রাবিতে নিয়োগ পাওয়া ১৪১ জনের যোগদান স্থগিত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও রাজশাহী ব্যুরো
৯ মে ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৮ মে ২০২১ ২৩:৫০

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বিদায়ী উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের শেষ কর্মদিবসে অস্থায়ী ভিত্তিতে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়াদের যোগদান কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তির অনুলিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তবে এ নিয়োগকে যৌক্তিক এবং নিজ দায়িত্বেই দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান। গতকাল শনিবার বিকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে গণমাধ্যমে ব্রিফিংয়ে তিনি এ দাবি করেন।

এদিকে রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৬ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পত্রের মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৫ ও ৬ মে ইস্যু করা অ্যাডহক ভিত্তিতে সব নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এ বিষয়ে তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি কমিটি করেছে। তাই তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এসব নিয়োগপত্রের যোগদান এবং তৎসংশ্লিষ্ট সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে অনুরোধ করা হলো।

এর আগে ৬ মে (নিয়োগপত্রে ৫ মে) অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান একসঙ্গে ১৩৭ জনকে অ্যাডহকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেন। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়োগ অবৈধ আখ্যা দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গতকাল ওই কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তাদের তদন্তকাজ চালায়। কমিটির সদস্যরা বিদায়ী উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের সঙ্গেও কথা বলেছেন।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদায়ী উপাচার্য এম আবদুস সোবহান তার মেয়াদের শেষ কর্মদিবসে বিভিন্ন পদে অবৈধ ও বিধিবহির্ভূতভাবে জনবল নিয়োগ দেন বলে অভিযোগ। আর সেই নিয়োগপত্রে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালামের পরিবর্তে উপাচার্যের নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন সংস্থাপন শাখার উপ-রেজিস্ট্রার মো. ইউসুফ আলী। গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালাম জানান, তিনি অবৈধ নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর না করতে নিয়োগের আগের দিন আত্মগোপনে গিয়েছিলেন।

এদিকে মন্ত্রণালয় বলছে, এই অবৈধ জনবল নিয়োগের বৈধতার সুযোগ নেই। এ জন্য এই অবৈধ নিয়োগ ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রণালয়। ওই কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান বলেন, ‘২০১৩ সালের পর ২০২১Ñ এই আট বছরে কোনো নিয়োগ হয়নি। আমরা নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম, হঠাৎ করে এর মধ্যে করোনা চলে আসে। তখন নিয়োগ বন্ধ করে দিই। এরপর ক্যাম্পাসে গুঞ্জন শোনা যায় কিছু শিক্ষকের মুখে, তারা বলতে থাকে যে, এ নিয়োগ দেওয়া যাবে না, মন্ত্রণালয় থেকে নিষেধাজ্ঞা আসবে। সেটা অবশেষে সত্য হলো। ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ সকালে আমার কাছে ই-মেইল আসে। আমি বিষ্মিত হলাম। যারা ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছিল তারা কীভাবে জানলো যে, নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে? গুঞ্জনটা সত্যে পরিনত হলো, আমি তাদের (মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি) বলেছি এই কথা। আমরা যখন ভাইভা নিব তখন নিষেধাজ্ঞা আসে।’ তিনি বলেন, ‘২০০টি পদে আমরা বিজ্ঞাপন করেছিলাম, যারা প্রার্থী ছিল তাদের সমস্ত কিছু হয়ে গিয়েছিল। শুধু ভাইভা বাকি ছিল। সুতরাং তারা ডিজার্ভ করে এটা।’

সাবেক উপাচার্য মনে করেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য শুধু এ নিয়োগ না, আরও নিয়োগ না দিলে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যহত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়বে। কিন্তু কিছু শিক্ষক শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করেছে- বিশ্ববিদ্যালয় অচল করার, স্বাভাবিক কাজকর্ম চলতে না দেওয়ার। সেটাকে এনকারেজ করা হয়েছে, আমি বলেছি তাদের (মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি) একথা। যখনই কোনো অভিযোগ এখান (বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে গেছে, সেটার সত্যতা না জেনেই, আমার সঙ্গে কথা না বলেই; আমাকে ডেকে বলতে পারতোÑ এই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপার আপনার বক্তব্য কী? তদন্ত কমিটি করেছে আমার সঙ্গে কোনো কথা নেই।’

মানবিক কারণে নিয়োগ দিয়েছেন জানিয়ে রাবির সদ্য সাবেক এ উপাচার্য বলেন, ‘এখানে যারা এ নিয়োগটা ডিজার্ব করে তারাই পেয়েছে। আমি মানবিক কারণে, জীবনযাত্রা তাদের ব্যাহত হচ্ছিল। কারণ তাদের প্রত্যেকেই অনার্স-মাস্টার্স পাস। তারা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির চাকরি করবে, আমি মনে করি এটা যৌক্তিক। তারা আওয়ামী পরিবারের সন্তান, তাদের ক্রমাগত দাবি ও চাপ আমি মানবিক বোধ করেছি; তাদের চাকরি পাওয়া উচিত। তাদের চাকরি দিয়েছি কেউ আমাকে বলেনি।’

নিয়োগে আইনি বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩ এর ১২(৫) ধারা অনুসারে নিয়োগ হয়েছে। এ বিষয়ে অন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা এলে সেটি বাতিল হওয়া উচিত। কারণ এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পষ্ট আইন আছে। আগের ৫৪০ নিয়োগ ও বিভিন্ন মাস্টারোল নিয়োগ টিকে আছে। আমি মনে করি, এটি যৌক্তিক তাই নিজ দায়িত্বে দিয়েছি। এটি না টিকার কোনো কারণ দেখি না।’

তদন্ত শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিংয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউজিসি যে তদন্ত কমিটি করেছে আমরা সে তদন্তে এখানে এসেছি। আমরা চাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হবে শিক্ষা এবং গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। আমরা চেয়েছি স্বল্প সময়ের মধ্যে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মন্ত্রনালয়ে জমা দিতে পারি। এরজন্য আমরা এরসাথে সকলের সঙ্গে কথা বলেছি, সমস্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। আমরা বিষয় গুলো বিশ্লেষণ করে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে জমা দিব। আশাকরি নিদিষ্ট সময় আগামী ৭ দিনের মধ্যে আমরা তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে পারবো।’ এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. মো. আবু তাহের, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. মো. জাকির হোসেন আখন্দ ও ইউজিসির পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান।

দুর্নীতির কারণে সাবেক উপ-উপাচার্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে লিগ্যাল নোটিশ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ঢাকাস্থ অতিথি ভবনের জন্য জমি ক্রয় সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্য দায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহানসহ সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে উপাচার্য বরাবর লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন আদালত। নোটিশপ্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা না নিলে উপাচার্যের বিরুদ্ধেই দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নোটিশে জানানো হয়। গত শুক্রবার দুপুরে ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী গোলাম রব্বানী নোটিশটি পাঠান। গতকাল শনিবার নোটিশের কপি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে এসেছে।

নোটিশে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহানের নেতৃত্বে ঢাকাস্থ অতিথি ভবনের জন্য জমি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। সেই ঘটনা তদন্তের জন্য গত ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের সাধারণ সভার ৩৪ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। সার্বিক তদন্ত ও পর্যালোচনা শেষে পর্যবেক্ষণসহ চৌধুরী সারওয়ার জাহানের নেতৃত্বে জমি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটিকে দায়ী করে গত ২০১৮ সালের ২৮ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করে ওই কমিটি।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রফিকুল হাসানের আইনগত মতামত উপেক্ষা করে ঢাকাস্থ অতিথি ভবনের জন্য সাড়ে ৩ কোটি টাকায় জমিটি কেনা হয়, যার সাফ কবলা দলিল করা হয় গত ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর। কিন্তু দলিল রেজিস্ট্রেশনের ৩৭ দিন পরে জমির প্রকৃত ক্রয়মূল্য গোপন করে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে সেই মূল্য ১১ কোটি দেখিয়ে বিক্রেতার সঙ্গে একটি অরেজিস্ট্রিকৃত চুক্তিপত্র বানানো হয়। এক্ষেত্রে চৌধুরী সারওয়ার জাহানের নেতৃত্বাধীন কমিটি সুস্পষ্টভাবে সাড়ে ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। আর সেই অপরাধ সংঘটনের দায়ে চৌধুরী সারওয়ার জাহান ও তার কমিটির সদস্যদের শাস্তির মুখোমুখি করা আবশ্যক। এ বিষয়ে রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।