advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ইয়াবা কারবার : ২০ রোহিঙ্গা মারা গেছেন ‘বন্দুকযুদ্ধে’

হাসান আল জাভেদ কক্সবাজার থেকে ফিরে
২৩ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০১৯ ০৮:২৮
প্রতীকী ছবি
advertisement

আত্মসমর্পণ পদক্ষেপের পরও থামছে না ইয়াবার চোরাচালান। বিকল্প পথ বের করেছে ইয়াবাকারবারিরা। অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী ইয়াবা কারবারে জড়িত হয়ে পড়েছে। নাফ নদ হয়ে ইয়াবা বহনের সময় রোহিঙ্গারা আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও ঘটেছে।

গত ১৮ জুলাই হোয়াইক্যংয়ে বর্ডারগার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আবুল হাশেম ও নূর কামাল নামে দুই রোহিঙ্গা মারা যান। বিজিবির ভাষ্য, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচারের সংবাদে হোয়াইক্যংয়ের লম্বাবিল সীমান্তে একটি টিম অবস্থান নেয়। ৪-৫ জন পাচারকারী নৌকায় বাংলাদেশের জলসীমায় পৌঁছলে বিজিবি জওয়ানরা তাদের চ্যালেঞ্জ করে। পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি জওয়ানরা তাদের ধাওয়া দেয়। ওঁৎ পেতে থাকা পাচারকারীরা অতর্কিতভাবে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে বিজিবি গুলি চালালে কুতুপালং এ/৩ এবং সি/১ ক্যাম্পের দুই রোহিঙ্গা শরণার্থী মারা যায়। তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেটসহ একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয়।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজারে ৪৯ রোহিঙ্গা শরণার্থী বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। এর মধ্যে ইয়াবা বহন বা কারবারের অভিযোগে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন ২০ রোহিঙ্গা সদস্য। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বলছে, ইয়াবা বহনে রোহিঙ্গারা নিত্যনতুন কৌশল নিচ্ছে।

এ ছাড়া কড়াকড়িতে রোহিঙ্গারা নিজ দেশের সীমান্তে ঘেঁষতে না পারলেও ইয়াবার বড় সরবরাহের অভিযোগ মিয়ানমার বর্ডারগার্ডের বিরুদ্ধেই। যে কারণে গত দুবছরে রোহিঙ্গাদের মধ্যে মাদক বহন বা কারবারের হার ঊর্ধ্বমুখী। এতে প্রায়ই নাফ নদ তীর, তার আশপাশের এলাকা, ক্যাম্পের প্রবেশমুখ বা প্রধান সড়কে ইয়াবার চালান ধরা পড়ছে। যদিও নাফ নদে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। আর বাহকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা।

পুলিশের তথ্য, ২০১৭ সালে ক্যাম্পের এ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মাদকের মামলা ছিল ২২টি, আসামি ৪০ জন। ২০১৮ সালে ৯৫ মামলায় ১৫৯ আসামি। মাদকের বিরুদ্ধে সারা দেশে যুদ্ধ অব্যাহত থাকার মধ্যেও এ বছরের ৯ মাসে ১২১ মামলায় ২১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশ ও মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, আগে শাহপরীর দ্বীপের ঘোলারচর, সাবরাং বা টেকনাফ পৌরসভার পেছন দিয়ে সরাসরি বেশিরভাগ ইয়াবার চালান আসত। কিন্তু এখন রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে ইয়াবা আসছে টেকনাফ উপজেলা হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা বক্কর মেম্বারের বাড়ির পূর্ব পাশে, জালিয়াদ্বীপ, আমির হামজা ঘাট, জাদিমুড়া, পূর্ব রঙ্গিখালী আনোয়ার চেয়ারম্যানের প্রজেক্টের উত্তর-দক্ষিণে।

একইভাবে উখিয়ার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালী মৌলভীবাজার ব্রিজ, হারিঙ্গাঘোনা তুলাতুলী, ঝিমংখালী বিজিবি চেকপোস্ট এলাকা, নয়াবাজার পূর্ব সাতঘরিয়া পাড়া, কানজর পাড়াকে ইয়াবা চালানের নিরাপদ রুট-পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পাচারকারীরা ভোরকে বেছে নেয়। এর পর স্থানীয় বাহকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, কক্সবাজার হয়ে ইয়াবা চোরাচালানের পুরনো রুটগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এখন বিকল্প হিসেবে রোহিঙ্গারা সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড় এবং নাফ নদ সাঁতরে-ডিঙ্গি নৌকায় করে কিছু কিছু ইয়াবা নিয়ে আসে। ক্যাম্পগুলোয় এসব ইয়াবা মজুদ রেখে সারাদেশে সরবরাহের চেষ্টা করছে। আমরা ইতোমধ্যে এমন অনেক চালান আটক করেছি। আশা করছি সমন্বিতভাবে এসব রুটও বন্ধ করতে পারব।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া মধুরছড়া ক্যাম্পের প্রবেশমুখ টমটম পার্কিংয়ে রেজোয়ান নামক রোহিঙ্গা যুবকের সঙ্গে বহন করা প্লাস্টিকের বস্তায় তল্লাশি করে ১৬ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে র‌্যাব। অভিযান পরিচালনাকারী র‌্যাব-১৫, সিপিএসসি কক্সবাজারের ডিএডি আনোয়ার হোসেন একটি মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, রেজোয়ান পলাতক এক আসামির প্ররোচনা ও সহযোগিতায় মাদকদ্রব্য ইয়াবা ট্যাবলেট ক্রয়-বিক্রয় করে আসছে।

সূত্র জানায়, অনেক সময় রোহিঙ্গারা স্থানীয় চক্রের সঙ্গে মিশেও ইয়াবা কারবার করছে। আটক রোহিঙ্গারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যেসব তথ্য দিচ্ছে তাতে স্থানীয় অনেকের নাম আসছে।

মধুরছড়া ক্যাম্প-৪, বি/৫ ব্লকের রোহিঙ্গা মাঝি (ক্যাম্প নেতা) হোসেন আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গারা ইয়াবা সেবন করে না। আবার সব রোহিঙ্গা মাদক কারবারি বা বাহকও নন। দু-একজন এতে জড়িত হলে কাদের কাছে বিক্রি করে সেটা খুঁজে বের করে সাজা হলেই সমস্যা কেটে যাবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নাফ নদ হয়ে ইয়াবা চোরাচালানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালীরা জড়িত। যাদের মধ্যে ১০২ জন আত্মসমর্পণ করেছেন। এ মুহূর্তে কক্সবাজার জেলা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে আত্মসমর্পণের চেষ্টা করছেন ৪০ জনের মতো। এর মধ্যে টেকনাফ-উখিয়ার সাবেক এমপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় থাকা ইয়াবার গডফাদার আবদুর রহমান বদির ভাই মৌলভী মুজিবুর রহমানও রয়েছেন। ইয়াবার বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরপরই মিয়ানমার পালিয়ে যান তিনি।

সম্প্রতি প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, ইয়াবা কারবারের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে টেকনাফের গহিন পাহাড়ের ঘাঁটিতে পলাতক হাকিম ডাকাত। প্রশাসন তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) কমিশনার মো. মাহবুবুর আলম তালুকদার আমাদের সময়কে বলেন, মানবিক কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিছু মানুষ মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত। অপরাধ প্রতিরোধ ও নির্মূলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা হচ্ছে।

advertisement