advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ওষুধের দাম বাড়ছেই মানুষ যাবে কোথায়

দীপংকর গৌতম
২৩ নভেম্বর ২০১৯ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০১৯ ১২:২৬ এএম
advertisement

আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র ভালো নয়। ভালো বলতে আমি বলতে চাইছি জনবান্ধব নয়। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের ভেতরে ডাক্তারভীতি আছে। ডাক্তারের দেখা পাওয়ার সময় টেস্ট, প্রেসক্রিপশনে বহু ওষুধ-ওষুধের দাম। সব মিলিয়ে ডাক্তারের কাছে সে যেতে চায় না। সংকট দেখা দিলে ওষুধের দোকানদারকে বলে। ওষুধের দোকানদার যেসব ওষুধ দিতে পারেন, সেসব টুকিটাকি। জ্বর, মাথাব্যথা ছাড়া অধিকাংশই পেটের পীড়াজনিত ওষুধ।

বারবার খেলে যদি ভালো না হয় বা বিছানায় পড়ে না যায়, তা হলে কোনো রোগী ডাক্তারের কাছ অবধি যেতে চায় না। যাদের কথা বলছি তারা দেশের মেহনতি মানুষ। যাদের শ্রম-ঘামে আমাদের দেশ চলে। উন্নয়নের চাকা ঘোরে। তারা হাতসম্বল মানুষ। দিনের পর দিন তাদের অর্থনীতি বদলায় না। দেশে উন্নয়ন হলে তার ছোঁয়া তাদের গায়ে লাগতে লাগতে তাদের জীবন ফুরিয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ ধনী হয়। বিশ্বের পরিসংখ্যানে দ্রুত ধনীর তালিকায় দেশের নাম যায়। সে খবর যাদের রাখার কাজ তারা রাখে। অথচ সহজ হিসাব হলো, হাজার মানুষ ধনী হতে হলে লক্ষ মানুষকে দরিদ্র হতে হয়। সেই লক্ষ-কোটি মানুষের জীবন দেখতে কারও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা একদম আলাদা। দিন দিন ওষুধের দাম বাড়ছে। শ্রমজীবী মানুষ, নিম্নবিত্ত সবার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ওষুধের দাম। এ নিয়ে কারও কোনো কথা নেই। কারও বক্তব্য কোথাও দেখা যায়নি।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যে চিত্র ওষুধের বাজারে, তা হলো ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড়সহ নানা ধরনের সুবিধা সরকার দিলেও এবং দেওয়া হলেও বাস্তবে এর সুফল মিলছে না। যাদের কথা ভেবে শুল্কছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তারা অর্থাৎ ভোক্তারা এর সুফল পাচ্ছে না। একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ওষুধের দাম। ওষুধের দাম বৃদ্ধির জাঁতাকলে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। ওষুধ খাতের উদ্যোক্তারা দাবি করেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ওষুধের দাম কম। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে ওষুধের দাম বাড়াতে হয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সম্প্রতি বলেছে, দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের তেমন কিছু করার নেই। পত্রিকান্তরে এ খবর প্রকাশ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার হস্তক্ষেপ না করলে এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ বা এসডিজি অর্জন করতে হলে অবশ্যই ওষুধের দাম কমাতে হবে। পাইকারি ওষুধের বড় বাজার মিটফোর্ডের ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলেছেন, রোগীদের বেশি প্রয়োজন হয় এমন ওষুধের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

গত পাঁচ বছরে অ্যান্টিবায়োটিক, ক্যানসার প্রতিরোধক, ইনসুলিনসহ বিভিন্ন ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই হাজারের বেশি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কাঁচামালে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত এবং কিছু কাঁচামালে শুল্ক কমানো হয়েছে। কিছু কাঁচামালের দাম বেড়েছে সত্য, তবে বাজারে ওষুধের দাম বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি হারে। জানা যায়, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড়ের সুবিধা পাওয়া বেশিরভাগ ওষুধের গত পাঁচ বছরে দাম বেড়েছে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। কোনো ওষুধের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।

আমাদের দেশে একটা দোকানে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ। অর্ধশতক ধরে এটা খাচ্ছিল গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ হিসেবে। কিন্তু কিছুদিন আগে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ হিসেবে পরিচিত রেনিটিডিন ট্যাবলেটে ক্যানসার জন্মানোর উপাদান পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে বিশ্বের শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী ব্রিটিশ সংস্থা গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে)।

এ কারণে বিশ্ববাজার থেকে ওষুধটি তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। ভারতের বাজার থেকেও রেনিটিডিন গ্রুপের জ্যানটেক নামের এই ট্যাবলেট প্রত্যাহারের বিষয়ে নিশ্চিত করেছে জিএসকে। কিন্তু বাজারে এখনো সয়লাব রেনিটিডিনে। তার ওপর দাম তো বেড়েছেই। গ্যাস্ট্রিক উপশমে ব্যবহৃত ওমিপ্রাজল গ্রুপের একটি ওষুধ উৎপাদনে ৬০ পয়সা ব্যয় হয়। কিন্তু এটি ৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। ম্যাক্সপ্রো ৪০ কিছুদিন আগেও যারা ৮০ টাকা দিয়ে কিনত, তারা এখন কিনছে ১০০ টাকায়। সব ওষুধই উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। ওষুধের বাজার নিয়ে বছরের পর বছর ধরে নৈরাজ্য চলছে। অথচ জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। যাদের অর্থ আছে তাদের সমস্যা হবে না সোনা দিয়ে ওষুধের পাতা মুড়লেও। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ জনগণ তো তারা নয়। তারা প্রেসার কন্ট্রোল না হলে বিদেশে যায় আর আমার দেশের উন্নয়নের চাকা যারা ঠেলে তারা মারা যায় ওষুধের অভাবে। এ কেমন বিচার? ওষুধে এখন নকল ভরা। ওষুধের গায়ে উল্লেখিত উপাদান দেশের বড় বড় কোম্পানির ওষুধে নেই। কোম্পানি নিষিদ্ধ করলেও আবার কীভাবে সব আগের মতোই থেকে যায়।

শেষ কথা, সরকারকে বিষয়টি আমলে নিতে হবে। গুটিকয়েক ওষুধ কোম্পানি মালিকের স্বার্থ রক্ষার জন্য জনস্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করা যাবে না। ওষুধের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে আনার পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে। নতুবা ডাক্তার, টেস্ট, ওষুধ সব সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর কি কোনো প্রতিকার নেই?

দীপংকর গৌতম : সাংবাদিক ও গবেষক

advertisement