advertisement
advertisement
advertisement

করোনাকালে ছুটি ঘোষণার পর কাজের সুযোগ হয়নি আজও

ওয়াহিদুল ইসলাম ডিফেন্স, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)
২৫ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২২ ০৯:১৭ এএম
advertisement

দেশে করোনার প্রকোপ দেখা দিলে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির শ্রমিকদের ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে খনি সচল করতে দেশীয় ১০৪৫ জন শ্রমিকের মধ্যে পর্যায়ক্রমে পাঁচশ জনকে কাজে নেওয়া হয়। বাকি ৫৫৪ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। এর পর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শ্রমিকরা কর্মস্থলে যোগদানসহ করোনাকালীন বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে টানা এক মাসব্যাপী আন্দোলন করেন। দফায় দফায় আলোচনা শেষে খনি কর্তৃপক্ষ পর্যায়ক্রমে শ্রমিকদের কাজে যোগদানের আশ্বাস দেয়। কিন্তু ঘুরেফিরে ওই পাঁচশ শ্রমিক দিয়েই কাজ করাচ্ছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএমসি-এক্সএমসি কনসোর্টিয়াম। বাকিরা কাজে যোগদান করতে পারেননি আজও। জানা যায়, দেশে করোনা সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ সরকার প্রথম সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এপ্রিল মাসে দেশে লকডাউন দেওয়া হয়। ওই বছরের ২৬ মার্চ কয়লা খনি ছুটি ঘোষণা করা হয়। কোয়ারেন্টিনে যেতে খনি থেকে বের করে দেওয়া হয় দেশীয় সব শ্রমিককে। ওই সময় শ্রমিকদের ৪ হাজার টাকা ভাতা এবং দেড় হাজার টাকা রেশন বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু শ্রমিকদের অভিযোগ, অনেকেই শুধু রেশন বাবদ দেড় হাজার টাকা পেলেও ভাতার ৪ হাজার টাকা পাননি।

advertisement

মো. রহিম উদ্দিনসহ খনির অন্য বেকার শ্রমিকরা জানান, করোনা-পরবর্তী সময়ে সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী সব

advertisement 4

সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান আগের মতোই চালু হয়েছে। অজ্ঞাত কারণে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে তাদের যোগদানের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ ।

খনির এক সময়ের শ্রমিক আবুল কালাম (৩৮) বলেন, ‘বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কারণে বাপ-দাদার শেষ সম্বল জমি গেছে। জমির টাকার জন্য জেলও খাটতে হয়েছে। একমাত্র সম্বল ছিল খনির শ্রমিকের কাজ। করোনার কারণে সেই চাকরি হারিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে এখন ভ্যান চালিয়ে।’

আবুল কালামের বাড়ি ছিল খনি সংলগ্ন জিগাগাড়ী গ্রামে। খনির জন্য তার ২০ শতক জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। ক্ষতিপূরণের জন্য মাত্র ৮ লাখ টাকা পেলেও নিজের পৈতৃক জয়গা ছেড়ে অন্যত্র বাড়ি করতে খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকা। এতে বাড়তি ঋণের বোঝা চেপেছে মাথায়। ছিল একমাত্র সম্বল কয়লা খনির চাকরি। দুই বছর আগে করোনার কারণে তাও হারাতে হয়েছে।

আবুল কালাম আরও বলেন, দেশে করোনা মহামারীর ভয়াবহতা কমে সবকিছু স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু করোনার কথা বলে, কোয়ারেন্টিনের বাহানায় আমরা বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ৫৪৫ জন শ্রমিক আজও বেকার হয়ে পড়েছি। এতে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. জাকির হোসেন বলেন, খনির শুরু থেকে আমরা কাজ করে আসছি। প্রায় দুই যুগ ধরে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেশি শ্রমিকদেরকে জিম্মি করে কাজ করাচ্ছেন। তারা শ্রমিকদের কোনো দাবিদাওয়া মানছেন না। আন্দোলন করতে গেলে চীনা কোম্পানি ও খনি কর্তৃপক্ষ উল্টো শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করছেন। শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করলেও তাদের কাজে যোগদানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি আজও।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে মতে, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে আহরিত কয়লা দিয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। যা জাতীয় গ্রিডে সংযোগ করা হয়।

এদিকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. জাফর সাদিক জানান, বর্তমানে খনিতে ৬৮০ জন দেশি শ্রমিক কয়লা উত্তোলনের কাজ করছেন। এ কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২২ নভেম্বর খনি থেকে রেকর্ড পরিমাণ কয়লা উত্তোলন হয়, যার পরিমাণ সাড়ে ৫ হাজার টনের বেশি। ফলে এই শ্রমিক দিয়ে কয়লা উত্তোলন ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

বেকার শ্রমিকদের নিয়োগের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে দক্ষ শ্রমিক নেওয়া হচ্ছে। কাজের বাইরে যেসব শ্রমিক আছেন তাদের দেড় হাজার টাকা রেশন বাবদ দেওয়া হচ্ছে।

বাদ পড়া শ্রমিকদের বিষয়ে জানতে চাইলে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভালো। দক্ষ শ্রমিক বাছাই করে পর্যায়ক্রমে কাজে যোগদান করাচ্ছেন। বর্তমানে খনি থেকে দিনে ৫ হাজার টনের ওপর কয়লা উত্তোলন হচ্ছে। যা দিয়ে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সচল রাখা সম্ভব। কারণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার টন কয়লার প্রয়োজন।’

করোনা পূর্ববর্তী সময় ১০৪৫ জন শ্রমিক দিয়ে যে পরিমাণ কয়লা উত্তোলন হতো বর্তামানে ৫শ শ্রমিক দিয়ে উৎপাদন কাজ ব্যাহত হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই সময় ১০৪৫ জন শ্রমিক থাকলেও কয়লা উত্তোলন কাজে সংযুক্ত থাকতেন ৬ থেকে ৭শ শ্রমিক। কাজেই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে না।’ করোনা পরিস্থিতি কাটিয়ে দেশের সব ক্ষেত্রে কর্মকা- স্বাভাবিক হলেও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কেন হচ্ছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি এড়াতে যা ভালো মনে করছে সেভাবেই কাজ করছে।’

advertisement