advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আলঝাইমার্স প্রতিরোধে সচেতনতা প্রয়োজন

হাসান আলী
২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০২:৩৪ এএম
advertisement

আজ বিশ্ব আলঝাইমার্স দিবস। আলঝাইমার্স মানে বুদ্ধিবৈকল্য বা চিত্তভ্রংশ। আক্রান্ত ব্যক্তির স্মৃতি হ্রাস, বিচারশক্তির অবনতি, মানসিক গোলযোগ এবং ব্যক্তিত্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ সময় ধরে আলঝাইমার্স আক্রান্ত রোগী পর্যবেক্ষণ করে ও রোগীর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলে আমার এই রোগ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা তৈরি হয়েছে। ধারণা আরও স্বচ্ছ করতে দুটি কেস স্টাডি তুলে ধরছি। কেস স্টাডিগুলোয় ব্যক্তির নাম-ঠিকানা বদলে দেওয়া হয়েছে।

কেস স্টাডি-১ : নাম রহিম, বয়স ৬৬। বীর মুক্তিযোদ্ধা, পেশা ব্যবসা। এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলে উন্নত একটি দেশে চাকরি করেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মেয়েরা নিজেদের সংসারে ভালোই আছেন। ছেলেমেয়ে তিনজনই উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন। রহিম সাহেব টাকা-পয়সা গুনতে ভুল করেন। সাধারণ যোগ-বিয়োগ করতে পারেন না। একটুতেই রেগে যান। কথা বলার জন্য শব্দ খুঁজে পান না। এমন বাক্য গঠন করেন, যার কোনো অর্থ হয় না। আবার এমন শব্দ ব্যবহার করেন, যা খুবই অশ্লীল। যারা উপস্থিত থাকেন তারা অস্বস্তিতে পড়েন কিংবা বিব্রত হন। বাথরুম কোথায় করতে হবে, তা ভুলে যান। এমনভাবে শরীর চুলকান, যা দৃষ্টিকটু। মাঝে মাঝে শরীর থেকে কাপড়চোপড় খুলে ফেলেন। এমন সব হাসিঠাট্টা করেন, যাতে অন্যরা অপমানিত বোধ করেন। টাকা-পয়সা হাতে পেলে খুব খুশি হন। নতুন কারও সঙ্গে পরিচয় হলে অনেক সুন্দর আচরণ করেন। এদের বিশ্বাস হবে না তিনি কারও সঙ্গে অসদাচরণ করতে পারেন।

advertisement 3

কেস স্টাডি-২ : নাম করিম, বয়স ৬২। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পাস এবং বিদেশ থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ২৫ বছর সুনামের সঙ্গে কাজ করেন। অফিসের সহকর্মীরা খেয়াল করলেন করিম সাহেব কাজকর্মে উদাসীন। দীর্ঘ সময় ধরে চুপচাপ বসে থাকেন। অফিসের আসা-যাওয়ার সময়সূচি মানেন না। অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলেন। গুরুত্বপূর্ণ ফাইলপত্রে যৌক্তিক কারণ ছাড়া স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে বাসায় থাকেন। টাকা-পয়সার প্রয়োজন অথচ ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে চেকে সই দেবেন না। সংসারের খরচ মেটানোর জন্য জমিজমা বিক্রি করা দরকার, তাতে রাজি হচ্ছেন না। নিজের ব্যক্তিগত কাজকর্মগুলো কারও সাহায্য ছাড়া করতে পারেন না। করিম সাহেব ৫২ বছর বয়সে আলঝাইমার্স রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে ডাক্তাররা মনে করেন।

advertisement 4

দুটি কেস স্টাডি থেকে আমরা আলঝাইমার্স রোগ সম্পর্কে একটা ধারণা পাই। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে আলঝাইমার্স নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। দুঃসংবাদ হলো, এখন পর্যন্ত এ রোগের কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। ডিমেনশিয়া কয়েক রকমের আছে। আলঝাইমার্স এক ধরনের ডিমেনশিয়া। ডিমেনশিয়া আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৭০ শতাংশই আলঝাইমার্স রোগে আক্রান্ত। এই রোগের লক্ষণ হলোÑ স্মৃতি হ্রাস, নিকট-অতীতের কথা ভুলে যাওয়া, বিচার-বিবেচনা দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা বলা বা শব্দ উচ্চারণে জড়তা, পরিচিত জায়গা চিনতে না পারা, পরিবারের সদস্যদের নাম ভুলে যাওয়া।

পার্কিনসন্সনকে এক ধরনের ডিমেনশিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই রোগে প্রথমে হাত-পা ও পরে শরীরের অন্যত্র কম্পন দেখা দেয়। হাঁটা বা চলাফেরায় অসুবিধা ও অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। রোগী কেঁপে কেঁপে হেলে-দুলে পথ চলেন, মনে হয় পড়ে যাচ্ছেন। হাতের লেখা ছোট হয়ে আসে। হাত দুটি ঘোরান অনবরত। গলার স্বরে সমস্যা তৈরি হয় বলে কথা কম বলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মস্তিষ্কের একটা অংশে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে রোগটি দেখা দেয়।

ভাসকুলার ডিমেনশিয়া হলো স্ট্রোক-পরবর্তী সময়ে আচরণগত অস্বাভাবিকতা। এ ধরনের রোগীরা সহিংস আক্রমণাত্মক হন। সন্দেহ করেন, পরিবারের নিকটতমদের শত্রু মনে করেন। গায়েবি আওয়াজ শুনতে পান। উদ্বেগ, আশঙ্কা, আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন কাটে। এক সময় ব্যক্তিগত কাজকর্ম করতে পারেন না। আস্তে আস্তে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।

মিক্সড ডিমেনশিয়া বলে এক ধরনের ডিমেনশিয়া রয়েছে। এটা হলো একজন রোগী একই সঙ্গে আলঝাইমার্স এবং ভাসকুলার ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। অ্যালকোহলিক ডিমেনশিয়া হলো যারা নিয়মিত মদ পান করেন এবং মদ ছাড়া চলে না তারা বার্ধক্যে এসে সাধারণত এই রোগে আক্রান্ত হন। তবে অ্যালকোহলিক হলেই এ রোগে আক্রান্ত হবেনÑ এমন কথা নেই। এই রোগের লক্ষণ হলো সহিংস আচরণ, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, স্মৃতি নষ্ট হওয়া, অস্বাভাবিক যৌনাচরণ, অশ্লীল-নোংরা কথা বলা, বিচার-বিবেচনা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি।

আলঝাইমার্স রোগে সাধারণত প্রবীণ ব্যক্তিরা আক্রান্ত হন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা একটা সময় পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘমেয়াদি এ কষ্টকর সেবাদান করতে পারেন না। নানারকম অজুহাতে আপনজনরা অসুস্থ প্রবীণকে ছেড়ে চলে যান। অপেক্ষাকৃত দুর্বল সদস্য এ গুরুদায়িত্ব বহন করেন। কেউ কেউ সঠিক সেবাযতেœর অভাবে দ্রুত মৃত্যুমুখে পতিত হন। আলঝাইমার্স আক্রান্ত প্রবীণদের সেবাদানের জন্য পেশাদার সেবাকর্মী প্রয়োজন। কষ্টকর এবং ব্যয়বহুল এ সেবাটি নিশ্চিত করতে আমাদের তৎপরতা খুবই সীমিত। যেহেতু এ রোগের চিকিৎসা নেই, আছে সেবা, সেই সেবা নিশ্চিত করতে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। আপনার আপনজনের মধ্যে কারও এ রোগের লক্ষণ দেখা দিলে আলঝাইমার্স কিনা, নিশ্চিত হতে একজন মনোরোগ ও ¯œায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং অ্যান্ডোক্রাইনোলজিস্টের পরামর্শ নিন।

হাসান আলী : প্রবীণ বিষয়ে লেখক ও গবেষক

advertisement