advertisement
advertisement
advertisement

ভ্যাপিং কি ধূমপানের চেয়েও ক্ষতিকর

ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান
২৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৩ ১০:১০ পিএম
advertisement

সিগারেটের পাশাপাশি ভ্যাপিংয়ের বিরুদ্ধেও সচেতনতা গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়। আইনি প্রতিবন্ধকতা, বিধিনিষেধের কঠোর প্রয়োগ, জনসচেতনতা তৈরিতে সবার সম্পৃক্ততাই পারে এই সমস্যাকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে‘ধূমপান বিষপান’ এই বাক্যটি সবাই জানেন। কিন্তু ‘ধূমপান’ শব্দটি এখন মাত্রা পরিবর্তন করে নতুন রূপ নিয়েছে, যা ই-সিগারেট বা ভ্যাপিং নামে সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। ই-সিগারেট বা ভ্যাপিং সম্পর্কে অনেকের সঠিক ধারণা নেই। অনেকের ধারণা ধূমপান থেকে ই-সিগারেট বা ভ্যাপিং নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবতা কী?

সিগারেটের বিকল্প হিসেবে দিন দিন অনেকেই ঝুঁকছেন ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ে (ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মাধ্যমে ধূমপান)। তাদের যুক্তি এটি সাধারণ সিগারেটের তুলনায় কম ক্ষতিকর। তবে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ই-সিগারেট এখনো নিরাপদ নয়। বরং জাপানে একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে দশগুণ বেশি ক্ষতিকারক। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, ভ্যাপিং করলে স্ট্রোকের ৭১ শতাংশ, হার্ট অ্যাটাকের ৫৯ শতাংশ বা করোনারি হার্ট ডিজিজের ঝুঁকি বাড়ে ৪০ শতাংশ। আর তাই বিশে^র বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা ভেবে এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভারত, কানাডাসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে ই-সিগারেট উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে ই-সিগারেট সম্পর্কে বিধিনিষেধ বা কোনো বক্তব্য ছিল না। তবে সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ৬-এর ঙ-তে ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেমের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তুলে ধরে এগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা ইতিবাচক হিসেবে দেখছে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো।

advertisement

ভ্যাপিং কী? : ভ্যাপোরাইজার থেকেই ভ্যাপ বা ভ্যাপিং শব্দটির উৎপত্তি। বিশেষভাবে তৈরিকৃত যন্ত্রের সাহায্যে কোনো সল্যুশন বা জুসকে তাপের সাহায্যে অ্যারোসলাইজ করার প্রক্রিয়া হলো ভ্যাপিং। আর এই যন্ত্রটি হলো ই-সিগারেট। মূলত সিগারেট থেকে দূরে থাকার জন্যই বিগত কয়েক বছরে ই-সিগারেটের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে এখনকার তরুণ সমাজ। কিন্তু তাই বলে ই-সিগারেট ব্যবহার বা ভ্যাপিংকে নিরাপদ বলে ধরে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই মোটেও। বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করে এর কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর প্রভাব সাধারণ সিগারেটের চেয়েও ক্ষতিকারক বলে দাবি করছেন তারা।

advertisement 4

সিগারেটের মতোই দেখতে ফাইবার বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এই ব্যাটারিচালিত যন্ত্রগুলোর মধ্যে একটি প্রকোষ্ঠ থাকে। তার মধ্যে ভরা থাকে বিশেষ ধরনের তরল মিশ্রণ, যার মধ্যে নিকোটিন, প্রোপাইলিন গ্লাইকল অথবা ভেজিটেবল গ্লিসারিন এবং সুগন্ধি মিশ্রিত থাকে। যন্ত্রটি গরম হয়ে ওই তরলের বাষ্পীভবন ঘটায় এবং ব্যবহারকারী সেই বাষ্প টেনে নেয় ফুসফুসে, যা ধূমপানের অনুভূতি দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ড্রাগ অ্যাবিউজের তথ্য মতে, ভ্যাপিংয়ের ফলে ডোপামিন নিঃসরণের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং যা মস্তিষ্কের কাছে প্রশান্তিদায়ক অনুভূতি পৌঁছে দেয়। এতে করে খুব সহজেই মস্তিষ্ক ভ্যাপরকে তার প্রশান্তিদায়ক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে এবং তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। এ ছাড়া এই যন্ত্রটিতে একটি ব্যাটারি রয়েছে, যা বিস্ফোরণ হয়ে মৃত্যুও হতে পারে। এমন ঘটনার নজিরও রয়েছে।

ই-ভ্যাপিংয়ে কি নিকোটিন আছে : ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত এর মধ্যে থাকা নিকোটিনের পরিমাণ নিয়ে। ই-সিগারেটের প্রধান উপকরণ নিকোটিন থেকে দ্রুত আসক্তি তৈরি হয়। সিগারেট ছাড়তে চেয়ে যারা এটি ব্যবহার করেন তাদের এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা থেকে দেখা দিতে পারে ফুসফুসের বিভিন্ন অসুখ। তবে ই-সিগারেটের মধ্যে থাকা নিকোটিন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে অনেকদিন থেকেই। প্রশ্ন উঠেছে, এভাবে সরাসরি নিকোটিন ব্যবহার আদৌ করা যায় কি না? আইন মোতাবেক নিকোটিন ‘শিডিউল কে’ ড্রাগ এবং এর সরাসরি ব্যবহারের মাত্রা ২ থেকে ৪ মিলিগ্রাম। তাও নিকোটিন ছাড়ানোর চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে লজেন্স অথবা চুইয়িংগামের মধ্যে ওই নির্দিষ্ট মাত্রার নিকোটিন ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু ই-সিগারেটে যেভাবে রাসায়নিক নিকোটিন ব্যবহার করা হয় তা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি নয় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে মৃত্যু হতে পারে বলে জানাচ্ছেন তারা।

ভ্যাপিং থেকে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি

তরল যে উপাদানটি এখানে ব্যবহৃত হয় এর থেকে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, এর মধ্যে থাকা এই রাসায়নিকগুলো থেকে সাধারণ সিগারেটের ধোঁয়ার সমপরিমাণ ফরমালডিহাইড উৎপন্ন হয়। এ ছাড়া ই-সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকে অতিসূক্ষ্ম রাসায়নিক কণা (যেমন নিকোটিন) যা ভীষণ ক্ষতিকারক। এর থেকে গলা-মুখ ও ফুসফুসে ক্যানসার হতে পারে।

ভ্যাপিং থেকে ফুসফুসের ক্ষতি : ভ্যাপিংয়ের ফলে খুব সূক্ষ্মভাবে ফুসফুসের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের সৃষ্টি হয়। যা থেকে ইনফেকশনের সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি। ২০১৯ সালের একটি গবেষণার ফলাফল থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ভ্যাপিং থেকে শ^াসকষ্টযুক্ত কাশি ও বক্ষব্যাধির নানা ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। অন্তত ৩০ হাজার নিয়মিত ই-সিগারেট ও ধূমপায়ীদের ওপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যারা ভ্যাপিং বা ধূমপান করে না তাদের তুলনায় যারা করে তাদের ফুসফুসজনিত সমস্যাগুলো প্রকট। বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ডেভিড থিকেট একটি গবেষণায় বলেন, ভ্যাপিং বা ই-সিগারেট ব্যবহারের ফলে ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধকারী কোষ অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং প্রদাহের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকান জার্নাল অব রেসপিরেটরি অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের এক গবেষণায় জানা গেছে, ই-সিগারেটের নিকোটিনে শুধু শ^াসনালির মিউকাসের ক্ষতিই করে না, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

ভ্যাপিং থেকে হৃদরোগের প্রাদুর্ভাব : যেহেতু ই-সিগারেট ব্যবহারকারীরা ধরেই নেয় এতে তাদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই, তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা অতিরিক্ত ভ্যাপিং করে। যা প্রবলভাবে হৃদযন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও সাডেন কার্ডিয়াক ডেথের মতো গুরুতর সমস্যাও দেখা দিতে পারে ভ্যাপিংয়ের ফলে। ভ্যাপিং থেকে নিঃসৃত নিকোটিন উচ্চরক্তচাপ তৈরি করে ও কোলেস্টেরলের মাত্রায় অসামঞ্জস্যতা তৈরি করে। যা খুব সহজেই হৃদযন্ত্রকে নাজুক অবস্থায় ফেলে দেয়। ২০১৭ সালের ন্যাচার রিভিউ কার্ডিওলজির তথ্যানুসারে, সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত যতজন ই-সিগারেট ব্যবহারকারী হৃদরোগের বিষয়ে জানিয়েছে, পরীক্ষা করে দেখা গেছে সব সমস্যা তৈরি হয়েছে নিকোটিন থেকে। এ ছাড়া ২০১৯ সালের একটি গবেষণার তথ্য জার্নাল অব অ্যামেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজিতে প্রকাশ হয়। যেখানে জানানো হয়, ই-সিগারেটে ব্যবহৃত তরল থেকে রক্তনালির কোষের অকার্যকারিতা তৈরি করে, যা থেকে হৃদরোগের সৃষ্টি হয়।এ ঝুঁকি নির্মূলের জন্য বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তামাক নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সবাই সমন্বিতভাবে সে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে। সিগারেটের পাশাপাশি ভ্যাপিংয়ের বিরুদ্ধেও সচেতনতা গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়। আইনি প্রতিবন্ধকতা, বিধিনিষেধের কঠোর প্রয়োগ, জনসচেতনতা তৈরিতে সবার সম্পৃক্ততাই পারে এই সমস্যাকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে।

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ ও কোষাধ্যক্ষ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়

advertisement