advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ব্যাংকের মূল হিসাবের বাইরে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা

খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশল অবলোপন

জিয়াদুল ইসলাম
১৪ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২২ ১২:৪৪ পিএম
গ্রাফিক্স আমাদের সময়।
advertisement

বিভিন্ন ছাড় দিয়েও যখন খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না, তখন বিদ্যমান পুরনো কৌশলেই তা কমানোর চেষ্টা করছে ব্যাংকগুলো। আর দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ কৌশলটির নাম ঋণ অবলোপন। সম্প্রতি সময়ে খেলাপি ঋণ অবলোপন বাড়িয়েছে অনেক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে খেলাপি ঋণ অবলোপন হয়েছে প্রায় ৫৩০ কোটি টাকা। সব মিলে গত মার্চ শেষে ব্যাংকি খাতে খেলাপি ঋণ অবলোপনের পুঞ্জীভূত স্থিতি ছিল ৫৯ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। এ ঋণ থেকে গত ১৯ বছরে আদায় হয়েছে ১৫ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। ফলে খেলাপি ঋণ অবলোপনের নিট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। অবলোপনের কারণে এ পরিমাণ ঋণ আর ব্যাংকের মূল হিসাবে দেখাতে হচ্ছে না। এটা বিবেচনায় নিলে ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণ এখন ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

মূলত আর্থিক প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখাতেই ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপনের পথে হাঁটছে। এ সময়ে ১৫টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অবলোপনের পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ২২ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতে মোট অবলোপন করা ঋণের প্রায় ৭৩ শতাংশ। এদিকে অবলোপন করা খেলাপি ঋণ থেকে ব্যাংকগুলোর আদায় কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ২০৭ কোটি টাকা, আদায়ের হার দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর মধ্যে ৩টি ব্যাংকের আদায়ের হার শূন্য এবং ১১টি ব্যাংকের আদায়ের হার দশমিক ২৫ শতাংশের কম।

advertisement

উল্লেখ্য, ব্যাংকের মন্দমানের খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিন আদায় না হলে তা ব্যাংকের মূল ব্যালান্স শিট থেকে আলাদা করে অন্য একটি লেজারে সংরক্ষণ করা হয়। ব্যাংকিং পরিভাষায় যা ঋণ অবলোপন বা রাইট অফ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আওতায় ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে। সাধারণত খেলাপি হওয়ার পর মামলা করেও কোনো ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এলে সে ঋণ অবলোপন করে ব্যাংকগুলো। তবে অবলোপন করা ঋণ পুনঃতফশিল বা পুনর্গঠন করা যায় না। যদিও ঋণ অবলোপনের সুযোগ রাখাকে বরাবরই অস্বচ্ছ বলে মন্তব্য করে আসছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো নিজেদের আর্থিক অনিয়মও আড়াল করছে। তা ছাড়া একবার কোনো ঋণ অবলোপন করা হলে তা আদায়ের জন্য খুব বেশি চেষ্টা করা হয় না।

advertisement 4

সূত্রগুলো বলছে, গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, বেসিক ব্যাংকসহ বেশ কিছু আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে বিশেষ নীতিমালার আওতায় ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেয় সরকার। এ ছাড়া এ সময়ে খেলাপি ঋণ অবলোপনের নীতিমালাও শিথিল করা হয়। আগে মামলা ছাড়া ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অবলোপন করা যেত। আর এখন ২ লাখ টাকা পর্যন্ত মামলা ছাড়াই অবলোপন করা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন শিথিল নীতিমালার কারণে খেলাপি ঋণ অবলোপন বাড়িয়েছে ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০০৩ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকি খাতে ঋণ অবলোপনের পুঞ্জীভূত স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে একই সময়ে সুদসহ আদায় হয়েছে ১৫ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। এটি বাদ দিলে মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে অবলোপন করা ঋণের প্রকৃত স্থিতি দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। আর অবলোপন ঋণসহ মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে আরও প্রায় ১১ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। এটি বিবেচনায় নিয়ে দেশে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ১ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মাত্র ১৫টি ব্যাংকের অবলোপন করা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা অবলোপন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংক ৪ হাজার ৩৬ কোটি, জনতা ব্যাংক ৩ হাজার ৩৯১ কোটি, প্রাইম ব্যাংক ২ হাজার ৩৪৩ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১ হাজার ৬৭৭ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংক ১ হাজার ৫৪০ কোটি, পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ৫৩৩ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ১ হাজার ৫৩২ কোটি, ব্যাংক এশিয়া ১ হাজার ৪৭৫ কোটি, আইএফআইসি ১ হাজার ৩৯৭ কোটি, এবি ব্যাংক ১ হাজার ৩২৫ কোটি, বেসিক ব্যাংক ১ হাজার ২৮৪ কোটি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ১ হাজার ২৬০ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংক ১ হাজার ২২৮ কোটি ও উত্তরা ব্যাংক ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।

অবলোপন করা খেলাপি ঋণ থেকে আদায়ও কমছে ব্যাংকগুলোর। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ এ তিন মাসে ৩টি ব্যাংকের আদায় ছিল শূন্য। এগুলো হলোÑ ন্যাশনাল ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও বিদেশি হাবিব ব্যাংক। এ ছাড়া ১১টি ব্যাংকের আদায়ের হার ছিল ২৫ শতাংশের কম। এগুলো হলো বেসিক ব্যাংকের দশমিক ০৪ শতাংশ, এবি ব্যাংকের দশমিক ০৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের দশমিক ০৫ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংকের দশমিক ০৮ শতাংশ, ঢাকা ব্যাংকের দশমিক ১৫ শতাংশ, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের দশমিক ২০ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের দশমিক ২১ শতাংশ, সাউথইস্ট ব্যাংকের দশমিক ২১ শতাংশ ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক দশমিক ২২ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংকের দশমিক ২৪ শতাংশ।

 

 

advertisement