advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আবুল মোমেন
পরিবর্তিত বিশ্বে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও স্বপ্নপূরণের চ্যালেঞ্জ

১৫ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম
আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২২ ০৯:২১ এএম
advertisement

বাংলাদেশের রূপকার এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের এই দিনে যখন নিহত হন তখন বিশ্বের রাজনৈতিক হালচাল ছিল ভিন্ন রকম। প্রথাগত গণতান্ত্রিক ধারা ছেড়ে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য বঙ্গবন্ধুও তখন সমাজতান্ত্রিক ধাঁচে রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু যারা আঘাত হেনেছিল তারা ছিল আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ এবং আঞ্চলিক ও দেশীয় ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তির অনুগ্রহভাজন।

বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী বাংলাদেশকে পরের সামরিক শাসকগণ ফিরে পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের অবসান ঘটলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষ শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে সরকার গঠন করতে পেরেছে ২০০৯ সালে। মধ্যবর্তী ৩৩ বছরে এক মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও মৌলিকভাবে বড় কোনো সংস্কার করা তখন সম্ভব হয়নি। তবে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে গুরুতর সংকট সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে এ সংকট যেন এক চরম রূপ নিয়েছে। বিপরীতে বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রকোপে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এ ধারার বাইরে থাকা যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে কঠিন ছিল। তবে একই সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রযাত্রাসহ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সূচনা হওয়ায় মানুষের সামনে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি অনুধাবন করা বেশ কঠিন।

advertisement 3

বঙ্গবন্ধু মুসলিম লীগের মাধ্যমে পাকিস্তান কায়েমের রাজনীতি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তবে ভাষা আন্দোলনের পেক্ষাপটে দ্রুত তিনি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির যাত্রা সুগম করার পক্ষে অবস্থান নেন। মনে রাখতে হবে তিনি বরাবরই গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধর্ম-নিরপেক্ষতা ছাড়া সফল করা অসম্ভব। ষাটের দশকে তিনি যখন ছয়দফা ঘোষণার মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি এগিয়ে নিচ্ছিলেন তখন বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক চেতনার জয়জয়কার। সেই দশকে আফ্রিকার বহু দেশ উপনিবেশবাদের নিগড় থেকে মুক্তি লাভ করেছিল সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের স্বপ্ন বুকে নিয়ে। তখন সারাবিশ্বে ছাত্র-তরুণ ও শ্রমিক সমাজের মধ্যেও এ আদর্শের আগুন প্রজ্বলিত হয়েছিল। আমরা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে গোড়া থেকেই শোষিত মানুষের পক্ষে অঙ্গীকার দেখতে পেয়েছি। এ কথা তিনি আত্মজীবনীতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তাই ষাটের দশকে তিনি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচির প্রতি তার আস্থা প্রকাশ করেছিলেন।

advertisement 4

১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্র এবং ধর্মরাষ্ট্র সৌদি আরব সরাসরি এর বিরোধিতা করেছিল। অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে চীন ছাড়া বাকি সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সমর্থন দেয়। ফলে প্রবাসী সরকারকেও তার অগ্রাধিকার নির্ণয়ে বিশেষ দোলাচলে পড়তে হয়নি। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কর্মসূচিকে মেলাতে। কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। একদিকে তার দল আওয়ামী লীগ এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত ছিল না। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধোত্তর সদ্য স্বাধীন দেশে নানা মহলের মধ্যে উচ্চাভিলাষের অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছিল। এদিকে যুদ্ধোত্তর দেশে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন ছিল সরকারের জন্য প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ ও করণীয়। এর জন্য প্রয়োজন ছিল অন্তত প্রথম পাঁচ বছরের জন্য জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীল অবস্থা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর সেই ঐক্য থাকেনি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এ রকম একটি বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু নিহত হলে তার দলসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি দিশেহারা অবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। এ ফাঁকে পরাজিত রাজনীতিতে বিশ্বাসী প্রতিপক্ষ নিজেদের শক্তি সংহত করে ও বাড়িয়ে তোলে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা এ ছন্নছাড়া অবস্থায় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দলের হাল ধরেছিলেন। তবে তার ভেতরে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও পারদর্শিতার বীজ বরাবরই ছিল।

একটা কঠিন সময়ে তিনি বিরোধী দলে অবস্থান করে রাজনৈতিক দুরূহ পথ পাড়ি দিতে থাকেন। এভাবে তার অভিজ্ঞতা অর্জন করে ২০০৯ সালে যখন বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় আসেন তখন বঙ্গবন্ধুর আরব্ধ কাজ সম্পন্ন করার দৃঢ়তা তিনি দেখাতে পেরেছেন। ৭৫-এর হত্যাকা- বা ৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করে তিনি ইতিহাসের কলঙ্ক মোচনের কাজ শুরু করেন। সে কাজ এখনো চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখেই তিনি এগোতে চাইছেন। তবে কাজটা তার জন্যও সহজ নয়। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে তিনি উন্নয়নের অভিযাত্রাকে জোরদার রেখেছেন, গরিববান্ধব অনেক কর্মসূচিও চালু করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও টেকসই শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত দাঁড় করানো যায়নি। দারিদ্র্যের হার প্রথম পর্যায়ে কমানো সম্ভব হলেও করোনার বিপর্যয় ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাতে বর্তমানে বিপরীত ঢেউ লেগেছে। দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। পাশাপাশি ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানও গুরুতরভাবে বেড়ে যাচ্ছে। রাজনীতি ও ক্ষমতার বলয় থেকে দরিদ্র সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সমাজে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব বাড়ছে। বাস্তবতা হলো গণতান্ত্রিক চেতনায় কোনো সামাজিক সংস্থাই আর চলছে না। এর ফলে সাধারণের জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের যাত্রাপথ সমাজতন্ত্রমুখী না হলেও কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিমুখে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্টভাবে শোষিত গণমানুষের প্রতি তার পক্ষপাত ব্যক্ত করে গেছেন। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজগঠনই তার স্বপ্ন ছিল। ফলে উন্নয়নের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এ স্বপ্নের মিলন ঘটাতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজের গণতন্ত্রায়ণে অনেক কাজ করতে হবে। আমরা দেখতে চাই বর্তমান সরকার সেই দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। আজ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু দিবসে তার স্বপ্নের বাংলাদেশ কায়েমের কথাই আমাদের ভাবতে হবে। তাই দেশে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজব্যবস্থার সমন্বয় জরুরি।

advertisement