advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পূজা ও সম্প্রীতি, সেকাল-একাল

মো: ইমরুল কায়েস
১ অক্টোবর ২০২২ ০৭:১৫ পিএম | আপডেট: ১ অক্টোবর ২০২২ ০৭:১৫ পিএম
মো. ইমরুল কায়েস
advertisement

স্কুলে পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে ‘পূজা’র সঙ্গে পরিচয়। প্রতি বছর স্কুলে সরস্বতী পূজা হতো।  এতো বিশাল ভাবে পূজা আয়োজন হতো যে, আমরা মুসলমান ছাত্ররাও মুখস্ত করে ফেলেছিলাম  ‘ইয়া দেবী সর্বভূতেষু ক্ষান্তিরূপেণ সংস্থিতা। নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ। ইয়া দেবী সর্বভূতেষু জাতিরূপেণ সংস্থিতা। নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ।’ কিশোর সহপাঠি কমল কুমার রায় চৌধুরীর মাতা আমাদের কাকিমার হাতের বিশেষ মিষ্টি, পিঠা-পুলি এবং পাড়ার অনেক মাসিদের মুড়ি-মুড়কি ও লাড্ডূর কথা মনে পড়লে আজও জিভে জল আসে । সে এক অন্য রকম মেলবন্ধন, মাসিমা, দিদি-দাদাদের ভালোবাসা ও আদরের মধ্যে সময় কাটানো!

যৌবনের প্রথম দিকে আশির দশকে, যখন একটু একা একা বাড়ি থেকে বের হওয়ার  সুযোগ হয়ে উঠে তখনই দুর্গা পূজার সাথে পরিচয়। যেহেতু আমার জেলা গোপালগঞ্জ শহরে বড় হয়েছি  তাই এ লেখায় গোপালগঞ্জে পূজার দিনগুলোর কথা পাঠকের সামনে তুলে ধরার সামান্য প্রয়াস। তখন পূজা মানে সাজ সাজ রব, কলকাতার নতুন গানের ক্যাসেট বের হতো আর আমাদের সহপাঠি লিটু বাগচীর কল্যাণে সেটা আমরা পেয়ে যেতাম। ক্যাসেট প্লেয়ারের অভাব থাকায় আমরা পনেরো-বিশ জন মিলে কোন একজনের বাড়িতে অথবা মাঠে গিয়ে গান শুনতাম।

advertisement

তখন গান শুনে ভাবে থাকার সময় ছিল। পূজা মণ্ডপে সারাদিন-সারারাত মাইকে গান বাজতো আর আমরা বাড়িতে বসে শুনতাম,‘আরে ও ননদী আর দু মুঠো চাল তুলে দে হাড়িতে.. , আয় খুকু আয়.., আমার বলার কিছু ছিল না.., আমার পূজার ফুল ভালো বাসা হয়ে গেছে..’ অথবা তৎকালীন শিল্পী জুয়েলের, ‘আমার পূজার মন্দিরে তুমি.., ডন ছবির গান, ‘আরে দিবানো মুজে পায়চানো.., অথবা সাইয়া দিলমে আনারে বা সাত সাল পেহেলে.., হাওয়া মে উড়তা যায়ে মেরি লাল দু পাট্টা মাল মাল.., কত কি?

advertisement 4

পুজোয় কি কি গান বেরুবে, শিল্পী কারা, কেমন হবে গান ইত্যাদি নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হতো, সহপাঠী লিটু বাগচী ছিল সেই আলোচনার লিডার। পূজোর দিনগুলোতে বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে যাওয়া - মূর্তি দেখা, ঘণ্টা হিসাবে রিকশায় ঘোরা, হিন্দু বন্ধুদের বাড়ির মুড়ি, মুড়কি, নাড়ু খাওয়া আরো কত কি? পূজার সময় রাত করে বাড়ি ফেরার জন্য মায়ের বকুনির কথাও মনে পড়ে।

হিন্দু বন্ধুরা তখন মণ্ডপে যাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করতো। নতুন জামা কাপড় পরে তারা মূর্তি দেখাতো।  কিশোর, যুবক, বয়োবৃদ্ধ সকলে মণ্ডপে যেত, যাদের দেহ বয়সের ভারে ন্যুয়ে গেছে তাদেরকেও এ সময় রাস্তায় দেখা যেত। সে সময়ের উলুধ্বনী এখনো কানে বাজে। তাদের মধ্যে আলোচনা কোন মণ্ডপের মূর্তি ভালো হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। পূজার মণ্ডলগুলো মানে হিন্দু-মুসলিমের বিশাল মিলনমেলা।  পূজা উপলক্ষে এতো রিকশা চলতো এখনো রিকশার ক্রিং ক্রিং শব্দ কানে বাজে। পূজা মণ্ডপের আসেপাশে ভাসমান খাবারের দোকান, মহল্লার ছেলেরা বয়স অনুযায়ী দল পাকিয়ে আড্ডা দিতো। পূজার শেষ দিনে আমাদের কলেজের সামনে মূর্তি ডোবানো হতো। সেখানে আমাদের পাড়ার বীরেন কাকু ( তখনকার কমিশনার ৮০ দশক ) ফটিক কাকা, নিলুদ কাকা, সমর, শেখর , সূর্য, দয়াল,  মুরালি,  হীরা বাড়ির দিলীপ, পাঁচুয়া, অনেকে নাচতো।  নাচের প্রধান জ্বালানি ছিল হরে কেষ্ট বাবুর দোকানের বিশেষ জিনিস যা গোপালগঞ্জের মানুষেরাই জানেন। তার পর নৌকায় করে মূর্তি ডোবানো।  পূজা শেষ, লক্ষণীয়, সে সময় মাইক গুলো আজানের সময় থেমে যেত, কাউকে কিছু বলা লাগতো না।  পুলিশ পাহারা ছিল কিনা আমার মনে নেই, কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার কথা শুনি নাই।  নৌকা ডুবানো শেষ তারপর আবার নতুন পূজার অপেক্ষা। নতুন গান, নতুন  সাহিত্য , নতুন পরিকল্পনা।

আজকাল আর আগের মতো সে সব দেখার সময় সুযোগ নেই। তবে যখনই শুনি নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশসহ বিশেষ বিশেষ লোকজনকে পূজা মণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে তারা প্রস্তুত রয়েছে ইত্যাদি, বড্ডো কষ্ট লাগে আমাদের মধ্যে কি আগের সম্প্রীতি নেই বা কমে যাচ্ছে।  আমরা সকলেমিলে কি আগের মতো সব কিছু করতে পারি না? ঈদ পূজা যার যার মতো করে।

সকলকে শারদীয় শুভেচ্ছা, ধর্ম হোক যার যার আর উৎসব হোক সবার।

লেখক: সমাজকর্মী ও কলাম লেখক।

advertisement