advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মুন্সীগঞ্জে বন্ধ হচ্ছে না কারেন্ট জালের ব্যবসা

নাদিম হোসাইন, মুন্সীগঞ্জ
২৪ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২২ ১১:৫১ পিএম
advertisement

শত শত অভিযানের পরও মুন্সীগঞ্জে বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ কারেন্ট জাল উৎপাদন। খোদ মৎস্য কর্মকর্তারাই বলছেন, অভিযান চালিয়ে ১০টি কারেন্ট জাল উৎপাদনের কারখানা বন্ধ করা হলে নতুন করে গজিয়ে উঠছে ১৫টি। একেকটি অভিযানে কোটি কোটি টাকার কারেন্ট জাল জব্দ করা হলেও উৎপাদন হচ্ছে শতকোটি টাকার অবৈধ জাল, যা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু অবৈধ কারেন্ট জাল (মনোফিলামেন্ট) উৎপাদন করেই বহু লোক শূন্য থেকে শিল্পপতি বনে গেছেন। এই বাড়বাড়ন্ত অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পঞ্চসর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সদ্য গ্রেপ্তার হওয়া গোলাম মোস্তফা ও তার ভাই গোলাম কিবরিয়া। জেলায় বছর বছর বাড়তে থাকা অবৈধ কারেন্ট জালের কারখানার সংখ্যা মৎস্য অফিসের কাছে জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু পঞ্চসার ইউনিয়নেই এমন কারখানার সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

advertisement

অভিযোগ রয়েছে, দেশের মৎস্যসম্পদের ধ্বংস ডেকে আনা কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানগুলো কার্যকর না হওয়ার কারণ হচ্ছে, অভিযানের আগেই প্রভাবশালী কারখানা মালিকরা খবর পেয়ে যান। ফলে যে পরিমাণ কারেন্ট জাল উৎপাদন হয়ে থাকে- এর ১০ ভাগের ১ ভাগও জব্দ করা হয় না। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ও পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এই কারবার চলে আসছে।

advertisement 4

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১১ মাসে প্রায় ১৫ কোটি মিটার কারেন্ট জাল জব্দ ও ১০০টির বেশি মামলা রুজু হয়েছে। গত কয়েক বছরে জেলা মৎস্য অফিস, কোস্টগার্ড, ডিবি পুলিশ, র‌্যাবসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল ও ববিন জব্দ করে। এসব অভিযানের কারণে পুলিশের বিরুদ্ধে গোলাম কিবরিয়ার নেতৃত্বে মানবন্ধন কর্মসূচিও দেখা গেছে। তবে কথা

উঠেছে পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলে কারেন্ট জাল উৎপাদন।

স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পঞ্চসারের শত শত অবৈধ কারখানার মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি করখানায় অভিযান চালানো হয়। তারা জানান, যেসব কারখানায় অভিযান চালানো হয়ে থাকে, সেখানে আগে থেকেই কারখানার মালিকরা খবর পেয়ে যায়।

নাম প্রকাশে কয়েকজন কারেন্ট জাল কারখানার মালিক জানান, দিনের বেলায় কারখানায় কাজ চলে থেমে থেমে। রাতে কাজ চলে পুরোদমে। চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা ও তার ভাইয়ের ইস্ত্রি করার কারখানায় তৈরিকৃত কারেন্ট জাল নিয়ে ইস্ত্রি করা হয়। যদি তাদের আয়রন মেশিনে আয়রন না করা হয় তাতে বাধে বিপত্তি। এর পর থেকেই চলে অভিযান। তারা বলেন, ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, তাদের আওতার বাইরে যাওয়া মুশকিল।

সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান মোস্তফার আপন চাচাতো ভাই জেলা বিএনপির আহ্বায়ক, সাবেক এমপি ও মন্ত্রী আব্দুল হাই ও তার ছোট ভাই মো. মহিউদ্দিন আহম্মেদ এক সময় এসব নিয়ন্ত্রণ করতেন। ক্ষমতার পালা বদলে বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা আওয়ামী লীগে যোগদান করে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর থেকেই চেয়ারম্যান নিজেই এর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এই ইউনিয়নের প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কারেন্ট জালের কারখানা রয়েছে। প্রতিটি কারেন্ট জালের কারখানাকে মাসিক দুই থেকে তিন হাজারেরও বেশি টাকা চাঁদা দিতে হয়। এ নিয়ে চেয়ারম্যান মোস্তফকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পঞ্চসার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তফার অবৈধ ক্ষমতাবলে পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে প্রকাশ্য দিবালোকে জেলার হাটবাজারে এখনো অবাধে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত কারেন্ট জাল। মোস্তফার নেতৃত্বে পঞ্চসার ইউনিয়ন থেকে শুরু করে এখন গোটা জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ কারেন্ট জালের কারখানা। কেউ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই তার বিরুদ্ধে চলে মামলা-হামলাসহ নানা ধরনের ঘটনা। এমনকি অনেককে তার পালিত সন্ত্রাসী বাহিনী তুলে নিয়ে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালায়।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শামশুল করিম বলেন, অবৈধভাবে কারেন্ট জাল তৈরির কারখানাগুলোতে নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়। গেল ১১ মাসে প্রায় ১৫ কোটি মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়। এসব কারেন্ট জাল উদ্ধারে প্রায় ১০০টিরও বেশি মামলা হয়েছে। কারখানাগুলোকে সিলগালা ও লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনও থাকে। আমরা একত্রে অভিযান পরিচালনা করে থাকি। তবে কতগুলো কারেন্ট জালের কারখানা রয়েছে তার তালিকা করা সম্ভব নয়। অভিযানে ১০টি কারখানা বন্ধ বা সিলগালা করলে অন্য জায়গায় নিয়ে আরও ১৫টি কারখানা তৈরি করে। কারেন্ট জালের বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স দেখিয়ে থাকি।’

নৌপুলিশের পুলিশ সুপার (নারায়ণগঞ্জ অঞ্চল) মিনা মাহমুদা জানান, ‘অবৈধ কারেন্ট জালের তৈরির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমরা প্রতিবছর বিভিন্ন অবৈধ কারেন্ট জাল তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়েছি। এখানে কে ক্ষমতাশীল দলের নেতা, কে চেয়ারম্যান, কে মেম্বার তা দেখব না। আইন তার নিজের গতিতেই চলবে।’

গত রবিবার অবৈধ কারেন্ট উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত থাকার পাঁচটি মামলায় ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা ও মোশারফ হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চেয়ারম্যান মোস্তফার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুদ আলম জানান, মৎস্য সংরক্ষণ আইনে দায়েরকৃত ৫ মামলায় হাইকোর্টের আগাম জামিনের পরিপ্রেক্ষিতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা জেলা কারাগারে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তার ভাই গোলাম কিবরিয়া আমাদের সময়কে বলেন, ‘বর্তমানে এসবের মধ্যে আমি নাই। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে কয়েকটি মামলা হয়েছে তা মিথ্যাও হতে পারে। বর্তমানের আমি কোনো কিছুর সঙ্গে জড়িত নই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারেন্ট জাল উৎপাদনকারী আমাদের সময়কে বলেন, ‘আগে আমরাও ব্যবসা করতাম। চেয়ারম্যান মোস্তফার যন্ত্রণায় ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছি। চেয়ারম্যান পুলিশ দিয়ে হয়রানি করে। মামলা করে। পুলিশ তার কথা শোনে।’

ক্ষমতার নেপথ্যে : বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও তার ছেলে পৌর মেয়র হাজী মোহাম্মদ ফয়সাল বিপ্লবের অনুসারী। গোলাম মোস্তফার ছোট ভাই গোলাম কিবরিয়া মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের অনুসারী। ফলে দুই ভাইয়ের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বও রয়েছে। আগে দুই ভাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ডালিয়া মোস্তফার বাবা মরহুম সাবের হাজি তিনিও কারেন্ট জাল ও আয়রন মেশিনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ডালিয়া মোস্তফাসহ তার দুই ভাই মিলে এ ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

জানা গেছে, এই অবৈধ জাল উৎপাদনের ব্যবসা করে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক এমপি আব্দুল হাইয়ের ছোট ভাই সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. মহিউদ্দি আহমেদ, পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, রামপাল ইউনিয়নের বাসিন্দা বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হোসেন পুস্তি, মিল্লাত হোসেনসহ আরও অনেকই এখন শিল্পপতি। অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবসা করেই তারা শিল্পপতি হয়েছেন বলেন একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। তবে সবাইকে ছাপিয়ে বর্তমানে ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা অবৈধ কারেন্ট জালের নিয়ন্ত্রক। তার বাইরে গেলেই চলে হুমকি-ধমকি।

advertisement