advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘খাদের কিনারে’ রেখে গেলেন উপাচার্য আবদুস সোবহান

জাকির হোসেন তমাল
৬ মে ২০২১ ১৩:৩৩ | আপডেট: ৬ মে ২০২১ ২০:৫০
অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান
advertisement

উপাচার্য। অনেক সম্মান ও মর্যাদার একটি পদ। এই পদে স্থান পাওয়া অনেক মানুষকে যুগ যুগ ধরে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। সেই পদের মর্যাদা রাখার কারণেই সেই সম্মান তারা পেয়েছেন।

সেই তালিকা উজ্জ্বল করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ, স্যার এফ রহমান ও বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীরা। আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ইতরাৎ হোসেন জুবেরী ও অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমদরা। এই তালিকা হয়তো আরও অনেক দীর্ঘ হবে। এই মানুষরা জ্ঞানের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পবিত্র অঙ্গনে তাই তারা জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন।       

এসব এখন ইতিহাস। উপাচার্য পদটি এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য আর অযোগ্যদের চাকরি দেওয়ার যন্ত্রে তৈরি হয়েছে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা সম্প্রতি সেটাই দেখিয়েছেন।

উপাচার্য পদের সম্মান-মর্যাদা ১৮০ ডিগ্রিতে ঘুরে যাওয়া ঠিক কী কারণে, সেই পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি। সম্মানিত সেই পদে এখন কেন ‘কালিমা’ লাগছে, তার একটি ভালো কেস স্ট্যাডি হতে পারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সেই কাজে সহায়তা দেবে ইউজিসি’র তদন্ত কমিটির দীর্ঘ প্রতিবেদন, যার অনেক অংশ এরই মধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশও হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আজ তার মেয়াদের চার বছর শেষ করছেন। তিনি এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রধানের দায়িত্ব শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ‘ঘৃণা-অসম্মান’ আর মন্ত্রণালয় থেকে ‘প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ’ হিসেবে বিদায় নিচ্ছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর আচার্যকে ধোঁকা দিয়ে বড় ধরনের অনিয়ম করেন উপাচার্য এম আবদুস সোবহান। তিনি অবসরভাতার টাকা তুলে নিতে এমনটা করেন। এই বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রথম প্রতিবেদন করেছিলাম। সেই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে ঘটনাটি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

রাষ্ট্রপতিকে না জানিয়ে বিভাগ থেকে অবসর নেওয়ার মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেন এম আবদুস সোবহান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করে গেলেন তিনি। এর মাধ্যমে অনেক অযোগ্য ও কম যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়েছেন। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয় যে কতদূর পিছিয়ে গেল, সেটা হয়তো বুঝবে আগামী প্রজন্ম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্ষেত্রে অনিয়মের নিদর্শন রেখে গেলেন উপাচার্য এম আবদুস সোবহান। কেন্দ্রীয় মসজিদে ইমাম নিয়োগের বেলায়ও তার অনিয়ম বন্ধ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে হাফেজিয়া মাদ্রাসা তৈরিতে তিনি রেখেছেন অনিয়মের ছাপ। সেই প্রতিষ্ঠান নিজের নামে করেছেন। ‘বন্ধু-প্রিয়’ উপাচার্য সবখানেই নিজের পছন্দের লোকদের বসিয়ে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বরেন্দ্র মিউজিয়াম, বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ, মেডিকেল সেন্টারে অফিসার নিয়োগ থেকে সব ক্ষেত্রে এটার প্রমাণ রেখে গেলেন তিনি।

উপাচার্য এম আবদুস সোবহান বিশ্ববিদ্যালয়কে সব দিক থেকে খাদের কিনারে নিয়ে গেলেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় বেঁচে থাকে তার শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সামাজিক প্রভাবের ওপর। কিন্তু দুঃখজন, গত চার বছরে এসব ক্ষেত্রে অনেক দূর পিছিয়ে গেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি।   

গবেষণা-উদ্ভাবন ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি প্রকাশিক স্পেনের প্রতিষ্ঠান সিমাগো ইনস্টিটিউশন র‌্যাংকিং বলছে, ২০১৭ সালে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল তৃতীয়। পরের বছর তা একধাপ পিছিয়ে যায়। তার পরের বছর আরও একধাপ পেছায়। ২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান দাঁড়ায় ষষ্ঠতম। আর ২০২১ সালে উপাচার্যের বিদায়ের বছরে এসে সেই অবস্থান হয়েছে ১১তম।

এটাই উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের ‘অর্জন’। বিশ্ববিদ্যালয়কে একাডেমিকভাবেও অনেকটা পিছিয়ে নিয়ে গেলেন তিনি।

একটি বেসরকারি টিভিতে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে উপাচার্য বলেছিলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ‘জনপ্রিয়’। কোনো গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে তিনি এমনটা বলেছেন কি না, সেটা জানা যায়নি। তবে উপাচার্য সম্পর্কে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাবনা কী, তা  প্রতিনিয়তই দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

উপাচার্যের ‘ছত্রছায়ায়’ তার বাসভনের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সবার সামনে অসম্মান করার নজির থেকে গেল। একই সঙ্গে তালাবন্ধ উপাচার্যকে আমরা দেখলাম। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতারাই উপাচার্য বাসভবনে তালা দিলেন। উপাচার্যের বিদায় বেলায় তার বাসভবনের সামনে প্রকাশ্যে যখন চাকরিপ্রার্থীরা টাকা ফেরত চান, সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান কোথায় যায়?

বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানীয় রাজনীতির যে দাপট তৈরি হয়েছে গত চার বছরে, সেটা আগামী অনেক দিন ভোগাবে এই বিদ্যাপিঠকে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী কারও জন্যই এটা সুখকর হবে না। এই উপাচার্যের পর নতুন কেউ হয়তো দায়িত্ব পাবেন, তিনি যেই হোন না কেন-বিশ্ববিদ্যালয়কে এই খাদের কিনার থেকে টেনে তুলতে পারবেন বলে মনে করা কঠিন। শেষ দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গণহারে অ্যাডহক নিয়োগ দিয়ে গেলেন উপাচার্য, এতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি একেবারে জিম্মি হয়ে থাকবে।

এত কিছুর পর আগামী দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, যদি না একজন যোগ্য ও দক্ষ উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া না হয়। আগামীতে একজন সাহসী উপাচার্য দরকার, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্মানিত করবেন, দুই পয়সার কোনো ব্যক্তির দাপটে মাথা নোয়াবেন না।

জাকির হোসেন তমাল : সাংবাদিক  

advertisement