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে আমরা গত ৮ আগস্ট থেকে আন্দোলন করে আসছি। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি দাওয়া নিয়ে বৃহস্পতিবার চা বাগানগুলোর মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের নিয়ে সমঝোতা বৈঠক করে বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তর। কিন্তু মালিকপক্ষের কেউ বৈঠকে আসেননি। এতে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। ফলে শনিবার সকাল ছয়টা থেকে দেশের সবগুলো চা বাগানের শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন।

রাজু গোয়ালা আরও বলেন, ৩০০ টাকা মজুরি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি এগুলো চলবে।’

এই চা শ্রমিক নেতা প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘১২০ টাকা মজুরি দিয়ে কী হয়। মালিকপক্ষ বলে, তারা শ্রমিকদের রেশন দেয়। কী রেশন দেয়? শুধু আটা দেয়। আমাদের এগ্রিমেন্টে বলা আছে যে, ছয় মাস চাল, ছয় মাস আটা দেবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিও রাখেন না। মাত্র ১২০ টাকা দিয়ে খাবার, চিকিৎসা, বাচ্চাদের লেখাপড়া কীভাবে সম্ভব?

শ্রমিক ইউনিয়নের বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা বলেন, ৩ আগস্ট আমরা মালিকপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে মজুরি বাড়ানোর দাবি জানাই। এ জন্য সময়সীমাও বেঁধে দেই। কিন্তু তারা তা না মানায় আমরা বাধ্য হয়ে আন্দোলনে নেমেছি।

একই তথ্য জানিয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল জানান, আলটিমেটামে কাজ না হওয়ায় আমরা গত চার দিন ধরে সারাদেশের সব চা বাগানে দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করি। তার পরও মালিকপক্ষ আমাদের দাবি মেনে না নেওয়ায় আমরা ধর্মঘটের মতো কঠোর কর্মসূচি শুরু করতে বাধ্য হয়েছি।

এদিকে এ বিষয়ে চা বাগান মালিকপক্ষের বক্তব্য জানতে বাংলাদেশীয় চা সংসদের চেয়ারম্যান শাহ আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

শ্রম দপ্তরের শ্রীমঙ্গল কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম বলেন, কাজ বন্ধ করে শ্রমিকরা আন্দোলনে গেলে মালিক ও শ্রমিক দুই পক্ষেরই ক্ষতি হবে। আমরা বিষয়টি সমাধানের জন্য বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে একটা সমঝোতা বৈঠক করেছি। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ২৮ আগস্ট তাদের সঙ্গে বসতে সময় চেয়েছেন। আপাতত আন্দোলন স্থগিত রাখতে বলেছেন। কিন্তু চা শ্রমিক ইউনিয়ন সেটা মানেনি। এভাবে ভরা মৌসুমে হুট করে ধর্মঘট ডাকা আইন পরপন্থী বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট বিভাগের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বলেন, মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকপক্ষের আলোচনাকালে এভাবে কাজ বন্ধ করে আন্দোলন করা বেআইনি। আমরা আশা করছি, তারা আন্দোলন বন্ধ করে কাজে যোগ দেবে। এখন চা বাগানে ভরা মৌসুম। কাজ বন্ধ রাখলে সবার ক্ষতি। তারাও এ সিজনে কাজ করে বাড়তি টাকা পায়।

হবিগঞ্জ : সারা দেশের মতো হবিগঞ্জের ২৪টি চা বাগানে চলছে শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের পূর্ণদিবস কর্মবিরতি। শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করে যাচ্ছে। তেলিয়াপাড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি খোকন তাঁতি জানান, ৩০ জুলাই বাগান মালিকপক্ষ দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১৩৪ টাকার প্রস্তাব দিয়েছে। চা শ্রমিক ইউনিয়ন তা প্রত্যাখ্যান করে। মাধবপুর-চুনারুঘাট চা বাগানের শ্রমিকদের সংগঠন লস্করপুর ভ্যালির সভাপতি রবীন্দ্র গৌড় জানান, দ্রব্যমূল্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চা শ্রমিকরা ১২০ টাকায় সংসার চালাতে পারছেন না। শ্রমিকদের দাবি আদায় না হলে আগামী দিন মহাসড়ক অবরোধসহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে শ্রমিকরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে।

চুনারুঘাটে চা শ্রমিকরা ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়ক অবরোধ করে। সকাল থেকে মহাসড়কের উপজেলার চান্দপুর বাজারে তারা সমবেত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে। বিকালে কয়েক হাজার চা শ্রমিক পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে চুনারুঘাট মধ্যবাজারের সমাবেশে মিলিত হয়। এতে বক্তব্য দেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ আবদুল কাদির লস্কর, চুনারুঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আকবর হোসেন জিতু প্রমুখ।

মৌলভীবাজার : ‘চা শ্রমিক, চা শ্রমিক, এক হও, লড়াই কর, ৩০০ ‘টাকা মজুরি, দিতে হবে দিতে হবে’, মালিক পক্ষের টালবাহানা, চলবে না, চলবে না স্লোগানে মৌলভীবাজারের চা বাগানগুলোতে শ্রমিকরা গতকাল কর্মবিরতির প্রথম দিন পার করেন। কর্মসূচির মধ্যে ছিল বিক্ষোভ মিছিল, সভা-সমাবেশ ও শ্রীমঙ্গল শহরে ৩০ মিনিট সড়ক অবোরধ। দুপুর ১২টায় ভাড়াউড়া চা বাগান থেকে একটি মিছিল শ্রীমঙ্গল শহরের চৌমুহনা চত্বরে এসে অবস্থান নেয়। ৩০ মিনিট পর আবার বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বাগানে ফিরে যায় শ্রমিকরা।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, দ্বি-বার্ষিক চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দুবছর আগে। এ দীর্ঘ সময়েও চা শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশীয় চা সংসদের দ্বি-বার্ষিক চুক্তির সমঝোতায় পৌঁছায়নি। তাই শনিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন।

ভাড়াউড়া চা বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি নুর মিয়া বলেন, একটা ভালো সমাধান দরকার। কিন্তু মালিকপক্ষ থেকে কোনো সাড়া আসেনি। চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা দেওয়ার জন্য আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা দুবছর আগ থেকে দাবি জানিয়ে আসছেন।

চট্টগ্রাম : কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের ২৬টি চা বাগানের শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা রয়েছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন চট্টগ্রাম ভ্যালী কার্যকরী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক যতন কর্মকার আমাদের সময়কে জানান, গতকাল শ্রমিকরা দিনভর কর্মবিরতি পালন করেছে। পাশাপাশি মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাহি উপদেষ্টা রামভোজন কৌড়ি বলেন, দ্রব্যমূল্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ১২০ টাকায় একটি পরিবার কীভাবে চলে। দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে এলেও বাগান মালিকরা মজুরি বাড়াননি। এখন আমরা লাগাতার কর্মবিরতি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকার ও মালিকপক্ষ এগিয়ে না এলে কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।

- প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সিলেট বু্যুরো চিফ সজল ছত্রী, চট্টগ্রাম ব্যুরো থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক মহিউদ্দিন, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি চৌধুরী ভাস্কর হোম, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি রুহুল হাসান শরীফ, মাধবপুর প্রতিনিধি অলিদ মিয়া ও চুনারুঘাট প্রতিনিধি মহিদ আহমদ চৌধুরী

 

advertisement