advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস কেন

রবি রায়হান
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:১০ এএম
advertisement

শিক্ষা জাতির মেরুদ-। শিক্ষক জাতির বিবেক। এই তত্ত্বকথাগুলো ছোটবেলায় বইপুস্তকে অনেক পড়েছি এবং সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নিয়েছে হৃদয়ের পরতে পরতে। আমাদের শিক্ষকরা নীতিতে ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল। একেকজনের একেক বিষয়ে পা-িত্য ছিল মহাসাগরের মতো গভীর ও প্রশস্ত। তাদের ব্যক্তিত্ব ও সততার সামনে সব শ্রেণির মানুষের মাথা নুয়ে পড়ত। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, আধুনিক যুগে এসে সেই শিক্ষক জাতির বুকে অর্থলোভী বিষ মিশে নৈতিকতায় পচন ধরেছে। তা পুরো জাতির শরীর ও চরিত্রে আস্তে আস্তে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এই ক্যানসার বাঙালি জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত করেছে। ছাত্র ও শিক্ষক- উভয়ে যদি পবিত্র জ্ঞানদান এবং শিক্ষাগ্রহণের পরিবর্তে অনৈতিক পথে সুযোগ-সুবিধা নেন, তা হলে শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?

advertisement

প্রত্যেক শিক্ষকের চরিত্র ও নীতিবোধ যদি স্বচ্ছ না হয়, তা হলে সমাজে নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে যাবে। তা বর্তমানে নেই বললেই চলে। শিক্ষকতা যখন অর্থ রোজগারের হাতিয়ার, তখন ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কটা হয়ে পড়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার মতো। একজন শিক্ষক জ্ঞানের দোকানি এবং ক্রেতা ছাত্রছাত্রীরা টাকার বিনিময়ে তার কাছ থেকে ভালো ফলাফলের সনদ কেনে। এখানে দরদাম ঠিক করে নির্দিষ্ট পরিমাণ শিক্ষা বেচাকেনা হয়। কোনো কোনো শিক্ষক অভিভাবকদের কাছে তার সন্তানকে এ+ পাওয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে প্রাইভেট পড়ান। শিক্ষকদের অর্থলোভী মনোভাব শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে। এই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের প্রতি ছাত্রছাত্রীর প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেয় কীভাবে?

advertisement 4

নামিদামি কিছু স্কুলের নামডাকসর্বস্ব শিক্ষকরা শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করেন এবং নিজের ছাত্রছাত্রীকে যে প্রশ্নোত্তর শেখান, সেগুলোই শুধু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হিসেবে সন্নিবেশিত করেন। তার কাছে প্রাইভেট পড়া ছাত্রছাত্রীরা সবাই এ+ পায়- এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী পরীক্ষার আগে সব অভিভাবক সেই শিক্ষকের দুয়ারে হামলে পড়েন। কারণ সব অভিভাবকের সন্তানদের জন্য এ+ সনদ দরকার। নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই এখানে? এভাবে পুরো জাতিকে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে আমরা কীভাবে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সৎ এবং নীতিবান মানুষের খোঁজ করি- তা আমার বোধগম্য নয়। অনৈতিক শিক্ষার কারণে শিক্ষকদের ছাত্রের হাতে এখন প্রায়ই নিগৃহীত হতে শোনা যায়। এ জন্য পুরোপুরি দায়ী আমাদের বর্তমান যুগে অতিঅর্থলোভী ও ক্ষমতালোভী শিক্ষকরা। সৎচরিত্রের গুণে এখন আর কোনো শিক্ষক সম্মানিত হতে চান না। অর্থনৈতিকভাবে ধনী হয়ে ফেক সম্মান কেনেন। আধুনিক যুগের অভিভাবকরা যেনতেন উপায়ে নিজের ছেলেকে এ+ পাওয়ার জন্য অসদুপায় অবলম্বন করতে দ্বিধা করেন না। এই অভিভাকদের মনে সব সময় অন্যের সঙ্গে টাকার গরমে প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি থাকে। এই মানুষিকতার কারণে বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এতটা দুর্নীতির অতলে তলিয়ে গেছে যে, সেখান থেকে এ জাতিকে টেনে তোলা দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে শিক্ষক নিজেকে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে চরিত্র কুলষিত করেছেন, নৈতিকতার শিক্ষা তার কাছে আশা করা মূর্খতা। যে শিক্ষকের নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই নেই, সেই শিক্ষকের শিক্ষা দিয়ে দেশ ও জাতির কোনো মঙ্গল আশা করা আর অর্বাচীনের সফল চন্দ্র অভিযান আশা করার মতো একই পরিণতি হবে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, ২০২২ সালের দিনাজপুর বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ছয় বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এবং চারটি বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। যেসব বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে- সেগুলো হলো গণিত, কৃষি বিজ্ঞান, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় চলতি এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে কেন্দ্র সচিব ও নেহাল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জানতে পেরে এই চার বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ সত্য গোপন করে অনিবার্য কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে মর্মে বিজ্ঞপ্তিতে জানায়।

সব থেকে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত সবাই শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। এই মহান পেশায় থেকে একজন শিক্ষক কীভাবে এই ধরনের অনৈতিক কর্মকা-ে জড়াতে পারেন। এই ধরনের খবর শুনলে যে কোনো বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হবে। শিক্ষকদের এই নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক স্খলন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। রক্ষকই যখন ভক্ষক হয়, তখন কে নিরাপত্তা দেবেন?

যে দেশে শিক্ষক সমাজ শিক্ষা সনদ বিক্রি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, সেই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং পুরো জাতির কপালে স্থায়ীভাবে কলঙ্কের তিলক আঁকা রবে- যা আগামী একশ বছরেও মুছে ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না। যখন শিক্ষক জাতি বিবেকহীন, অর্থলোভী, জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে- তখন সমাজ ও রাষ্ট্র অন্ধকারে ঢেকে যায়। কারণ একজন শিক্ষকই জ্ঞানের আলো জ্বেলে সমাজের কোণে কোণে লেপ্টে থাকা অন্ধকার তাড়াতে পারেন। সেই শিক্ষক সমাজ যখন নিজেরাই দুর্নীতির অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়, তখন কে এই অন্ধকার সমাজটাকে আলোকিত করবেন?

চিন্তা করে কূল পাই না, মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় হাতে লেখা একটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র বিক্রি হয়েছে। নেহাল উদ্দীন পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। শিক্ষকদের এই অবক্ষয় অমার্জনীয় ও নৈতিক স্খলনের দায়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান অনিবার্য। স্থানীয় একটি কলেজের ইংরেজি প্রভাষক মাইদুল ইসলাম মুকুলের ভাষ্য- ‘আমি এইচএসসি শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ায়। এই কেন্দ্র ও কলেজের অনেক শিক্ষার্থী হাতে লেখা ওই প্রশ্নপত্র সমাধানের জন্য আমার কাছে নিয়ে আসে। পরে জানতে পারি কুড়িগ্রাম, রংপুর ও ভূরুঙ্গামারী থেকে বিভিন্ন মানুষের মাধ্যমে এগুলো এসেছে।’ এই ঘটনা সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ার খবর জানতে পেরে গত মঙ্গলবার রাতেই দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. কামরুল ইসলাম সচিব জহির উদ্দিন, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেন। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা আগেই সমাপ্ত হওয়ায় এ ব্যাপারে পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হবে বলে জানানো হয়।

এখন প্রতিটি বোর্ডের প্রশ্নপত্র আলাদা হওয়ায় অন্যান্য বোর্ডের পরীক্ষা যথারীতি আগের ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। অন্যান্য বোর্ডের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে কিনা, এটাও তদন্ত করা জরুরি। কারণ রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় থাকে, তখন কে কার আমানত রক্ষা করবেন? অর্থাৎ বেড়ায় যখন ক্ষেত খায়, তখন ক্ষেত নিরাপদ রাখার নিশ্চয়তা কে দেবেন?

রবি রায়হান : কবি ও প্রাবন্ধিক

advertisement