advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মৌলিক জ্ঞানের উদ্ভব ঘটে কল্পনাশক্তিতেই

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
২২ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০২২ ১১:৫২ পিএম
advertisement

মানুষ হাঁটছে যেদিকে, তার ছায়াটা ঠিক তার উল্টোদিকে হাঁটছে। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে তার ছায়াটারও চলার কথা ছিল। ছায়াটাকে মানুষ তার নিজের ছায়া বলে মানবে কী, মানবে না- সেটি ভিন্ন কথা। তবে কেউ সঙ্গে হাঁটলেই তো আপন হয় না, বন্ধু হয় না। কেউ কেউ হয়তো আপন হয়, কেউ কেউ বিশ্বাসঘাতকও হয়। সেটি চেনাটা কি এত সহজ? বইয়ের অঙ্কের উত্তর থাকে। অথচ জীবনের অঙ্কের প্রশ্ন থাকে। খুব সহজ সমীকরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝানো যায় হয়তো। তবে সহজের ভেতরেও কঠিন থাকে। মানুষের ছায়ার সমীকরণটা আলো আর অন্ধকারের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়। মানুষ যতক্ষণ আলোয় থাকে, মানুষের সঙ্গে সঙ্গে তার ছায়াটাও থাকে। মানুষ আলো থেকে অন্ধকারে প্রবেশ করলে ছায়াটা মানুষটাকে ছেড়ে চলে যায়। তখন খুব স্বার্থপর মনে হয় ছায়াটাকে। আবার উল্টোভাবে বিষয়টা আসতে পারে, ছায়াটা হয়তো অন্ধকারেও মানুষটার সঙ্গে চলতে চায়। কিন্তু মানুষটা হয়তো নিজেকে আড়াল করবে বলে ছায়াটাকে ইচ্ছা করেই হারিয়ে ফেলে। তখন মানুষটা কি নিজেকে স্বার্থপর ভাবে? সব প্রশ্নের উত্তর থাকতে নেই, সব গন্তব্যের ঠিকানা থাকতে নেই। কখনো কখনো অনেক উত্তরকে শূন্যের ওপর ভাসিয়ে দিতে হয়, অনেক ঠিকানাকে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখতে হয়। যখন মানুষ নিজের চোখে তাকে দেখে, তখন মানুষ তার মতো তাকে দেখতে ভালোবাসে। অন্যের চোখে নিজেকে মানুষ ঠিক কতটা দেখতে পায়? কিংবা অন্যের চোখ সে মানুষটাকে কতটা নিখুঁতভাবে যাচাই করতে পারে? হয়তো এ জায়গাটায় নিরপেক্ষতা খুব অসহায় হয়। পক্ষপাতদুষ্ট বলে কোনটাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে, সেটিও তো তখন একটা অমীমাংসিত প্রশ্নের মতো ঝুলে থাকে। কখনো কখনো মিলনের চেয়ে বিরহ অনেক ভালো। মিলন অনেক সময় বিচ্ছেদ ঘটায়, বিরহ বেশিরভাগ সময় কাছে টেনে নেয়। মিলনটা অনেকটা কাচের মতো, পড়ে গেলেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। বিরহটা অনেকটা পানির মতো- কখনো কঠিন, কখনো তরল, কখনো বায়বীয় হয়। মিলনটা কমেডি, বিরহটা ট্র্যাজেডি। কমেডি মানুষকে বাইরে থেকে হাসায়, ভেতর থেকে কাঁদায়। ট্র্যাজেডি মানুষকে বাইরে থেকে আঘাত করে, ভেতরে ভেতরে ভালোবাসার জন্ম দেয়।

advertisement

মানুষ জানে, ঘুমিয়ে পড়লে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে। তার পরও মানুষ ঘুমায়। ঘুম মানুষকে টানে, নাকি মানুষ ঘুমকে টানে- খুব কঠিন একটা প্রশ্ন। এর উত্তর খোঁজাটা প্রশ্নের চেয়েও কঠিন। যারা জেগে থাকে, তারা ঘুমিয়ে থাকা নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে; মানুষটাকে দেখতে পায় না। আবার ঘুমিয়ে থাকা দেহের ভেতরের মানুষটা ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে। সে স্বপ্ন কখনো মানুষকে হাসায়, কখনো কাঁদায়। অদ্ভুত বিষয় হলো, ঘুমের মধ্যে দেখা অনেক স্বপ্ন জেগে উঠলেই আর মনে থাকে না। তখন মনে হয়- মানুষটা নিজে ঘুমায়, নাকি মানুষের ভেতরটায় আরেকটা মানুষ ঘুমায়। সব কিছু বিজ্ঞানের ভাবনা দিয়ে দেখতে হবে, এটা যেমন সত্য- তেমনি বিজ্ঞানের বাইরে এসে সমাজতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, দর্শনতত্ত্ব দিয়েও বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হয়। আবার অনেক সময় এসব জ্ঞানতত্ত্বের মধ্য থেকে বেরিয়ে এসে সাহিত্য দিয়েও বিষয়গুলোকে ভাবা যেতে পারে। তবে সাধারণ মানুষও যদি ইতিবাচকভাবে এ বিষয়গুলো ভাবতে ভাবতে কোনো নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়, তা হলে সচরাচর চিন্তার বাইরের বিষয়গুলোও মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার শক্তি রাখে। সবার ভাবনা যে একই রকম হবে, তা নয়। তবে যে কোনো ভাবনার ক্ষেত্রে আবেগ ও যুক্তির মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে, এর কোনোটাই যাতে একটি অন্যটিকে অতিক্রম করতে না পারে। কিন্তু কখনো কখনো মানুষের কল্পনা আবেগ ও যুক্তি- কোনোটাকেই মানে না। সে ক্ষেত্রে কল্পনা যদি ইতিবাচক শক্তি হয়, তা হলে তাকে এগিয়ে নেওয়াই ভালো। একজন লেখক কল্পনাআশ্রিত হয়েই তার লেখাকে এগিয়ে নেন। একজন চিত্রশিল্পীর চিত্রকর্মগুলো কল্পনাশক্তির ওপর ভর করতে করতেই পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়। বিজ্ঞানের গবেষণার ক্ষেত্রে মৌলিক জ্ঞানের উদ্ভব ঘটে কল্পনাশক্তিতেই।

advertisement 4

খুব অদ্ভুত একটা বিষয়- মানুষ যা বলে, তা বিশ্বাস করে না; মানুষ যা বিশ্বাস করে, তা বলে না। ফরাসি চিত্রশিল্পী জোসেফ ডেজাইয়ার কোর্ট ১৮২৬ সালে ঝপবহব ভৎড়স ঃযব এৎবধঃ ঋষড়ড়ফ নামে ইতিহাসভিত্তিক একটি ছবি আঁকেন। মহাপ্লাবনের মতো বিপর্যয়ের মুহূর্তে মানুষের মনস্তত্বকে পরীক্ষা করা হয়েছে ছবিতে। পুরোটাই হয়তো কল্পনা। কিন্তু কল্পনা যেন বাস্তবতার মতো কঠিন সত্যের কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে একটা লোক তার সন্তান ও স্ত্রীর পরিবর্তে তার পিতাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। মমতাময়ী মা ডুবন্ত অবস্থাতেও তার সন্তানকে এক হাত দিয়ে উঁচুতে তুলে মহাপ্লাবন থেকে রক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখে লড়ছেন। লোকটার সবচেয়ে কাছে রয়েছে তার সন্তান, ঠিক তার পরে তার স্ত্রী, সবার থেকে দূরে অবস্থান করছে লোকটার বাবা। স্ত্রী ও সন্তান লোকটার খুব কাছাকাছি। তাদের বাঁচানোটা যতটা সহজ, ঠিক ততটাই কঠিন তার বাবাকে বাঁচানো। তার পরও লোকটা তার বাবাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। একটা জলরঙে আঁকা সরল ছবি। অথচ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সেখানে কতটা জটিল মেরুকরণ- যেখানে বলা, না বলা অনেক কথাই হয়তো বিশ্বাসের পরীক্ষায় উতরে যাচ্ছে কিংবা অবিশ্বাসের পরীক্ষায় ডুবে মরছে। কেউ কেউ ছবিটার ব্যাখ্যায় বলছে- লোকটার সবচেয়ে কাছে ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে অবস্থান করছে তার সন্তান, বর্তমান হিসেবে অবস্থান করছে তার স্ত্রী, অতীত হিসেবে অবস্থান করছে তার বাবা। অতীত ক্রমেই ডুবতে ডুবতে তলিয়ে যাচ্ছে। তার পরও লোকটা তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে উপেক্ষা করে অতীতকে আঁকড়ে ধরেছে। লোকটা কি ভুল করছে? কে বড়- বাবা, সন্তান, নাকি প্রিয়তমা স্ত্রী; কোনটা গুরুত্বপূর্ণ- অতীত, বর্তমান, না ভবিষ্যৎ! সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেই। সব প্রশ্নের উত্তর থাকে না।

সাহসী একজন মাকে ছবিতে দেখা যাচ্ছে- যিনি নিজের জীবনের চেয়ে সন্তানের জীবনকে অনেক বড় ভেবেছেন। নিজে ক্রমেই ডুবছেন। তার পরও প্রাণপণে সন্তানকে বাঁচানোর প্রবল আকুতি যেন ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। ছবিটাকে অন্যভাবেও তো ভাবা যেতে পারে। লোকটা প্রথমে হয়তো সবচেয়ে ডুবন্ত বাবাকে বাঁচাতে চাইছেন। তার পর বাবাকে বাঁচিয়ে সন্তান ও স্ত্রীকে বাঁচাবেন। কিন্তু বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে সবকিছুই হারাবেন না তো! সবকিছুই ছবিটা ঘিরে অলীক কল্পনা। কল্পনা থেকেই চিন্তার জন্ম হয় এভাবে প্রতিনিয়তই। কখনো কখনো একটা ছবি অনেক চিন্তার জন্ম দেয়, অনেক সময় চিন্তাকে কেড়ে নিয়ে মানুষকে নিস্তব্ধ করে দেয়।

যে যার অবস্থান থেকে তার মতো করে ছবিটার ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করে হয়তো বা। তবে চিন্তার বৈচিত্র্য যেখানে থাকে, সেখানে মানবিক মূল্যবোধের অনেক উপাদান মানুষকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেই প্রশ্নবিদ্ধ মানুষ অনেকটা বুলেটবিদ্ধ আহত মানুষের মতো হয়। একটা আহত মানুষ যন্ত্রণাকে বোঝে। আনন্দ যা পারে না, যন্ত্রণা তা পারে। আনন্দে মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে, যন্ত্রণায় মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়। মানুষ কি তা হলে যন্ত্রণায় বর্তমান ও ভবিষ্যতের চেয়ে অতীতকে খোঁজে বেশি?

সম্প্রতি কানাডার ভেনকুয়া জেনারেল হাসপাতালে ৮৭ বছর বয়স্ক এক রোগীর মস্তিষ্কের তরঙ্গ পরিমাপ করার সময় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। খুব অপ্রত্যাশিতভাবে মৃত্যুর সময়ের ঘটনাপ্রবাহ রেকর্ডিং হয়ে যায় ইলেকট্রো এনসেফালোগ্রাফি নামক যন্ত্রে। গবেষকরা সেটি বিশ্লেষণ করে দেখেন, এই সময় মস্তিষ্কের তরঙ্গ সংকেত স্বপ্ন দেখা বা স্মৃতিচারণা করার সময় উৎপন্ন হওয়া তরঙ্গ সংকেতের মতো- যেটি প্রমাণ করছে, মৃত্যুর মুহূর্তে অতীতের স্মৃতি মানুষের মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এজিং নিউরোসায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধে এ ধরনের অবস্থাকে অন্তিম স্মৃতিচারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

খুব অদ্ভুত একটা বিষয়, মানুষ মৃত্যুর আগে তার অতীতকে দেখতে পায়। অতীত কেন্দ্র করেই মানুষের স্মৃতি তৈরি হয়। হয়তো অতীত ভালো হলে মানুষের মৃত্যুটা আনন্দের স্মৃতিগুলোকে হাতড়িয়ে বেড়ায়। যদি বিপরীতটা ঘটে, তা হলে হয়তো স্মৃতিগুলো মানুষকে অনুশোচনায় দগ্ধ করে। মৃত্যুটা সুখের হবে অতীতের সুকর্মে, মৃত্যুটা দুঃখের হবে অতীতের কৃতকর্মে। অথচ গবেষকরা খুঁজছেন অন্য কিছু। এই গবেষণা তাদের ভাবাচ্ছে, মানুষের মৃত্যু কখন হয়- হৃদয়স্পন্দন বন্ধ হলে, নাকি মস্তিষ্কের ক্রিয়া বন্ধ হলে? সক্রেটিস মেথডের মতো প্রশ্ন করতে করতে উত্তরগুলো পাওয়া যাবে কি কখনো!

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও লেখক; ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

advertisement